বাজার অর্থনীতি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার অভিজ্ঞতা

বাজার অর্থনীতিতে সরকার কীভাবে কাজ করবে এটা একটি অমীমাংসিত বিষয়। মোটা দাগে, অর্থনীতিতে সরকারের ভূমিকার বিষয়টি দুইভাগে আলোচনা করা যায়। প্রথমত, অর্থনীতির স্বাভাবিক অবস্থায় ও দ্বিতীয়ত, মন্দার সময়ে। মন্দার সময়ে সরকার কীভাবে কাজ করবে এটাই আজকের প্রবন্ধের মূল উপজীব্য। ২০০৮ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার পর বাজার অর্থনীতিতে সরকারের ভূমিকা নতুন করে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চলে আসা বাজার অর্থনীতির লাগাম টেনে ধরতে বৃহত্ অর্থনীতির সরকার প্রধানগণ বাজার নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন। এর সুনির্দিষ্ট দুটি কারণ রয়েছে। এক) বাজার ব্যর্থ (market failure) হলে যদি সরকারকেই সকল দায়িত্ব নিতে হয় তবে কেন তা বাজার ব্যর্থ করার পূর্বেই নয়; এবং দুই) মন্দাপরবর্তী সময়ে সরকার ব্যতীত আর কোনো অর্থনৈতিক এজেন্টের ক্ষেত্রেই এ দায়িত্ব পালনের সুযোগ নেই। তাই মন্দাপরবর্তী সময়ে সরকার হয়ে ওঠে অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ট। ১৯৩০-এর মহামন্দার পর পৃথিবীর ইতিহাসে বেশ কয়েকবার মন্দা হয়েছে। যেমন, ১৯৭০ দশকের তেল সংকটের কারণে, ১৯৮০ দশকে এশিয়ার পুঁজিবাজারে চরম বিপর্যয়ের কারণে এবং সবশেষে ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের বিপর্যয়ের কারণে। ২০০৮ সালের এ মন্দাকে মহামন্দা (Great Depression) না বললেও শুধু মন্দা বলা হয়নি বরং Great Recession নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

মন্দার সময়ে সরকার কিভাবে কাজ করে এ নিয়ে অর্থনীতিতে দুই ধরনের মতবাদ প্রচলিত রয়েছে। একদল অর্থনীতিবিদ মনে করেন, মন্দার সময়ে সরকারের ব্যয় কমিয়ে (কিংবা কর বাড়িয়ে) অর্থনীতির ভারসাম্য আনা সম্ভব। আরেক দল মনে করেন, সরকারের ব্যয় বাড়িয়ে (কিংবা কর কমিয়ে) অর্থনীতির ভারসাম্য আনা সম্ভব। ২০০৮ সালের মন্দাপরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বৃহত্ রাষ্ট্রগুলো মূলত সরকারের ব্যয় বাড়িয়ে অর্থনীতিকে মন্দা থেকে বাঁচানোর কৌশল নিয়েছিল। সরকারের ব্যয় বাড়ানো কিংবা কমানো কোন কৌশলটি সঠিক তা চূড়ান্তরূপে এখনো নির্ধারিত নয়। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, মন্দাপরবর্তী সময়ে দেশকে বাঁচানোর জন্য অর্থনৈতিক কৌশলের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও বিচারিক কৌশল অবলম্ব্বন করা জরুরি। মন্দাপরবর্তী সময়ে আইসল্যান্ড সরকার কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপগুলো আলোচনা করে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। মন্দার কারণ হিসেবে আর্থিক বাজারের বিপর্যয়কেই প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে; কিন্তু মন্দার প্রভাব একেক দেশের জন্য একেক রকম হয়ে থাকে।

২০০৮ সালের মন্দার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশটির নাম আইসল্যান্ড। ২০০৩-০৪ সালে সে দেশের পুঁজিবাজার প্রায় ৯০০ শতাংশ বৃদ্ধি পায় এবং পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৩ হতে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আইসল্যান্ডের মানুষের সম্পদ প্রায় শতকরা ৩০০ ভাগ বেড়ে গিয়েছিল। দীর্ঘ সময় ধরে মুক্তবাজার অর্থনীতির লাগামহীন অগ্রযাত্রার পাশাপাশি বিনিয়োগের সুদের হার প্রায় ১৫ শতাংশ দিতে পারায় আইসল্যান্ডের ব্যাংকগুলো বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের প্রধান আকর্ষণের জায়গা হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। ২০০৮ সালের অক্টোবর মাসে এক সপ্তাহের ব্যবধানে আইসল্যান্ডের বৃহত্ তিনটি ব্যাংক (যা আর্থিক বাজারের ৮৫% নিয়ন্ত্রণ করত) একই সঙ্গে দেউলিয়া হয়। আইসল্যান্ডের আর্থিক বাজারের মূল্য সে দেশের মোট দেশজ উত্পাদনের প্রায় ১৪ গুণ। আইসল্যান্ডের অর্থনীতি চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়লেও সরকারের নেওয়া কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপের কারণে এর পুনরুদ্ধার অনেক তাড়াতাড়ি ঘটেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার গ্রহণ করলেও মন্দাপরবর্তী সময়ে অর্থনীতিকে বাঁচানোর জন্য সরকারের দৃঢ় ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপই মূল ভূমিকা পালন করেছে। ২০০৮ থেকে ২০১০ পর্যন্ত সময়ে আইসল্যান্ডের মুদ্রা ক্রোনা শতকরা ৬০ ভাগ অবমূল্যায়ন করা হয়েছিল। ফলশ্রুতিতে আগে যেখানে আইসল্যান্ড ভ্রমণ পর্যটকদের জন্য অনেক ব্যয়বহুল ছিল তা অনেক সহজলভ্য হয়ে যায়। ফলে ২০১৬ সালে আইসল্যান্ডের মোট জনসংখ্যার ৪.৫ গুণ পর্যটক সেদেশে আসে— যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল। পক্ষান্তরে, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত আয়ারল্যান্ডের মুদ্রা ইউরো হওয়ায় সে দেশ মুদ্রার কোনোরূপ অবমূল্যায়ন করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় ব্যাংকগুলোকে বেইল আউট (bail out) করেছে, সেখানে আইসল্যান্ড ব্যাংকগুলোকে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্তীকরণ করেছে অথবা তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে বলেছে। যদিও সমালোচকগণ বলে থাকেন, জিডিপির তুলনায় আর্থিক বাজারের আয়তন বেশি হলে বেইল আউট করার প্রচলিত পদ্ধতি ঠিকভাবে কাজ করে না— যা আইসল্যান্ডের ক্ষেত্রে অনেক বেশি প্রযোজ্য। এছাড়া আইসল্যান্ডের পুঁজিবাজারে এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল যার মাধ্যমে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আলাদা করা হয়েছে।

তবে এ কথা বলতে দ্বিধা নেই যে, আইসল্যান্ড সরকার কর্তৃক গৃহীত রাজনৈতিক ও বিচারিক পদক্ষেপগুলো এক্ষেত্রে বেশি কার্যকর ছিল— যা দ্রুততম সময়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ ছিল উচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে নিম্নপর্যায়ের প্রায় ৩৯ জন ব্যাংকারকে আইনের আওতায় এনে বিভিন্ন মেয়াদে সাজার ব্যবস্থা গ্রহণ— যা অর্থনীতিতে এক ধরনের স্বস্তি নিয়ে আসে এবং মানুষের মাঝে আগামীর অর্থনীতি নিয়ে সরকারের ধনাত্মক ও সত্ পদক্ষেপের উপর আস্থা ফিরিয়ে আনে। এ বিশ্বাসের বিষয়টি সত্যিকার অর্থেই একটা অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চলক। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী গিয়ার হার্ডেকেও বিচারের আওতায় আনা হয়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, শুধু অর্থনৈতিক কৌশল অবলম্বন করে মন্দা এড়ানো খুব সফল কৌশল নয়। দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের মাধ্যমে বাজার অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে তা টেকসই ও ফলপ্রসূ হবেই। আইসল্যান্ডের অর্থনীতির পুনরুদ্ধার থেকে পৃথিবীর সকল দেশ শিক্ষা নিতে পারে।

১৯৩০-এর পর ১৯৪৫ বা তার কিছুদিন পর পর্যন্ত অর্থনীতিতে সরকারের ভূমিকা বেশ জোরালো ছিল। ১৯৪৫-এর পর থেকে ক্রমান্বয়ে সরকারের ভূমিকা কমে যেতে শুরু করে এবং ১৯৮০-৯০-এর দশকে তা ন্যূনতম পর্যায়ে এসে দাঁড়ায় এবং বাজার অর্থনীতির দর্শনই মূল চালিকাশক্তি হয়ে যায়। ২০০৮ সালে শুরু হওয়া বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার পর পুনরায় সরকারের ভূমিকা বাড়তে থাকে। কে জানে হয়তো আগামী ২৫/৩০ বছর পর মুক্তবাজার অর্থনৈতিক দর্শন আবার তার স্থান দখল করে নেবে এবং কোনো মন্দা কিংবা মহামন্দা সরকারকে পুনরায় বাজার অর্থনীতিতে জোরালো হস্তক্ষেপের আমন্ত্রণ জানাবে।

n লেখক :উন্নয়ন অর্থনীতি গবেষক