রানির পর কে হবেন কমনওয়েলথ প্রধান
প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০১৩, ২০:২১
গত ১১ মার্চ কমনওয়েলথের ঐতিহাসিক এক সনদে সই করলেন সংস্থার প্রধান ও ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। অসুস্থতার কারণে ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবেতে কমনওয়েলথ দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে না পারলেও ঐ দিন সন্ধ্যায় সনদে সই করতে সংস্থার সদরদপ্তর মার্লবরো হাউজে যান তিনি। এর মাধ্যমে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় পর জনসমক্ষে আসেন ৮৬ বছর বয়সী রানি। কমনওয়েলথের পক্ষ থেকে মার্লবরো হাউজে তাকে দেয়া হয় বিপুল সংবর্ধনা, যেখানে উপস্থিত ছিলেন স্বামী প্রিন্স ফিলিপ ও কমনওয়েলথ সদস্য দেশগুলোর কূটনীতিকসহ প্রায় দুই হাজার অতিথি। এটা ছিলো ঐ অনুষ্ঠানের বাহ্যিক দৃশ্য। তবে অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে বোঝা গেছে, কমনওয়েলথের প্রধান হিসাবে রানির পর রাজপরিবারের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়, এমন কারো আগমনী ইঙ্গিত।
রানির উপস্থিতিতে সংবর্ধনায় কমনওয়েলথ মহাসচিব কমলেশ শর্মা বেশ ইঙ্গিতবাহী বক্তব্য রাখেন। কমনওয়েলথের সাথে রাজপরিবারের অন্য সদস্যদের অবদানের পাশাপাশি প্রিন্স চার্লসের কথা তিনি উল্লেখ করেন বিশেষভাবে। রানি এলিজাবেথের মৃত্যুর পর রীতি অনুসারে ব্রিটেনের মুকুট তার বড় ছেলে প্রিন্স চার্লসের মাথায় আসার কথা। কমনওয়েলথের সাথে ঐ মুকুটের যে নিবিড় একটা সম্পর্ক রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকতে পারে, এমন ইঙ্গিতই হয়তো দিতে চেয়েছিলেন কমলেশ শর্মা। তবে রানি এলিজাবেথ এমন ইঙ্গিতবাহী মন্তব্যকে ‘চিন্তাশীল কথা’ আখ্যা দিয়ে তাকে ধন্যবাদ জানান। কিন্তু এ ব্যাপারে তিনি খোলাসা করে তেমন কিছুই বলেননি। গণতান্ত্রিক ও উদারমনা রানি হয়তো চেয়েছেন কমনওয়েলথের প্রধান কে হবেন, সে ব্যাপারে এর সদস্য দেশগুলোই সিদ্ধান্ত নিক।
কমনওয়েলথ মহাসচিবের আশপাশের লোকজন অবশ্য দাবি করেছেন, রানির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে এমন বক্তব্য দিয়েছেন অমলেশ। তবে সেটা প্রশংসাসূচক হোক আর না হোক, প্রশ্ন হলো, রানির মৃত্যুর পর প্রিন্স চার্লস কমনওয়েলথের প্রধান হচ্ছেন কিনা!
কমনওয়েলথের জন্মলগ্ন থেকেই এর সাথে জড়িয়ে আছে ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জ ও তার মেয়ে রানি এলিজাবেথের স্বেচ্ছাসেবী কর্মযজ্ঞ। কমনওয়েলথের বর্তমান সদস্য ৫৪টি স্বাধীন রাষ্ট্র। এদের মধ্যে ৫২টি দেশই অতীতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডসহ অনেকেই ব্রিটেনের রানিকে তাদের রানি বলে স্বীকার করে। তবে রাজা হলে সে সব দেশ তাদের রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে প্রিন্স চার্লসকে মানবে কিনা, সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। এমনকি ঐ সব দেশে অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য চার্লস সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়তে পারেন। এরপর জ্যামাইকা ও অস্ট্রেলিয়াসহ কয়েকটি দেশ স্বজাতীয় কাউকে রাষ্ট্রপ্রধান করার কাজও শুরু করবে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, প্রিন্স চার্লসের উল্লেখযোগ্য ত্রুটি হলো তিনি প্রবল উত্সাহী নন। তাছাড়া একুশ শতকে এসেও যদি নিজেদের রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে বিদেশি কাউকে রাখা হয়, সেটাও স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য ভাল দেখায় না।
তাই রানির পর ব্রিটেনের সম্ভাব্য রাজা প্রিন্স চার্লস কমনওয়েলথের প্রধান হিসাবে থাকবেন কিনা, তা নির্ভর করছে এর সদস্য দেশগুলোর ঐক্যমতের উপর। সংস্থার ওয়েবসাইটে ফ্রিকোয়েন্টলি আস্কড কোয়েশ্চেনের জবাবে সমপ্রতি এমন কথাই যুক্ত করা হয়েছে। এতে আরো বলা হয়েছে, কমনওয়েলথ প্রধানের পদটি উত্তরাধিকার সূত্রে পাবার মতো কোন পদ নয়।
গত সোমবার রানি যে সনদে সই করেন, তাতে পরিবর্তিত বিশ্ব প্রেক্ষাপটে ১৬টি সাধারণ বিশ্বাসকে কমনওয়েলথের সমন্বিত মূল্যবোধ বা সংস্থার মৌলিক নীতিমালা হিসাবে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এগুলো হলো-গণতন্ত্র, মানবাধিকার, শান্তি ও নিরাপত্তা, সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ, ন্যায়বিচার, আইনের শাসন, সুশাসন, পারস্পারিক শ্রদ্ধা, সহিষ্ণুতা ও সমঝোতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, পরিবেশ রক্ষা এবং চিকিত্সা, শিক্ষা, খাদ্য ও বাসস্থানের অধিকার ইত্যাদি। এছাড়াও কমনওয়েলথে তরুণ ও সুশীল সমাজের ভূমিকাকে ঐ সনদে বেশ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
রানি নিজেই তার বক্তব্যে ঐ সনদকে কমনওয়েলথের উন্নয়ন ও নবায়নের চলমান যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসাবে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, প্রথমবারের মতো কমনওয়েলথ ও এর সব সদস্য দেশের প্রত্যাশা ও মূল বিশ্বাসকে নিয়ে এই সনদ রচিত হলো।
গত ১০ বছরের মধ্যে প্রথম গত ৩ মার্চ অসুস্থ হয়ে লন্ডনের কিং এডওয়ার্ড হাসপাতালে দুই দিনের জন্য ভর্তি হন রানি এলিজাবেথ। এখনো তিনি পুরোপুরি সুস্থ নন বলে জানিয়েছে বাকিংহাম প্যালেস। এভাবেই হয়তো একদিন রানির দীর্ঘ রাজকীয় জীবনের অবসান ঘটবে। সমালোচকের দৃষ্টিতে কমনওয়েলথ অকার্যকর প্রতিষ্ঠান হলেও সদস্য দেশগুলোকে নৈতিক শিক্ষা নিতে হবে মাইলফলক এই সনদ থেকেই। যা ক্ষতিগ্রস্ত ও পীড়িতদের জন্য বিভিন্ন আন্দোলন প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসাবে কাজ করবে। আর এর মাধ্যমেই রানি বেঁচে থাকবেন চিরকাল।