ক্ষমতাসীন দল মাঠে নেই

সাম্প্রতিক সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে দায়িত্ব দেয়া হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের পাশে নেই ক্ষমতাসীন দল। ফলে প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে চাপা অসন্তোষ বিরাজ করছে। অনেক ক্ষেত্রে সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে অনীহার ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনকারীদের বিচারের প্রেক্ষাপটে দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ইতিমধ্যে সহিংস রূপ নিয়েছে। একদিকে বিএনপি, জামায়াতসহ ১৮ দলীয় জোট। অপরদিকে যুদ্ধাপরাধের বিচারের পক্ষে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বামমনা ১৪ দল। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকায় দলীয় কার্যালয়ের সামনে গতানুগতিক সমাবেশ আর কিছু কিছু জায়গায় স্বল্প সংখ্যক সমর্থক নিয়ে হরতাল বিরোধী মিছিল করেছে। যুদ্ধাপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করে শাহবাগে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চের উত্তাপ ইতিমধ্যে অনেকটা কমে এসেছে। এ রকম বাস্তবতায় সম্প্রতি সরকার সন্ত্রাস ও নাশকতা প্রতিরোধ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। জেলায় ডিসি ও উপজেলায় ইউএনওর নেতৃত্বে এই কমিটি ইতিমধ্যে গঠন করা হয়েছে। এছাড়া পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদভুক্ত এলাকায়ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি সমন্বয়ে কমিটি হয়েছে। জেলা ও উপজেলা কমিটিতেও রয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি। একাধিক ডিসি ও ইউএনওর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই কমিটিতে নৃেত্বত্ব দেয়া তাদের জন্য বিব্রতকর। তারা বলছেন, বিষয়টি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। রাজনৈতিকভাবেই পরিস্থিতি মোকাবেলার সিদ্ধান্ত নেয়া না হলে শুধু প্রশাসনিক ক্ষমতা দিয়ে এটি মোকাবেলা সম্ভব নয়। বেশ কয়েকজন জেলা প্রশাসক বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি তাদের শ্রদ্ধা রয়েছে। তাই তারা এ ধরনের কমিটির মাধ্যমে অপপ্রচার বন্ধ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার জন্য মানুষকে বোঝাবার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু এখন বোঝাবার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে আওয়ামী লীগের মাঠে না থাকায় তারা অসহায় বোধ করছেন। প্রসঙ্গত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি শেষ হওয়া সংসদ অধিবেশনের সময় অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সভায় প্রত্যেক সংসদ সদস্যকে এলাকায় গিয়ে সহিংস আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়া ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে সে নির্দেশ মানা হচ্ছে না। ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে, হামলা-নির্যাতনের সময় বা পরে প্রশাসন বা সরকারি দলের সাহায্য পাওয়া যায়নি বা যাচ্ছে না। এ রকম অভিযোগ উঠার পর সাতক্ষীরার তিনটি উপজেলা থেকে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে একযোগে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। তবে প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, রাজনৈতিক কর্মসূচি মোকাবেলার জন্য রাজনৈতিক কর্মসূচি না থাকলে প্রশাসন নিষ্ক্রিয় থাকতে বাধ্য। তারা বলছেন, ক্ষেত্রবিশেষ সরকারি দলের এমপিরা এলাকায় থাকলেও সমস্যা, না থাকলেও সমস্যা। থাকলে থানা পর্যায়ে সীমিত পুলিশ দিয়ে এমপির নিরাপত্তা দিয়ে গ্রামীণ জনপদের স্বাভাবিক আইন-শৃংখলা রক্ষা এবং সহিংস আন্দোলন ঠেকানো কষ্টকর। আবার যদি তারা থাকেন সেক্ষেত্রে হরতালকারীরা অনেক সময় কম সহিংস হয়। মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, যদি রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে সহিংস পরিস্থিতি মোকাবেলার উদ্যোগ নেয়া না হয় তবে প্রশাসনের পক্ষে সার্বিক পরিস্থিতির দায় নেয়া সম্ভব হবে না। প্রশাসনের কর্মকর্তারাই বলছেন, অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রশাসন ব্যস্ত থাকার সুযোগে দেশের চুরি, ডাকাতি, খুন-যখমের মতো অপরাধের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। আর গ্রামীণ জনপদ এসব অপরাধের শিকার হচ্ছে বেশি। আতঙ্ক ছড়াচ্ছে চারদিকে। মানুষ ঝামেলা এড়াতে মামলা পর্যন্ত করতে সাহস পাচ্ছে না। সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. আকবর আলি খান এ প্রসঙ্গে বলছেন, যেকোনো রাজনৈতিক সংকট মোকাবেলায় রাজনৈতিক কর্মসূচি বা সিদ্ধান্ত নেয়াই সমীচীন। রাজনৈতিক কর্মসূচি ঠেকানোর দায়িত্ব প্রশাসনকে দেয়া হলে অনেক ক্ষেত্রে বিতর্কের সৃষ্টি হতে পারে। সেদিকে সতর্ক থাকা দরকার। তা না হলে অনেক সময় প্রশাসন নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়তে পারে। সাবেক আইজিপি এসএম শাহজাহান বলেছেন, পুলিশকে দিয়ে সব ধরনের কাজ করাতে গেলে বিপত্তি হতে পারে। এমনিতেই দেশে পুলিশকে বিভিন্ন সময় বিতর্কিত করা হয়েছে। তবে জাতির প্রয়োজনে পুলিশকে যে কোনো ধরনের দায়িত্ব পালন করতে হবে। কিন্তু দায়িত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা দরকার রয়েছে।