পাখির বাসার স্যুপ খেয়েছ তো?
প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০১৩, ১৮:০০
পাখির বাসা দিয়ে বানানো স্যুপ এখনো খাওনি বুঝি! কথাটা তোমার চীনা বন্ধুরা শুনতে পেলে কিন্তু ভারি লজ্জার ব্যাপার হবে। সে স্যুপের নাকি এমনই স্বাদ যে, বারবার খেতে ইচ্ছে করে। গত চারশ’ বছরেরও বেশি সময় ধরে চীনারা এ স্যুপ তো খাচ্ছেই এখন খাওয়া শুরু করেছে অন্যান্য দেশের বাসিন্দারাও। দামও অনেক। প্রাণীজগত থেকে পাওয়া যেসব খাবার মানুষ খায়, পাখির বাসা দিয়ে বানানো এই স্যুপ তার মধ্যে সব চেয়ে দামি। চীন ছাড়া আমাদের কাছেপিঠের দেশগুলোর মধ্যে হংকংয়ের নামি দামি রেস্তোরাঁগুলোতে এই স্যুপ তুমি পাবে, তবে এর ছোট এক বাটি স্যুপ খেতে হলে শ’ খানেক ডলার বেরিয়ে যাবে তোমার পকেট থেকে। এতো গেল স্যুপের দাম। যে বাসা দিয়ে সেই স্যুপ বানানো, তার দাম কত? দুই ধরণের সুইফট পাখির বাসা দিয়ে স্যুপ বানানো হয়। এর একটাকে বলে হোয়াইট নেস্ট বা সাদা বাসা। এক কিলোগ্রাম ওজনের হোয়াইট নেস্টের দাম কম করে হলেও ২ হাজার ডলার। আর অন্যটাকে বলে রেড ব্লাড নেস্ট। তুমি যদি রেড ব্লাড নেস্ট কিনতে চাও তবে এর এক কেজির জন্য তোমাকে অন্তত ১০ হাজার ডলার ব্যয় করতে হবে। এ পাখি কিন্তু অন্যসব পাখির মত খড়কুটো দিয়ে বাসা বোনে না। মুখ থেকে লালার মত এক রকমের জিনিস বের করে তা দিয়ে বাসা বানায়। এ বাসা পানিতে সহজে গুলে যায়। এসব বাসায় খাদ্য উপাদানও যথেষ্ট।
স্যুপ খেতে মজার হলেও এ পাখির বাসা জোগাড় করা কিন্তু মোটেও সহজ নয়! পাহাড়ের গুহায় অনেক উঁচুতে বাসা বাঁধে এরা। কয়েক শ’ গজ লম্বা লম্বা বাঁশের মই লাগিয়ে তবে এসব বাসার নাগাল পাওয়া যায়। এত লম্বা মই, তার ওপর এর এক একটা মইয়ের বয়স দু’শ, তিনশ’ বছর পর্যন্ত। আর কত যে জোড়াতালি লাগানো, তার কোন লেখাজোখা নেই! বাসা পাড়তে গিয়ে এই মইয়ের ওপর থেকে পড়ে গেলে আর দেখতে হবে না! তাছাড়া ইচ্ছে করলেই এসব গুহায় ঢুকে সুইফট পাখির এ বাসা তুমি পেড়ে আনবে, সে সুযোগ নেই। কিভাবে কখন এই বাসা পেড়ে আনা যাবে তার আইন আছে। ডিম পাড়ার আগে সুইফট পাখি বাসা বাঁধে। একবার বাসা বাঁধার পরপরই বাসা পেড়ে আনা হয়। বাসা পেড়ে নিয়ে গেলে পাখিগুলো আবার বাসা বাঁধে। তবে এবার আর সে বাসা পাড়তে দেয়া হয় না। তখন তারা সে বাসায় ডিম পাড়ে, তা দেয়, বাচ্চা লালন করে। বাচ্চাকাচ্চা উড়তে শেখার পর অবশ্য সেই বাসা পেড়ে আনতে কোন মানা নেই। তবে এই বাসার দাম অনেক কম। তোমার মনে হতে পারে, পাখির বাসা পেড়ে আনা ভারি অন্যায় কাজ।
পাখির বাসার স্যুপ রাঁধতে হলে কিন্তু বিশেষ ধরনের সুইফট পাখির বাসা লাগবে। তুমি যদি পাখির বাসার স্যুপ খাব বলে বায়না ধর এবং হর্নড কুট পাখির বাসা দিয়ে স্যুপ রান্নার চেষ্টা কর, তাহালে কিন্তু ভারি একটা গোলমেলে ব্যাপার হবে। এই পাখির বাসার ওজন কত শুনবে? এক একটা বাসার ওজন মোটামুটি ১৪শ কেজি। বলবে, সেই তো ভালো। একটা বাসা দিয়ে স্যুপ রান্না করলে পাড়াসুদ্ধ সবাই মিলে খাওয়া যাবে! সে কথা ঠিক। কিন্তু অসুবিধা হল, এই বাসার পুরোটাই বানানো হয় পাথরের নুড়ি দিয়ে। এবং এর এক একটা নুড়ি প্রায় আধা কেজি করে। এই বার হয়তো বলবে, আজগুবি গল্প! একটা পাখি আধা কেজি ওজনের পাথর বয়ে আনবে কি করে! আসলে হর্নড কুট জলচর পাখি। জলাভূমিতে অল্প পানিতে একটার পর একটা পাথর সাজিয়ে একটা ঢিবির মত বানায়। তারওপর তারা ডিম পাড়ে। ওরা স্কুলে গিয়ে কখনো আর্কিমিডিসের সূত্র মুখস্থ করেছে কিনা বলতে পারব না তবে ওরা জানে, কোন জিনিস পানিতে ফেললে তার ওজন কমে যায়। হয়তো সেটা ওরা জানে আর্কিমিডিস জন্মানোরও হাজার হাজার বছর আগে থেকে! ওরা পাথরের নুড়িগুলো পানিতে ফেলে তবে বয়ে আনে।
হর্নড কুট পাখির বাসা দিয়ে বানানো স্যুপ খাওয়া যাক বা না যাক, তা দিয়ে অন্তত রান্নার চেষ্টা করা যাবে। কিন্তু তুমি যদি কোকিলের বাসার স্যুপ রান্না করতে চাও, সেটা কিন্তু আরো গোলমেলে ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। যদিও যদিও দুষ্ট লোকেরা বলে, ঘোড়ার ডিম দিয়ে কোকিলের বাসার স্যুপ রান্না করে সোনার পাথর বাটিতে খেলে তার নাকি তুলনা হয় না! সে কথা ঠিক, তুলনা হবে কি করে! ঘোড়ার ডিমও যেমন, কোকিলের বাসাও তেমনি—অবাস্তব। কোকিল কাকের বাসায় ডিম পাড়ার কাজটা সারে। নিজেরা বাসা বাঁধে না। তার পরও যদি তুমি কোকিলের বাসার স্যুপ খেতে চাও, খাও—আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু তুমি যদি নামিবিয়া অঞ্চলের ভার্সামেলভইল পাখির বাসার স্যুপ খেতে চাও তবে সেটা ভারি বিপদের হবে, তা আগেই বলে রাখি। স্থানীয়রা তাকে বলে ভার্সামেলভইল। এদের বাসা এক একটা কম করে হলেও মোটর গাড়ির আকারের। কোন কোনটা আবার কুড়ে ঘরের মত বড়ও হয়ে থাকে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, কারো গোয়াল ঘরের চাল উড়ে এসে গাছের ওপর পড়েছে বুঝি। শ’ শ’ পাখি পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর—এমনকি একশ বছর ধরে এসব বাসা বানায়। ধরে খড়কুটো দিয়ে বানানো এসব বাসায় সামান্য কারণেই আগুন ধরে যায়। তাই বিশাল আকারের এসব পাখির বাসা দিয়ে স্যুপ বানাতে গেলে বিপদ ঘটার সম্ভাবনাই বেশি। শ’খানেক বছর ধরে মরু এলাকায় গড়ে তোলা এসব বাসায় সামান্যতেই আগুন ধরে যায়। তাছাড়া এত ঢাউস আকারের বাসা রান্নঘরে কিভাবে ঢোকাবে-সেটাও একটা প্রশ্ন বটে। চুপিচুপি বলে রাখি, মানুষ ছাড়া বিশ্বের আর কোন প্রাণী এত বিশাল আকৃতির ঘর বানাতে পারে না।
মলয় পাঁড়ে