স্বাধীনতার মহান স্থপতি
প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০১৩, ১৮:০১
শেখ মুজিব একটি নাম। একটি ইতিহাস। বাংলার এক বিস্ময়কর যাদুকরের নাম। বিস্ময়ের বিস্ময় তিনি। সকল ভয়, অন্যায়, অত্যাচার, অসাম্য আর জাতিগত বিদ্বেষের বিরুদ্ধে এক ভয়ংকর গর্জনের নাম। বাংলার অন্ধকার আকাশে জ্বলন্ত এক জ্যোতিষ্ক তিনি। বাংলার আকাশ আলোকিত করা এক উজ্জ্বল তারকা। দিনের সূর্য। রাতের চাঁদ।
গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায় যার জন্ম। সেখানের সবুজ প্রকৃতি, নদী, মাঠ, শস্য, শিশিরভেজা ঘাস, বৃষ্টির পানি, ঝিকিমিকি জোনাক পোকার আলোর নাচন খোকাকে বড়ই আনমনা করে তুলতো। নদীতে ঝাঁপ দিয়ে গোসল করে, গায়ে কাদা মাখামাখি, বনে-বাদাড়ে টই টই করে রোদেলা দুপুরে ঘুরে বেড়িয়ে বিকেলবেলায় বন্ধুদের সাথে ফুটবল খেলে যার সময় কাটতো। কাকডাকা ভোরে বিছানা থেকে উঠে খালি পায়ে হাঁটতে বের হতেন তিনি। শিশির ভেজা দূর্বাঘাস মাড়িয়ে চলে যেতেন দূর থেকে বহুদূর। তাকিয়ে থাকতেন আনমনে নীল আকাশের দিকে। সবুজ প্রকৃতির দিকে। হাঁটতেন আর ভাবতেন, দেশের কথা, মেহনতি মানুষের কথা। ছোটবেলা থেকে তিনি বেশ চঞ্চল প্রকৃতির ছিলেন। তবে মনটা ছিল বেশ নরম তুলতুলে। একেবারে কাশফুলের মতো। বকুল ফুলের মতো মিষ্টি। জবা ফুলের মতো উজ্জ্বল। কারো কষ্ট দেখলে মন ডুকরে কেঁদে উঠতো, চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়তো পানি।
চাঁদনি রাতে মায়ের কোলে গল্প শুনতে শুনতে তিনি তলিয়ে যেতেন গভীর ঘুমে। কে জানতো যে ছেলেটি রূপকথার গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তো। সে ছেলেটিই একদিন গল্পের উপাদান হবে। তৈরি করবে ঐতিহাসিক বীরত্বগাঁথার ইতিহাস। হয়ে যাবেন ইতিহাসের এক মহানায়ক। তাঁকে নিয়ে লেখা হবে হাজার হাজার গল্প-কবিতা-উপন্যাস। ঘুমিয়ে পড়া সেই ছেলেটিই জাগিয়ে তুলবে গোটা বাংলাদেশের জাতিকে। জাগিয়ে দেবে বাংলার নদী-মাঠ-খাল-বিল-কৃষক-শ্রমিক-তাঁতী-কামার-কুমার ও আপামর মেহনতি মানুষকে। তার কথায় ঝাঁপিয়ে পড়বে যুদ্ধের ময়দানে। দেশকে মুক্ত করবে পাকিস্তানি হায়েনাদের কবল থেকে। না কথা ছিল না। কথা না থাকলেও শেখ মুজিব ঠিকই আমাদের জাতির দুর্দিনে এগিয়ে এসে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
৭ মার্চ। রোদ ঝলমল একটি দিন। ইতিহাসের একটি স্বর্ণালী অধ্যায়। রেসকোর্সের একটি ভাষণে পাল্টে গেল সকল দৃশ্যপট। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেব; তবুও এদেশকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ।... আর দাবায়ে রাখবার পারবা না।’
ছোট্ট খোকা মুজিব ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন গণমানুষের আপনজন। এরপর হলেন মুজিব। এরপর হয়ে গেলেন বঙ্গবন্ধু। শিক্ষাজীবনে মুজিব কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হলেন। সেখানে সোহরাওয়ার্দীসহ অন্য নেতাদের সাথে তাঁর পরিচয় ঘটে। তারই ফলে উন্মেষ ঘটে তার রাজনৈতিক জীবনের। এদিকে দেশব্যাপী যুদ্ধের ডামাডোল শুরু হয়ে গেছে। পাকিস্তানি হায়েনারা বাংলার সবুজ ভূখণ্ডকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলতে লাগল। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হল পাকিস্তানে। তাঁর জন্য কবর খোঁড়া হল। কিন্তু দেশের মানুষের ভালবাসায় কবর তাকে গ্রাস করতে পারেনি।
জলে-স্থলে-গ্রামে-গঞ্জের মাটি আর প্রকৃতিকে দূষিত করতে লাগল তারা। দেশের মানুষ নির্যাতিত হতে হতে সংঘবদ্ধ হতে শুরু করলো। ত্রিশ লক্ষ শহীদের বিনিময়ে লড়াই করে দেশ স্বাধীন হল। আমরা পেলাম একটি দেশ একটি লাল সবুজের পতাকা। দেশের মানুষের মুখে ফুটলো হাসির রেখা। দেশ ভাসলো খুশি আর আনন্দের ভেলায়। কিন্তু ’৭১-এর পরাজিত শক্তি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠে ধীরে ধীরে। তার পরিপ্রেক্ষিতে ’৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে নির্দয়ভাবে তারা হত্যা করলো। দেশ হয়ে গেল অভিভাবকহীন। যে জাতি নিজের স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী প্রিয় মানুষকে প্রাণে মেরে ফেলতে পারে সে জাতি তো হতাভাগাই। কিন্তু যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, লাল-সবুজের পতাকা থাকবে, শেখ মুজিবের নাম থাকবে। বাংলার প্রতিটি জনপদে, সবুজ প্রকৃতিতে, সমুদ্রের গর্জনে, বর্ষার বৃষ্টিতে, জ্যোত্স্না রাতের চাঁদের আলোতে বঙ্গবন্ধুর প্রতিচ্ছবি ভেসে বেড়াবে অবিরাম, অবিরত, অনন্তকাল পর্যন্ত।