পূর্বপ্রস্তুতি আর পূর্বাভাসে রক্ষা পেল মানুষ

ওড়িশায় বেপরোয়া তাণ্ডব চালিয়ে, পুরী আর ছিমছিম ভুবনেশ্বরকে তছনছ করে পশ্চিম বাংলায় এসে হেরে গেল ফণী। প্রথমে ফণা খানিকটা উঁচিয়ে ফোঁস ফোঁস করতে করতে নদীয়া, মুর্শিদাবাদ হয়ে বাংলাদেশ, তার নামকরণের উত্সভূমিতে পালিয়ে গেল ফণী। প্রশাসনিক সতর্কতায় ভয়ংকর ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে বাঁচল পশ্চিমবঙ্গ, রক্ষা পেল গরিবের ঝুপড়ি, লোকালয়, সৈকতসংলগ্ন দীঘা, শঙ্করপুর, মান্দারমণিও কতালসারির অসংখ্য হোটেল। ঘরবাড়ি। 

শুক্রবার আশঙ্কা আর উদ্বেগে দিন কেটেছে আমাদের। এই বুঝি উপকূলবর্তী এলাকায় উড়ন্ত দস্যুরা ঝাঁপিয়ে পড়ে, এই বুঝি পুরী আর ভুবনেশ্বরের মতো পশ্চিম বাংলায় বহুতল, হাসপাতাল, সৈকতবাসগুলোকে ধ্বংসস্তূপ বানিয়ে দেয়। সারাদিন আমরা কখনো টিভির সামনে, কখনো শহরে ঘুরছি, ঘন ঘন ফোন করছি, ফোন আসছে দুই মেদিনীপুর জেলা থেকে, সুন্দরবন লাগোয়া উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা থেকে। দুদিনের নির্বাচনী প্রচার বন্ধ রেখে দুর্যোগের চিহ্নিত কেন্দ্রস্থলে বসে থাকলেন পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পূর্বাভাস ছিল, কলকাতায় ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার বেগে ঝড় বইবে, আশঙ্কা আর চাপা উদ্বেগ নিয়ে রাস্তায় নামল প্রশাসন। কলকাতার মেয়র আর নগর উন্নয়নমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম দিনভর বিশ্রামহীন, রাতে বিনিদ্র। গায়ে সাদা ফতুয়া, পরনে পাঞ্জাবি, উশকোখুশকো চুল। ঠান্ডা মাথায় অফিসে বসে, কখনো বাইরে বেরিয়ে তড়িঘড়ি সাজিয়ে তুললেন দুর্যোগ-মোকাবিলার পরিকল্পনা। দমকলবাহিনী, পুলিশ, কোস্টগার্ড সবাই প্রস্তুত। শহরের বিস্মৃত এলাকায় প্রস্তুত অসংখ্য পাম্পিং মেশিন। বস্তি এলাকায়, হাজার হাজার বাসিন্দাকে সরিয়ে এনে খোলা হলো প্রায় ১০০ ত্রাণ শিবির। ফিরহাদ সংযতভাষায় সংবাদমাধ্যমকে বারকয়েক বললেন, আমরা তৈরি। ত্রাণ শিবিরে যাদের  নিয়ে আসা হয়েছে, তাদের খাওয়া-দাওয়া, চিকিত্সাসহ যাবতীয় দায়িত্ব সরকারের।

দীঘাসহ উপকূলবর্তী সব শহরে, গ্রামেও একই ধরনের সতর্ক প্রস্তুতি। সমুদ্রতটের ছোট ছোট দোকানদার আর ঝুপড়িবাসীদেরও নিরাপদ আশ্রয়ে রাখার ব্যবস্থা করল সৈকতাবাসের উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। এসব সতর্কতার জন্যই দীঘা, শঙ্করপুরে পশ্চিমমেদিনীপুরে ফণী ঝাঁপিয়ে পড়ে, ধ্বংসাত্মক রূপ নিয়েও খুব একটা সর্বনাশের চিহ্ন আঁকতে পারেনি। হ্যাঁ মাত্র ২৩ সেকেন্ডে পশ্চিম মেদিনীপুরে খানিকটা লণ্ডভণ্ড কাণ্ড ঘটিয়ে গেল। জমির ধান নষ্ট হয়েছে। বহু বাড়ির চাল শূন্যে উড়ে গেছে, কেউ কেউ যত্সামান্য আহত হয়েছেন।

দিশাহারা মানুষ আশ্রয় দিয়েছেন ত্রাণ শিবিরে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বকখালি ফেজারগঞ্জ ও উপকূলবর্তী অন্যান্য এলাকায় ফণীর ঝড়ো হামলা ঝাঁপিয়ে পড়ে। উগ্র বাতাস সামুদ্রিক গর্জন ধেয়ে আসে সন্ধ্যার দিকে। মাঝরাতে ছাউনি উড়ল, ধানক্ষেত জলে ডুবল, ক্ষুব্ধ ঢেউ ছড়িয়ে সমুদ্রতট ছাড়িয়ে নদী বেয়ে ছুটতে থাকল সুন্দরবনের জলেজঙ্গলে; কিন্তু ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কাকে রুখে দেয় সঙ্ঘবদ্ধ পূর্ব প্রস্তুতি। এখানে গর্বের সঙ্গে বিনীত ভাষায় বলা দরকার, যা শুরুতেই খানিকটা বলেছি যে, মহাপ্রকৃতির আর্শীবাদ, আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস এবং সরকারের সর্বময়, যুদ্ধকালীন সতর্কতা পশ্চিমবঙ্গের দুর্গতিপ্রবণ, ঝড়প্রবণ অঞ্চলকে অঞ্চলের গরিবগুর্বাকে বাঁচিয়ে দিল। ২০০৯ সালের আয়লার প্রাক্কালে যদি এরকম পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়া যেত, তাহলে বেনজির সর্বনাশের হামলা থেকে দুর্গত এলাকার অসংখ্য বাসিন্দাকে বাঁচানো অনেকটাই সম্ভব হয়ে উঠত। ১৯৯৯ সালের মহাসাইক্লোনের দুর্যোগ থেকেও খানিকটা রক্ষা পেত বহু প্রাণ, বহু জীব, গ্রাম শহরের লোকবসতি, মাছ চাষের ভেড়ি, জমির ফসল।

এই লেখা লিখতে লিখতে বারবার মনে হচ্ছে ধ্বংসকামী আগুনকে মানুষ রুখতে পারে, বাঁধ দিয়ে বন্যার তাণ্ডবও কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব; কিন্তু সমুদ্রকে, ঘূর্ণিঝড়ের আক্রোশ রোখার সার্বিক কৌশল এখনো দূরঅস্ত। আশাবাদী মানুষ আমি, মৃত্যু থেকে কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়েও বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখি, তাই বিশ্বাস করি বিজ্ঞান একদিন সমুদ্রকে, ঘূর্ণির ভয়ংকরকেও বশে আনার পথ বাতলে দেবে। মানুষের ভেতরের আর বাইরের শক্তি কী বিশাল। কী অনন্ত তার প্রতিরোধের সাধনা। কী অশেষ তার মঙ্গলবোধের প্রক্রিয়া।

ওড়িশায়  আমরা কী দেখলাম। পূর্বাভাসকে প্রশাসন অবহেলা করল না। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার জোট বেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ভোট প্রচার বন্ধ রেখে দিল্লিতে ঘন ঘন বৈঠক করছেন প্রধানমন্ত্রী। সমুদ্রে ৭টি যুদ্ধজাহাজ মোকাবিলায় প্রস্তুত। পুরীতে সকাল আটটায় হামলা করল ফণী। কয়েক ঘণ্টায় সৈকত শহর লণ্ডভণ্ড। হোটেল গগনচুম্বী বাড়িগুলো মুহূর্তে ধ্বংসস্তূপ। মানুষের আর্তনাদ আর সমুদ্রের গর্জন ঝড়ো হাওয়ায় ভাসছে। ভাসছে শহর। ভাসছে আশেপাশের লোকালয়। মানুষ পালাচ্ছে।

ভুবনেশ্বরেও একই তাণ্ডব চিত্র। চোখের সামনে ভেঙে পড়ছে অসংখ্য টিভি চ্যানেলের টাওয়ার। বহুতলের দরজা-জানলা ছেঁড়া ঘুড়ির মতো বেসামাল হাওয়ায় উড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে চিত্কার, আ গিয়া। ঠিক তক্ষুণি মেডিকেল কলেজের কাচের জানলা বিকট আওয়াজের ধাক্কায় ভেঙে পড়ে ঝুলতে থাকল, উড়তে উড়তে এখানে ওখানে থুবড়ে পড়ল। কলেজভবনের নিচে উল্টে গেল বাস, কিঞ্চিত দূরে আরেকটি বাসও উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল। ভেতরে আশ্রিত মানুষ, অসহায় মানুষ। কান্না, আর্তনাদ জল ঝড়ের গর্জনে ডুবে গেল মুহূর্তে। এদৃশ্য দেখা যায় না। ভাবা যায় না। উড়ছে টিনের শেড, লুটিয়ে পড়ছে ইটের দেওয়াল। আহত অনাহতেরা পালাচ্ছেন, মিনিট কয়েকের মধ্যেই শহর জনশূন্য, বিদ্যুত্হীন। নিরাপত্তা রক্ষীরা হতভম্ব। তছনছে খন্ডহর হয়ে নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে থাকল শহর। ফিরে এল কুড়িবছর আগের মহাসাইক্লোনের দুঃসহ স্মৃতি।

পূর্বসংকেত পেয়ে তৈরি ছিল ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টানায়কের প্রশাসন। রাজ্যের এগারো জেলায় আগেই বিচ্ছিন্ন করে দেয় বিদ্যুত্ সংযোগ। অসংখ্য ত্রাণ শিবিরে সরিয়ে আনে ভয়ার্ত মানুষকে; কিন্তু দুর্যোগের লম্ফঝম্পের ওপর তাদের হাত নেই। উত্তাল সমুদ্র লাফাচ্ছে। পাহাড়ের মতো উঁচু ঢেউ তুলে ধেয়ে আসছে। সমুদ্রতটের শহর পেরিয়ে আগ্রাসী সেনার মতো দূর দূরান্তের গ্রামেও ঢুকে পড়ছে। উপড়ে পড়ছে গাছ। উড়তে উড়তে ডানাভাঙা পাখিরা জলস্রোতে, ঝড়ো হাওয়ায় লাশ হয়ে তলিয়ে যাচ্ছে। ভাসছে পশু, গবাদি পশু। হাড়গোড় ভাঙছে দিশেহারা মানুষের। আহতের আর্তনাদ প্রাণরক্ষার চিত্কার ঝড়ের স্রোতে হাবুডুবু খাচ্ছে। মানুষ লড়ছে, বাঁচতে চাইছে। তবু ৩৪ হাজার গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে। মৃতের সংখ্যা ৮। ক্ষয়ক্ষতির হিসেব নেই। দিশেহারা সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যস্ত। মৃত আর আহতের সংখ্যা হয়তো বাড়বে।

বলতে দ্বিধা নেই, পূর্বপ্রস্তুতি আর পূর্বাভাসের সংকেত যদি না থাকত, তাহলে হাজার হাজার লাশ সমুদ্রজলে, লোকালয় আর তটরেখায় পড়ে থাকত। স্তব্ধ আর্তনাদের সঙ্গী হয়ে আমাদের ভয়, আমাদের উদ্বেগ, আমাদের অসহায়তাকে ভারী অসহনীয় করে তুলত।

n লেখক : ভারতীয় সাংবাদিক,

আরম্ভ পত্রিকার সম্পাদক