দত্ত স্যার ও তমালের গল্প
প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০১৩, ১৮:০১
অশনি কুমার দত্ত, আমাদের দত্ত স্যার। দেশপ্রেম ও আদর্শের এক প্রতিচ্ছবি।
চারদিকে খবরটা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। দত্ত স্যারকে রাজাকাররা বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে মাখল ইস্কুলের কাছে রাস্তার পাশে গুলি করে ফেলে দেয়। কেউ বলে মারা গেছেন। কেউ বলে এখনো জীবিত আছেন। খবরটা তমালের রক্তে যেন আগুন ধরিয়ে দেয়। নিজেকে আর ঠিক রাখতে পারেনি। দেয় দৌড়। এক দৌড়ে স্যারের বাড়ি।
দত্ত স্যার মেঝেতে শুয়ে আছেন। রক্তে ঘরটা ভেসে যাচ্ছে। স্যারের বাঁ পায়ে হাঁটুর নিচে একটা গামছা দিয়ে শক্ত করে বাঁধা আছে। পুরো গামছাটাই রক্তে ভেজা। তিনি অনেকক্ষণ পর চোখ মেলে তাকান।
তমাল স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলে। স্যার আপনি বেঁচে আছেন। এর চেয়ে বড় পাওয়া আমাদের আর কিছুই নেই। শুনেছি রমজানের নেত্রীত্বেই নাকি আপনাকে ধরে নিয়ে যায়। ওতো এক সময় আপনার ছাত্র ছিল। ছাত্র মানে কুখ্যাত ছাত্র। পুরো ইস্কুলটা জ্বালিয়েছে। এখন গোটা জাতিকে জ্বালাচ্ছে। তবে অপকর্মের একটা শেষ আছে। আর সেই সময়টাও বেশি দূরে নয়।
স্যার আমি আপনাকে বলেছিলাম। আপনার সবাই চলে গেছে। আপনিও চলে যান। একা থাকাটা ঠিক হবে না। আজ যদি মারা যেতেন। মারাই তো গিয়েছিলাম। ভাগ্য ভালো। গুলিটা পায়ে লেগেছে। তুমি যাই বলো তমাল। এই বাড়ি ছেড়ে আমি থাকতে পারব না। আর এই মাটি ছাড়াও আমি বাঁচতে পারব না। মরতে হয়, আমি এই মাটিতেই মরব।
এমন সময় একজন গ্রাম্য ডাক্তার এসে হাজির। কেউ তাকে আনতে যায়নি। খবরটা শুনেই ছুটে এসেছেন তিনি। বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনৈতিককর্মী বা নেতা, তাদের কোনোরকম অসুস্থতার খবরটা শোনামাত্রই দৌড়ে ছুটে যান তিনি। দিন আর রাত নেই। খবর শুনলেই চলে যান। তিনি মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিতে প্রতিবেশী দেশে চলে যেতে যাচ্ছিলেন কিন্তু এলাকাবাসীর বাধার মুখে তিনি যেতে পারেননি। তাদের দাবি একটাই। তিনি এলাকা ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে পারেন না। অসুখ-বিসুখের কথা তো বলা যায় না। তখন তারা কার কাছে যাবে।
ডাক্তার দত্ত স্যারকে দেখে বলেন, ব্যান্ডেজ ও ওষুধপত্র লাগবে। যা আশেপাশে কোথাও নেই। গফরগাঁও বাজারে কয়েকটা ওষুধের দোকান আছে। ওখানে পাওয়া যাবে। গফরগাঁয়ের নাম শুনে ঘরে যারা ছিল সবার মুখ আপনিতেই শুকিয়ে আসে। কারণ সেখানে অসংখ্য পাক-মিলিটারি ও রাজাকার লোকজন শক্ত অবস্থানে আছে। সেখানে এমন কোনো দিন নেই পনেরো-বিশজন নিরীহ মানুষকে গুলি করে হত্যা না করে। ডাক্তার আবার বলেন, আপনাদের মাঝে এমন কোনো সাহসী লোক নেই? যিনি ওষুধ আনতে গফরগাঁও যেতে পারেন?
সবাই চুপচাপ। কারো মুখে কোনো কথা নেই। মাঝখান থেকে তমাল বলে ওঠে। আমি যেতে পারব। আমি যাব।
তমাল একটানা পায়ে হেঁটে গফরগাঁও বাজারে গিয়ে পৌঁছে। পথে কোনো বিপদ হয়নি কিন্তু যখন ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ কিনে পেছনে তাকায় তখন একজন রাজাকার খপ করে তার হাতে ধরে টেনে-হেঁচড়ে তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। তার ওপর চলে অমানবিক নির্যাতন। হাতের আঙ্গুলগুলো লাঠি দিয়ে পিটিয়ে থেতলে দেয়। হাঁটুতেও পেটায়। এক সময় তমাল অজ্ঞান হয়ে পড়ে। জ্ঞান ফিরলে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ায় তমাল। একজন বৃদ্ধ রাজাকার দরজার সামনে একটা চেয়ারে বসে আছে। তমাল তার কাছে গিয়ে বিনীতভাবে বলে, এই ওষুধগুলো নিয়ে যেতে না পারলে আমার মা মারা যাবেন। তিনি গুরুতর অসুস্থ। যে কোনো সময় মারা যেতে পারে। তাকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টাটা করতে আমাকে একটু সুযোগ দিন। প্রায় বিশ-পঁচিশ মিনিট অনুরোধের পর লোকটার মনটা একটু নরম হয়ে আসে। লোকটা বলে ঠিক আছে। যা। আর কোনোদিন বাজারে আসবি না।
দত্ত স্যার তমালের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলেন। তমাল দৃঢ়কণ্ঠে বলে, কাঁদবেন না স্যার। দোয়া করবেন, রমজান রাজাকারের বিচার না করে আমার যেন মৃত্যু না হয়।
ডিসেম্বর মাস। চারদিকে তুমুল যুদ্ধ চলছে। মানুষের মুখে মুখে একটা কথা খুবই জোরালোভাবে ভেসে বেড়াচ্ছে। পাকিস্তানি মিলিটারিরা আর বেশিদিন টিকতে পারবে না। কারণ মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা আক্রমণে ওরা দিশেহারা হয়ে পড়ছে। ওদের মনোবল ভেঙ্গে গেছে। যে কোনো দিন আত্মসমর্পণ করতে পারে।
রাজাকার বাহিনীর সদস্যদের অবস্থা আরো খারাপ। ওরা নাকি ক্যাম্প থেকে পালিয়ে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছে। কেউ কেউ ধরা পড়ে গণধোলাইও খাচ্ছে। রমজান নাকি ক্যাম্প থেকে পালিয়ে এসে তার বাড়ির কাছে বাঁশঝাড়ে আশ্রয় নিয়েছে। খবরটা শোনামাত্রই তমাল একদৌড়ে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে চলে যায়। ওরা এসে বাঁশঝাড়টা ঘেরাও করে রমজানকে পাকড়াও করে ফেলে। রমজান ধরা পড়েছে। খবরটি বাতাসের বেগে সারা গ্রাম জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। মাখল প্রাইমারি ইস্কুল মাঠে রমজান রাজাকারের বিচার চলছে। লোকজনে মাঠটি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে আছে। সেখানে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। সবার মুখে একই কথা রমজানকে আমাদের মাঝে ছেড়ে দিন।
দত্ত স্যার আর মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডার নূরুল আমিন পাশাপাশি চেয়ারে বসে আছেন। তাদের সামনে বসা রমজান রাজাকার। সে হঠাত্ করে দত্ত স্যারের পায়ে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকে। স্যার আমাকে মাফ করে দিন। আমার প্রাণটা ভিক্ষা দিন। আমি ভুল করেছি। এমন ভুল আর বাকি জীবনে করব না। এখন আপনারা যা বলবেন তাই আমি করব। আমি সারাজীবন আপনাদের খেদমত করব।
নূরুল আমিন সাহেব দত্ত স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে বলেন, স্যার আপনি একটা রায় দিন। উত্তেজিত জনতা আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
নূরুল আমিন তুমি আমার ছাত্র। একজন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার। জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করে এদেশ স্বাধীন করেছ। তোমাদের এই ঋণ জাতি কোনোদিন শোধ করতে পারবে না। আজ একটা কথা তোমাকে রাখতে হবে।
বলুন স্যার।
রমজানকে ক্ষমা করে দেয়া যায় না?
স্যার, আপনি বললে পারবো না কেন? তবে কাজটা কিন্তু মোটেই ঠিক হবে না। এই জন্য গোটা জাতিকে একদিন মাশুল দিতে হবে। শত্রু কখনো মিত্র হয় না।