ভুয়া বরাদ্দপত্রে হাতিয়ে
নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা
প্রকাশ : ১৮ মার্চ ২০১৩, ২২:১৯
রাজউকে ফের জালিয়াত চক্র তত্পর হয়ে উঠেছে। প্লট পরিবর্তন, প্লটের আয়তন বৃদ্ধি, ভুয়া আম-মোক্তারনামা তৈরি, ভুয়া এওয়ার্ড সার্টিফিকেটে ক্ষতিগ্রস্তদের জমি হাতিয়ে নেয়া, ফাইলের ছবি সরিয়ে ফেলা, বরাদ্দকৃত প্লটের ভুয়া সাময়িক ও চূড়ান্ত বরাদ্দপত্র তৈরিসহ নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে সংঘবদ্ধ এই চক্র। প্রভাবশালী জালিয়াত চক্রের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করে উল্টো বেকায়দায় পড়েছেন রাজউকের এক উপ-পরিচালক। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অতি সমপ্রতি স্বাক্ষর জাল করে সাময়িক বরাদ্দপত্র তৈরি ও পরে তা জারি করার চাঞ্চল্যকর ঘটনা উদঘাটন করেছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্ম-কর্তারা। রাজউকের পূর্বাচল সেলের উপ-পরিচালক (এস্টেট-৩) একে এম আহসান ইকবাল ভুঁইয়া ইত্তেফাককে বলেন, মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান শেখ নামে এক ব্যক্তি তার কাছে গত বৃহস্পতিবার একটি সাময়িক বরাদ্দপত্র ও প্রথম কিস্তি জমাদানের রশীদ নিয়ে আসেন। তিনি অভিযোগ করেন, তাকে প্লট আইডি দিয়ে কেন দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ চাওয়া হচ্ছে না। এক পর্যায়ে তার সাময়িক বরাদ্দপত্রটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা যায়, উপ-পরিচালকের স্বাক্ষর করা সাময়িক বরাদ্দপত্রটি ভুয়া। এর বিপরীতে যে অর্থ জমা দেয়া হয়েছে তা সঠিক হলেও প্রকৃতপক্ষে হান্নান শেখের নামে রাজউক থেকে কোন প্লট বরাদ্দ হয়নি। জালিয়াত চক্রের খপ্পরে পড়ে তিনি প্রতারিত হয়েছেন।
এ ব্যাপারে আব্দুল হান্নান শেখ ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ব্যবসায়ী শ্রেণীতে ১০ কাঠা আয়তনের একটি প্লটের জন্য তিনি ২০০৯ সালে আবেদন করেন। তিনি গত জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ১০ কাঠার বিপরীতে দেয়া জামানতের অর্থ তুলতে রাজউকের পূর্বাচল সেলে আসেন। তখন আজাদ নামের এক ব্যক্তির সাথে তার পরিচয় হয়। উক্ত ব্যক্তি নিজেকে রাজউকের কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেন। আজাদ তাকে জামানতের অর্থ তুলে নিতে হবে না বলে জানান। তাকে টাকা দিলে প্লট পাবার ব্যবস্থা করে দেবেন বলে আশ্বাস দেন। এরপর আজাদ ও তার সঙ্গীদের সঙ্গে মতিঝিলের একটি এলাকায় যাওয়ার জন্য বলা হয় তাকে। হান্নান শেখ বলেন, ‘তাদের কথামতো মতিঝিলের ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের পাশে একটি খোলা জায়গায় গিয়ে বসি। আজাদ ও তার সঙ্গীরা বলেন, প্লটের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি, মিষ্টি খাওয়ার জন্য আমাদের কিছু দিলেই হবে। পরে তাদের কথামতো বিভিন্ন নম্বরে যোগাযোগ রাখতে থাকি। দফায় দফায় তারা আমার কাছে টাকা দাবি করে। আমি তাদের বলি, আপাতত প্লটের বিষয়ে সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত টাকা দিতে পারবো না। একদিন ফোন করে তারা জানায়, আপনার পঞ্চগড়ের ঠিকানায় সাময়িক বরাদ্দপত্র পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। ওই বরাদ্দপত্রের বিপরীতে ১০ লাখ টাকার একটি পে- অর্ডার জমা দিয়ে রশীদ দুটি নিয়ে আসুন। সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। রাজউকের খামে পাঠানো চিঠিতে লেখা রয়েছে; কোড নং- ২২০৮৮, তাং- ০৮/০২/২০১৩, ক্যাটাগরি-ব্যবসায়ী (১৩/ক ধারা মতে)।’ চিঠিটি পেয়ে দশ কাঠা প্লটের বিপরীতে প্রথম কিস্তির অর্থ জমা দেন হান্নান শেখ।
হান্নান শেখ বলেন, ‘প্রতারকদের সহজ সরল কথায় ভুলে টাকা জমা দিয়েছি। এখন দশ লাখ টাকাও ফেরত পাচ্ছি না।’ এ বিষয়ে পূর্বাচল সেলের উপ-পরিচালক কোন সুরাহা করতে না পারায় বিষয়টি সমাধার জন্য রাজউকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. শহিদুল ইসলাম ভুঁঞার কাছে পাঠানো হয় তাকে।
জানতে চাইলে রাজউকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শহিদুল ইসলাম ভুঁঞা ইত্তেফাককে বলেন, জালিয়াতিচক্র বরাদ্দ গ্রহিতার নামে ভুয়া বরাদ্দপত্র তৈরি করেন। এ জন্য সই-স্বাক্ষরসহ সব কিছুতে রাজউকের ছাপানো কাগজ ব্যবহার করা হয়েছে। এটা অন্যায় ও আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এতে রাজউকের ভাবমূর্তি বাইরে ক্ষণ্ন্ন হয়। এর আগেও রাজউকের পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লটের ছবি বদলের অভিযোগে মতিঝিল থানায় মামলা দায়ের করেন এস্টেট-৩ শাখার উপ-পরিচালক একেএম আহসান ইকবাল ভুঁইয়া। এই কর্মকর্তা বাদী হওয়ায় এখন নিজেই জালিয়াত চক্রের হুমকির মুখে পড়েছেন। ছবি বদলের সঙ্গে জড়িত শক্তিশালী চক্রটি তাকে নানাভাবে হেনস্তা করাসহ ভয়ভীতি দেখাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন উপ-পরিচালক নিজেই। এছাড়া পুলিশও অপরাধীদের না ধরে রাজউকের কর্মচারী কর্মকর্তাদের নানাভাবে হয়রানি করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ ব্যাপারে রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নূরুল হুদা ইত্তেফাককে বলেন, গত জানুয়ারিতে ফাইলের ছবি বদলের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে আবু তৈয়ব নামে রাজউকের এক কর্মচারীকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে। একই অভিযোগে পূর্বাচল সেলের সহকারী পরিচালক আবুল বশরকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ফৌজধারী আইনে এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
রাজউকের একটি সূত্রের ভাষ্যমতে, রাজউকের গুটি কয়েক কর্মচারীসহ একটি সন্ত্রাসী সিন্ডিকেট ফাইলের ছবি বদল ও জালিয়াতির সাথে জড়িত রয়েছে। এবারই প্রথম জালিয়াত চক্রের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং এক কর্মচারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ফলে রাজউকের জালিয়াত সিন্ডিকেটটি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।