যেভাবে ছড়িয়ে পড়ল বাশারবিরোধী আন্দোলন

প্রায় বছর দুই আগে সিরিয়ার দক্ষিণের শহর দেররায় সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু করতে সাহায্য করেছিলেন সেনা বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা বাশার আল হেরাকি। মূলত এই শহরটি থেকেই সিরিয়ার একনায়ক বাশার আল আসাদ বিরোধী আন্দোলনের সূত্রপাত। একটি প্রশিক্ষিত সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে কীভাবে শুরু হয়েছে এই আন্দোলন, গণ বিক্ষোভ? সম্প্রতি এই গণ বিক্ষোভের উদ্যোক্তা বাশার আল হেরাকি বিবিসিকে দেয়া একটি সাক্ষাত্কারে জানিয়েছেন তার বিস্তারিত। বাশার আল হেরাকি বলেন, শুরুটা এরকম, দেররার একটি দেয়ালে বিপ্লবী শ্লোগান লেখার অভিযোগে কয়েকজন ছাত্রকে গ্রেফতার করলো সরকারি বাহিনী। অভিভাবকদের মধ্যে সৃষ্টি হয় ভয়, উদ্বেগ আর উত্কণ্ঠা। আর এই গ্রেফতারের ঘটনাই শৃঙ্খল ভাঙার চেতনা জাগিয়ে তুলে সিরিয়াবাসীর মধ্যে। গ্রেফতার হওয়া স্কুল ছাত্রদের অভিভাবকরা প্রথমে খুব ভয় পেয়ে যায়। আমি এরকম একটি বাচ্চার মাকে চিনি। তিনি তার ছেলের বন্ধুদের কাছে শুনতে পেয়েছেন সরকারি বাহিনী তার ছেলেকে গ্রেফতারে মরিয়া। আর প্রাণ ভয়ে ওই মা তার সন্তানকে নিয়ে শহর থেকে শহরে পালিয়ে বেড়ান। স্কুল ছাত্ররা যখন মুক্ত হলো, তখন তাদের অভিভাবকরা তাদের সারা শরীরে দেখতে পেলো অত্যাচার আর নির্যাতনের অনেক ক্ষত চিহ্ন। আর এই চিহ্ন তাদের মধ্যকার সব ভয়ভীতি দূর করে দেয়। আন্দোলন শুরুর আগ পর্যন্ত একটি প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেন বাশার আল হেরাকি। হেরাকি বলেন, ২০১১ সালের ১২ মার্চ আমি একটি গ্রুপকে নিয়ে বিক্ষোভের আয়োজন করি। পরের দিন আমরা দেররার আল ওমারি মসজিদে যাই। মূলত সিরিয়ায় বিদ্রোহ এখান থেকেই শুরু। আমরা আগেই জানতাম বিক্ষোভের কারণে বাশার সরকার আমাদের উপর অসন্তুষ্ট হবে; কিন্তু আমরা ঘুণাক্ষরেও ভাবিনি বিক্ষোভ শুরুর প্রথম দিনেই সরকার বিক্ষোভ থামাতে সাধারণ মানুষের উপর গুলি চালাবে। যখন আমরা মসজিদ থেকে বেরিয়ে আসলাম কিছু মানুষ শ্লোগান দেয়া শুরু করলো ‘আল্লাহ, সিরিয়া ও মুক্তি’ বলে। এই শ্লোগানকে বাশার সরকার তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবাধ্যতা হিসেবে গ্রহণ করে। কেননা শ্লোগানের শেষে আল্লাহ, সিরিয়ার পর বাশার আল আসাদ না বলে জনগণ নিজেরাই যোগ করেছে মুক্তি। আর তাই শাসকগোষ্ঠী হত্যাযজ্ঞ ও বিক্ষোভে গুলি চালিয়ে নিজেদের ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। আমি ছবি তুলতে থাকি। বাশার আল হেরাকি বলেন, এটি আমাদের হতবাক করে দেয় যে, আসাদ বাহিনী প্রথম থেকেই বিষয়টিকে শক্ত হাতে দমনের প্রচেষ্টা চালায়। তারা কোনো ধরনের সতর্ক না করেই আমাদের উপর দমন পীড়ন চালাতে থাকে। প্রথম থেকেই তারা অস্ত্র ব্যবহার করে। বিক্ষোভকারীদের উপর কাঁদানে গ্যাস অথবা জল কামান ব্যবহার না করেই অস্ত্র চালাতে শুরু করে। অবশ্যই আমরা ভীত ছিলাম; কিন্তু আমারা ভয় জয় করেছি এবং ঘোষণা দেই আমরা মুক্তি চাই। তিনি বলেন, আমরা তিউনিশিয়ায় ও মিসরে আরব গণ জাগরণকে জয়ী হতে দেখেছি, জয়ের ধারা অব্যাহত ছিল লিবিয়ায়ও। আমরা বিক্ষোভকারীরা সবাই সবসময় এক ছিলাম। যে দাবিতে আমরা অটল ছিলাম, সেই দাবির সঙ্গে অনেক অনেক তরুণ আমাদের সঙ্গে একাত্ম হয়েছিল। নিরাপত্তা বাহিনী নির্বিচারে গুলি করার আগেই বিক্ষোভটি তখন দেররার অপর অংশে ছড়িয়ে পড়ে। গুলি চালানোর পর ধরপাকড় শুরু হলে নিরীহ মানুষ যে যেখানে পারে পালাতে শুরু করে। হেরাকি বলেন, আমরা প্রথম রক্ত দেখি তখনই দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হই, আমাদের পেছনে ফেরার আর কোনো অবকাশ নেই, আসাদ সরকারের পতন ঘটাতেই হবে। কারণ সরকার পক্ষ তখন তাদের অবস্থানে অটল থেকে বেসামরিক লোকজন হত্যা করেছে। আর এই হত্যাযজ্ঞের পর দেশের সাধারণ মানুষের আরো বেশি সমর্থন পেতে শুরু করি। এমনকি দেশের বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের নেতারাও আমাদের প্রতি সমর্থন জানাতে থাকেন। হেরাকি বলেন, আমরা একমত হই পরের দিন আবারো একত্র হবো। আমরা আবারো ধর্মঘট সংগঠিত করবো। আমি লিফলেট বিতরণ করি, যাতে লেখা সরকারি বাহিনী খুনী। বিক্ষোভ চলাকালে সরকারি বাহিনীর উদ্দেশে আমরা নানা শ্লোগান দিতে থাকি। ‘তোমরা আমাদের ভাইয়ের মতো’, ‘আমরা সবাই সিরিয়ার নাগরিক’, ‘আমরা কেউ কারো শত্রু নই’, ‘তোমরা আমাদের এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ করতে পারো;’ কিন্তু সৈন্যরা আমাদের বলে এটি একটি নিরাপত্তা ইস্যু এবং নিরাপত্তার খাতিরে সম্ভাব্য সব কিছুই তারা করবে। তারা আমাদের কথা রাখেনি। হেরাকি বলেন, আমি মনে করি না আমরা এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাবো বড় ধরনের বিসর্জন ছাড়া। সিরিয়ায় সহিংসতায় এখন পর্যন্ত ৭০ হাজার মানুষ মারা গেছে। দশ লাখেরও বেশি মানুষ সিরিয়া ছেড়ে পালিয়েছে। বিশ লাখেরও বেশি মানুষ দেশের ভেতরেই বাস্তুহারা হয়েছে। সেভ দ্য চিলড্রেন জানিয়েছে, সিরিয়ায় বিশ লাখেরও বেশি শিশুর মানবিক সাহায্য প্রয়োজন। সিরিয়ায় মানবিক বিপর্যয়ের বর্তমান চিত্র এটি। আর তাইতো বিরোধী সিরীয় জাতীয় পরিষদের জ্যেষ্ঠ সদস্যের দায়িত্ব পালনকারী হেরাকি বলেন, বস্তুত আমি বিশ্বাস করি আমাদের এই অবস্থার জন্য পরোক্ষভাবে হলেও আন্তর্জাতিক সংস্থা দায়ী। কারণ তারা কোনো কিছুই না করে দুই বছর হাত গুটিয়ে বসেছিল। যদি তাদের সত্যিকার অর্থে ইচ্ছা থাকতো আসাদ শাসনের অবসান ঘটানোর, তাহলে তিনি সাধারণ মানুষের উপর ভারী অস্ত্র ব্যবহার করতে পারতেন না। পুরো বিশ্ব আমাদের হতাশ করেছে।