নূতন একটি বৈশ্বিক সমীক্ষা বলিতেছে, বিশ্বে আগের চাইতে মানুষের রাগ, দুঃখ ও দুশ্চিন্তা বাড়িয়াছে। বিশ্বের ১৪০টি দেশের প্রায় দেড় লক্ষ লোকের সাক্ষাত্কারের ভিত্তিতে সমীক্ষাটি করিয়াছে যুক্তরাষ্ট্রের জনমত জরিপ প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ। ইহাতে দেখা গিয়াছে যে, গত দুই বত্সরের চাইতে দুঃখী ও রাগী লোকের সংখ্যা বাড়িয়াছে বিশ্বজুড়িয়া।
মানুষের দুঃখ বাড়িয়াছে—ইহার সরল অর্থ হইল মানুষের স্বস্তি কমিয়াছে। সমাজ বিশ্লেষকরা অবশ্য ইহাও বলেন যে, মানুষের সুখের চাহিদা বৃদ্ধি পাইলে সুখ বা স্বস্তি হ্রাস পাইতে পারে। তবে সুখ বা স্বস্তির চাহিদা তখনই বৃদ্ধি পায়, যখন পারিপার্শ্বিক পরিবেশে একজন ব্যক্তি স্বস্তির আবহে থাকে। অর্থাত্ সে যত পায় ততই চায়; কিন্তু জীবনযাপনে ও পারিপার্শ্বিকতায় দুঃখের কারণ বৃদ্ধি পাইলে মানুষের সুখ-শান্তি তো কমিবেই। মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, দুঃখ ও হতাশা হইতেই একজনের মধ্যে ক্রোধের উন্মেষ ঘটে। যিনি তুলনামূলক স্বস্তি ও শান্তিতে থাকেন তিনি সহজে রাগিয়া যান না সাধারণত। ফ্রয়েডের মতে, অন্যের প্রতি আক্রমণ মানুষের নিজের প্রতি ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তির এক রকম আত্মরক্ষামূলক আচরণ মাত্র। আলবার্ট বান্দুরার মতো মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, ব্যক্তির অনিয়ন্ত্রিত রাগ মূলত তিনি পরিবেশ হইতেই আত্মস্থ করেন। তবে এই বিষয়ে অন্যতম গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব দিয়াছেন জন ডোরাল্ড। তাহার ফ্রাস্ট্রেশন-অ্যাগ্রেশন মতবাদ অনুযায়ী, রাগ মূলত মানুষের আশাভঙ্গ, নিষ্ফলতা, ব্যর্থতার প্রতিক্রিয়া। বিশেষ করিয়া সেই আশাভঙ্গ বা বিফলতার মাত্রা যদি গ্রহণযোগ্য না হয় বা ইহার মাত্রা যদি গভীরতর হয়। অন্যদিকে সাম্প্রতিক বিশ্বে যে অস্থির এবং অশান্তির বাতাবরণ দেখিতে পাওয়া যায়, তাহার প্রতিফলন ঘটিতেছে ব্যক্তিমানসেও।
বিস্ময়কর ব্যাপার হইল, বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই কমবেশি বাড়িয়াছে প্রাচুর্য ও ভোগবিলাস; কিন্তু এত প্রাচুর্যময় পৃথিবীতেও মানুষের মনে স্বস্তি, শান্তি হারাইয়া যাইতেছে। একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার বার্ষিক গ্লোবাল পিস ইনডেস্ক অনুযায়ী বিশ্বের ৯২টি দেশ পূর্বের তুলনায় আরও বেশি অশান্ত হইয়াছে। স্বস্তিদায়ক বিশ্বের স্বার্থে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গঠন করা হইয়াছিল জাতিসংঘ। কথা ছিল সেইখানে উন্নত, অনুন্নত, ধনী, গরিব সকল রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা তাহাদের কথা বলিতে পারিবে; কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদ গঠন করিয়া নষ্ট করা হইয়াছে জাতিসংঘের মূলশক্তিকে। যাহার ফলে কোনো কোনো রাষ্ট্র জাতিসংঘকে পাশ কাটাইয়াও নিজের পছন্দানুযায়ী সিদ্ধান্ত লইতে দ্বিধা করে না। আমরা দেখিয়াছি, ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর নূতন নূতন অজুহাতে যুদ্ধ-মৃত্যু আর আগ্রাসন বিস্তৃত হইয়াছে বিশ্বজুড়িয়া। দেশে দেশে নিভৃতে ছড়াইয়া পড়িয়াছে এক হিমশীতল ‘ভয়ের সংস্কৃতি’। সেই ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে গ্রাস করিতেছে বিশ্বের সব রাষ্ট্রের অন্তর।
সুতরাং এইভাবে চলিতে থাকিলে ‘সুখ তুমি কি বড় জানতে ইচ্ছে করে’ গানের মতো সুখ-শান্তি-স্বস্তি নামক শব্দগুলি কেবল অভিধানে আটকাইয়া থাকিবে। ইহার বিপরীতে রাগ, দুঃখ ও দুশ্চিন্তা প্রতিনিয়ত হানা দিতে থাকিবে মানুষের মানচিত্রে।