চীনারাই কিনে নিচ্ছে সব!

 

 

শফিকুর রহমান রয়েল

 

নিউ ইয়র্ক, লন্ডন, হংকং, প্যারিস কিংবা ভ্যানকুভার, আপনি যেখানেই যান না কেন, দেখবেন এক্সক্লুসিভ শপিংমলগুলোতে চীনা ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড়। চোখ বন্ধ করে তারা জিনিস কিনছে। অধিকাংশই প্রাইস ট্যাগের দিকে ভুলেও তাকাচ্ছে না। ভাবখানা এরকম থাকে যে, এটা দেখার কী দরকার। খুব সহজেই বোঝা যায়, দাম যতই লাগুক ভালো জিনিসটি তাদের কেনা চাই-ই-চাই। দামি ঘড়ি, হ্যান্ডব্যাগ ও পারফিউম কিনছে তারা চোখ বন্ধ করে। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করে, স্টকে আরো ভালো কিছু আছে কি না। থাকলে বিক্রয় সহকারীকে নির্দেশ দেয় দ্রুত নিয়ে আসার। এছাড়া রিয়েল এস্টেট এজেন্টরা ব্যস্ত থাকছে চীনা টাইকুনদের ফোন রিসিভ করতে গিয়েই। সত্যি বলতে গেলে, চীনের কিছু লোক দেশে অর্থ খরচ করার আর জায়গা পাচ্ছে না। এরা সময় পেলেই ছুটে যাচ্ছে বিদেশে। সেদেশের জাতীয় পর্যটন কর্তৃপক্ষ তথ্য দিয়েছে, চান্দ্র নতুন বছর উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী ছুটি কাটাতে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিল ৮০ লাখ ৫০ হাজার লোক। গত বছরের চেয়ে যা ১৩ শতাংশ বেশি। গেল বছর এ উপলক্ষে বিদেশে গিয়েছিল ৭০ লাখ ৫০ হাজার লোক।

ধনিক শ্রেণির মধ্যেও তো অনেক বিভাজন। সম্পদের মূল্য কমপক্ষে ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন চায়নিজ ইউয়ান (৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার), চীনে এমন লোকের শ্রেণিতে এ বছর ৫৩৫ জন নতুন মুখ সংযোজিত হবে, যা আগের বছরের চেয়ে ৬ শতাংশ বেশি। এ তথ্যটি জানিয়েছে অত্যধিক ধনীদের উপর তথ্য সংগ্রহ করা সিঙ্গাপুরভিত্তিক কোম্পানি ওয়েলথ-এক্স। ধনীদের মধ্যে এর পরের শ্রেণিতে থাকা লোকও কম নয় দেশটিতে। কমপক্ষে ১০ মিলিয়ন চায়নিজ ইউয়ানের (১.৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) সম্পদের মালিক, এমন লোক রয়েছে সেখানে ৮ লাখ। ২০১৫ সাল নাগাদ এ সংখ্যাটা ১০ মিলিয়নে পৌঁছাবে। এ খবরটি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গ্লোবাল ম্যানেজমেন্ট ফার্ম ব্যাইন এন্ড কোম্পানি। চীনা লোকজনের কাছে এতো অর্থ আসছে কোত্থেকে, এ প্রশ্ন করলে ওয়েলথ-এক্স’র সিইও মিকোলাস রামবাস উত্তর দেন, বিশাল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই এর মূল কারণ। গত এক দশক ধরে গড়ে সেখানে মোট দেশজ উত্পাদন বাড়ছে ১০% হারে। সে জায়গায় যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ছে ৩% হারে। এই পার্থক্যটিই চরম ধনী লোক বাড়তে থাকার কারণটি বুঝিয়ে দেয়। চীনের পরিচিতি এখন বিশ্বের ওয়ার্কশপ হিসেবে, আর কিছু ব্যবসায়ী অর্থনীতি দ্রুত সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগটা বেশ ভালোই কাজে লাগাচ্ছে। তাদের সম্পদ বাড়ছে তো বাড়ছেই। কোনো প্রয়োজন হচ্ছে না আর পেছনে তাকানোর।

চীনের সবচেয়ে ধনী লোকদের বেশিরভাগই তরুণ এবং তারা প্রথমবারের মতো এরকম সম্পদ থাকার অভিজ্ঞতা লাভ করছে। এ অবস্থাটাও যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বিপরীত। যুক্তরাষ্ট্রে অধিকাংশ চরম ধনীই উত্তরাধিকার সূত্রে।  নতুন এ চায়নিজ এলিটরা ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার এলিট শ্রেণির প্রতিনিধিদের চেয়ে কম বয়সী। চীনা এলিটদের গড় বয়স চল্লিশ থেকে পঞ্চাশের মধ্যে। সেক্ষেত্রে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় পঞ্চাশ থেকে ষাটের মধ্যে। এসব জানিয়েছেন ব্যাইন অ্যান্ড কোম্পানির বেইজিং-ভিত্তিক অংশীদার জেনিফার জেং। তবে কিছু লোকের সম্পদ হুহু করে বাড়লেও চরম ধনী লোকের সংখ্যার ক্ষেত্রে অদূর ভবিষ্যতে সবচেয়ে বেশি ধনী লোকের দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে অতিক্রম করার সম্ভাবনা নেই চীনের। সম্পদের মূল্য কমপক্ষে ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, এমন অত্যধিক ধনী লোক যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে ৬৫ হাজার। চীনে এমন লোক রয়েছে বর্তমানে ১০ হাজার ৬৭৫ জন। বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের হংকং-ভিত্তিক অংশীদার তিউন ত্যাং-এর তথ্যানুসারে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি অধিক উন্নত বলে সেখানে বেশি সংখ্যক অতিধনী থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেখানকার তুলনায় চীনে ওরকম লোকের সংখ্যা  অধিক গতিতে বাড়ছে। এ বিষয়টিই অবাক করে দিচ্ছে অনেককে।

চীনে অতিধনী বেড়ে যাওয়ায় এর প্রভাব বিশ্বের বড় বড় শহরগুলোর উপর বেশ ভালোভাবেই পড়ছে। তারা চড়া দামে কিনে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট কিনছেন নিউইয়র্ক, লন্ডন, প্যারিস, ভ্যানকুভার ও হংকং সিটির মতো শহরগুলোয়। তাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে স্থানীয়রা পারছে না। সম্প্রতি ব্যাইন অ্যান্ড কোম্পানি চীনের ৩ হাজার অতিধনী লোকের উপর একটি জরিপ চালিয়েছিল। এদের ৩০ শতাংশই জানান, বিদেশে বিনিয়োগের জন্য যে তিনটি খাতকে প্রাধান্য দিচ্ছেন, তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে রিয়েল এস্টেট। এটি চীনের জন্য নিঃসন্দেহে অশুভ লক্ষণ। বিশ্লেষকরা এর মধ্যে অন্য কিছুর গন্ধ পাচ্ছেন। তাঁদের মতে, অধিক সম্পদশালীদের অনেকেই বিনিয়োগের নাম করে কৌশলে দেশ থেকে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ খুঁজতে ব্যস্ত, তারা শেষ পর্যন্ত বিদেশে স্থায়ী হতে পারে।  অনেকের উদ্দেশ্য শুভ নয় বলে এর কুপ্রভাব চীনের অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করবে খুব শিগগিরই। আইন করে বিদেশে বিলাসবহুল বাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্ট কেনাকে নিয়ন্ত্রণ করার পরামর্শ দিচ্ছেন কিছু বিশ্লেষক।