নিরাপদ হোক শিশুর ভবিষ্যত্

আরাফাত হোসেন ভূঁইয়া 

তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে হেলে পড়তে না পড়তেই অনাকাঙ্ক্ষিত  শোরগোল শুনে জেগে উঠলাম।  বেরিয়ে এসে দেখি ৭ কি ৮ বছরের একটি ছেলে বস্তা হাতে পুরনো জিনিসপত্রাদি কুড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে আর তাকেই বকাঝকা করছিল সবাই। ছেলেটির সঙ্গে মিনিট খানেক কথা বলেছিলাম, বাবা নেই ছেলেটির। ছোট্ট ভাইটিকে নিয়ে মা ভিক্ষা করে আর সে করে টোকাইয়ের কাজ। এরকম অসহায় পিতৃহীন সন্তান শুধু সেই নয়। প্রতিনিয়ত আমাদের চোখের সামনেই অসংখ্য শিশু অসহায় দৃষ্টিতে দেখছে আমাদের এই সভ্যতাকে। কিন্তু বলতে পারছে না কিছু। সভ্যতার এক সর্বাধুনিক যুগপ্রান্তে এসে কোথাও কোথাও এদের অসহায়ত্ব, আর্থিক দুর্বলতাকে ব্যবহার করে এদের ‘পণ্য’ বানিয়ে রেখেছে আমাদের সভ্যতা। তাই এরা স্বাধীন দেশের পরাধীন হিসেবেও বিবৃত হওয়ার যৌক্তিকতা রাখে। একজন উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্তের শিশু যেভাবে বড় হয়, একজন নিম্নবিত্ত এবং দরিদ্র ঘরের শিশু সেভাবে বড় হওয়ার সুযোগ পায় না। ফলে তারাও যে রাষ্ট্রের বিশাল একটি সম্পদ, তা তারা প্রমাণ করতে পারে না। এই অসহায় দরিদ্র সমাজ নিয়ে ভাববার জন্য খুব একটা সময় আমাদের কারো হয় না। আমরা কি ভেবে দেখেছি, সমাজের এই ‘পাপ’ (বৈষম্য ও শোষণ) আমাদেরই তৈরি? এসডিজি লক্ষ্যমাত্রায় শিশুশ্রম নিরসনের যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে তা বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে আমাদের সবার।

আমরা কি পারি না, দেশের এ ধরনের শিশুর জন্য পাবলিক বা প্রাইভেট উভয় ক্ষেত্রে রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে কিছু পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে? আমরা কি পারি না শিশুর ভিক্ষাবৃত্তি, শিশুশ্রম, পথে-প্রান্তরে উদ্দেশ্যহীন ঘোরাফেরা করা ছিন্নমূলদের জন্য কিছু করতে?  এসব কাজ থেকে সমাজের দরিদ্র, অসহায়-বঞ্চিত শিশুদের সরিয়ে রাখতে?  কাজটা কি খুব কঠিন বা ব্যয়বহুল? এরা শিশু, তাই এদের পেছনে সময় ব্যয়ে ‘ভোট’ বাড়বে না! এরকম ভাবনা যদি থাকেও, সেটাকে পরিত্যাগ করতে হবে দেশের স্বার্থে। টেলিভিশনে নানা অনুষ্ঠানে খুদে-বড় শিল্পী যেমন আমরা পেয়ে যাই, তেমনি করে সমাজের দরিদ্র ও বঞ্চিত শিশুদের সঠিক পরিচর্যা, ভালোবাসা, স্নেহ দিয়ে বড় হতে দিলে ভবিষ্যতে ওদের মধ্য থেকেও বেরিয়ে আসবে যুগের শ্রেষ্ঠ কেউ। বিবিএসের (ব্যুরো অব বাংলাদেশ স্ট্যাটিসটিক্স) সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশে দরিদ্র শিশুদের মধ্যে স্কুলে যায় না প্রায় ২৪ লাখ। মজুরি পায় না ১৬ লাখ, কৃষি ও কলকারখানায় কাজ করছে ৬৫ ভাগ শিশু। শিশুশ্রম সমীক্ষা ২০১৩ অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ১৭ লাখ শিশু শিশুশ্রমের আওতাধীন। এদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে রয়েছে প্রায় ১৩ লাখ। আর আড়াই লাখেরও বেশি রয়েছে অত্যধিক ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। ভাবতে কষ্ট লাগে।

পাঁচ বছরের কম বয়সী একটি মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের পরিবারে শিশুর কী যত্ন, কী আদর ভাবা যায়! আর উল্টোদিকে পাঁচ বছরের শিশুটি সকালে এক লোকমা ভাতের জন্য মাকে জড়িয়ে কাঁদে। অথবা মায়ের কোলে উঠে পথে আসে ভিক্ষার হাত বাড়িয়ে। একেই বলে সভ্যতা! সামাজিক বৈষম্য দেশের বিরাট একটা অংশের শিশুর শিক্ষার পথে অন্তরায়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, ভবিষ্যত্ উন্নতি, অগ্রগতি, এর সঙ্গে শিশুদের সামাজিক নিরাপত্তা এবং ওদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের প্রশ্নটি উপেক্ষার সুযোগ নেই। কোনো শিশুকে তার জীবনের আলোর পথে বঞ্চিত রেখে রাষ্ট্র বা সমাজ আলোর পথে অগ্রসর হতে পারে না। কারণ শিশুরা জাতির আগামী দিন এবং আলোকিত সম্ভাবনার একেকটি কলি। এদের ভেতরই লুকিয়ে রয়েছে এক একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত্। কবির ভাষায়: ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা,সব শিশুদের অন্তরে”— আসুন, এই শিশুদের নিয়ে একটু ভাবি। বদলে দেই সমাজধারা; নিরাপদে রাখি শিশু, নিরাপদ রাখি দেশ।

n লেখক:শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়