কুষ্টিয়া রেজিস্ট্রি অফিসে অনিয়মের অভিযোগ
প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০১৩, ২১:৩০
কুষ্টিয়া জেলা রেজিস্ট্রি অফিস ও সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে চলছে অনিয়ম-দুর্নীতি ও নানা অজুহাতে অতিরিক্ত টাকা আদায়। জমি রেজিস্ট্রিতে সরকারি নিয়মের কোন তোয়াক্কা না করে দলিল লেখক শক্তিশালী সিন্ডিকেটচক্র নানা অজুহাতে আদায় করছে অতিরিক্ত টাকা। জমি রেজিস্ট্রি ছাড়াও দলিলের নকল উত্তোলন ও নোটিস ক্রয় বাবদ সরকারি নিয়ম না মেনে আদায় করা হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। ফলে রেজিস্ট্রি অফিসের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর মদদে গড়ে উঠা দলিল লেখক শক্তিশালী সিন্ডিকেটচক্রের কাছে এলাকার মানুষ অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েছে। অপরদিকে দুর্নীতির দায়ে সদ্য বদলিকৃত জেলা রেজিস্ট্রার আব্দুল জলিল নিবন্ধন পরিদফতরের নির্দেশ উপেক্ষা করে শিক্ষাগত যোগ্যতার ভুয়া সনদধারী কতিপয় দলিল লেখকের কাছ থেকে মোটা অংকের উেকাচ গ্রহণ করে তাদের প্রতিবেদন পরিদফতরে না পাঠিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকারি হিসাবমতে জমি রেজিস্ট্রিতে বিক্রীত জমির সর্বমোট মূল্য হিসাবে ২% উেসকর, স্ট্যাম্প ৩%, সরকারি ফি ৪% ও দলিল খেলা বাদদ ৫শ’ থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা গ্রহণ ছাড়া অন্য কোন খাতে নেয়ার বিধান না থাকলেও দলিল লেখক সিন্ডিকেটচক্র সরকারি নিয়মের কোন তোয়াক্কা করছে না। ফলে জমি রেজিস্ট্রিতে সিন্ডিকেটচক্রের কব্জায় পড়ে সরকার নির্ধারিত ফি-এর বাইরে প্রতিটি দলিলে অতিরিক্ত ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি গুনতে হয়। এছাড়া দলিলের নকল উত্তোলনে সরকারি ফি ৮০ টাকার স্থলে নেয়া হচ্ছে ১১শ’ টাকা এবং দলিল সম্পাদনের জন্য দলিলের সাথে সংযুক্ত ২ টাকার নোটিসের স্থলে নেয়া হচ্ছে ১৫শ’ টাকা এবং হেবানামা ও আমমোক্তারনামা দলিল রেজিস্ট্রি সরকারি ফি-এর অতিরিক্ত ৫ হাজার টাকা নেয়া হচ্ছে। এদিকে এলাকার ভুক্তভোগী মানুষসহ দলিল লেখক হারুন-অর-রশিদের অভিযোগের ভিত্তিতে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেন গত জানুয়ারি মাসে দলিল লেখক সিন্ডিকেটচক্রের দুর্নীতি-অনিয়ম তদন্তে একটি কমিটি গঠন করে দেন। ওই তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ড. আনোয়ার হোসেন মল্লিক রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক সমিতির সিন্ডিকেটচক্র ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে মাঠে নেমে ঘটনার সত্যতা খুঁজে পান এবং জেলা প্রশাসকের কাছে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দাখিল করেন। পরবর্তীতে গত ১০ ফেব্রুয়ারি জেলা প্রশাসক কথিত দলিল লেখক সমিতি বন্ধ ও সমিতির নামে অতিরিক্ত টাকা গ্রহণ না করার নির্দেশ দিয়ে জমি রেজিস্ট্রিতে সরকারি নীতি অনুসরণ করার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি জেলা প্রশাসক রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মচারী ও দলিল লেখকদের দুর্নীতি রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কিন্তু জেলা প্রশাসকের নির্দেশে দলিল লেখক সমিতির নামে অতিরিক্ত টাকা নেয়া বন্ধ হলেও নানা অজুহাত ও খাত দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বেশি টাকা আদায় চলছেই। অতিরিক্ত এই টাকা জেলা রেজিস্ট্রি অফিসের শীর্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারী, কতিপয় পুলিশ সদস্যসহ দলিল লেখক সমিতির সিন্ডিকেট সদস্যরা ভাগবাটোয়ারা করে নেয়। এদিকে দলিল লেখক সমিতির সিন্ডিকেটচক্রের অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্ত ও তাদের লাইসেন্স বাতিলে জনৈক নূরুল ইসলাম চাঁদ ২০১০ সালে ঢাকাস্থ নিবন্ধন পরিদফতরে অভিযোগ দাখিল করলে পরিদফতরের মহাপরিদর্শক নজরুল ইসলাম তদন্ত করে মতামতসহ প্রতিবেদন দাখিলের জন্য জেলা রেজিস্ট্রারকে নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে তদন্ত কমিটির প্রধান তত্কালীন সদর সাব-রেজিস্ট্রার শামীমা সুলতানা ২০১০ সালের ১৮ মার্চ মতামতসহ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। ওই তদন্ত প্রতিবেদনের মতামতে তিনি উল্লেখ করেন যে, দলিল লেখক সমিতির কতিপয় সদস্য অতিরিক্ত টাকা আদয়ের মাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান ও বিপুল টাকার মালিক বনে যাচ্ছেন। এছাড়া দলিল লেখক সমিতির সাথে জড়িত জয়নুল আবেদীন, ওয়াহিদুজ্জামান লাইজু, নাসির আহম্মেদ, আব্দুর রহিম, আমিরুল ইসলাম ও ইমতিয়াজ হোসেন তুহিনের বিরুদ্ধে সরকারি নিয়ম উপেক্ষা করে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের জন্য তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রতিবেদন দাখিল করেন। এরপর ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নিবন্ধন পরিদফতরের মহাপরিদর্শকের নির্দেশে তত্কালীন জেলা রেজিস্ট্রার মোহন লাল বাড়ৈ দলিল লেখক সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ওই সিন্ডিকেটভুক্ত ৮ জন দলিল লেখকের স্বীকৃতির সনদপত্র বাতিল করে দেন। নবাগত জেলা রেজিস্ট্রার শামীমা সুলতানা জানান, সরকারি নিয়মের বাইরে অতিরিক্ত টাকা গ্রহণ সম্পূর্ণ বেআইনি। কুষ্টিয়া রেজিস্ট্রি অফিসের বদনাম ঘুচাতে তিনি সচেষ্ট থাকবেন এবং মানুষকে সাধ্যমত সেবা দেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাবেন বলে তিনি জানান।