গোলকধাঁধায় রাজনীতি
নাজমুল হাসান ও শামছুদ্দীন আহমেদ
প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০১৩, ২২:২৭
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তরের শান্তিপূর্ণ ও টেকসই পদ্ধতি এখনো সুদূর পরাহত। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্বাধীনতা অর্জনকারী দেশগুলোর বেশিরভাগই এই সংকটে নিমজ্জিত। কার্যত রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তরের শান্তিপূর্ণ পদ্ধতির সন্ধান না পাওয়ার কারণেই এসব দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা সংকট স্থায়ী রূপ নিয়েছে। আর বছরজুড়েই কম-বেশি মাত্রায় রাজনৈতিক সংকট লেগে থাকায় অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতাও এসব দেশের নিত্যসঙ্গী। যার কারণে সামগ্রিক উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রায় এখনো পৌঁছতে পারেনি সিংহভাগ উন্নয়নশীল দেশ। অবশ্য কোনো কোনো দেশ এই সংকট থেকে ইতিমধ্যে কিছুটা হলেও বের হয়ে আসতে পেরেছে, অনেকে চেষ্টা করছে। আবার কোনো কোনো দেশে ক্রমেই তীব্র হচ্ছে এই সংকট।
বাংলাদেশসহ বেশিরভাগ উন্নয়নশীল দেশে যুগ যুগ ধরে এই সংকট বিরাজ করছে। এর কারণ হিসাবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অভাব, রাজনৈতিক দলগুলোর গণতন্ত্রহীনতা, কার্যত এক ব্যক্তির হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত থাকা, ক্ষমতার যথেচ্ছাচার, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও বাহিনীগুলোতে পেশাদারিত্বের অভাব, সর্বত্র দলীয়করণ এবং দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন ও অতি লোভের কারণেই এই অশান্তি। আইনের শাসন কিংবা সুশাসনের ঘাটতিও এসব দেশের রাজনৈতিক সংকটের অন্যতম কারণ। এছাড়া এসব দেশে যখন যারা ক্ষমতায় থাকে তারা এমন কার্যকলাপ করে, যার কারণে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে তারা ভয় পান। আর এই ভয় থেকেই তারা পরবর্তী নির্বাচনের ফল যে কোনোভাবে নিজেদের অনুকূলে নিতে নানা ‘ম্যাকানিজম’ করেন। এই কারণে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের কোনো পদ্ধতিই এখানে বেশিদিন টেকসই হয় না। মূলত এসব কারণেই বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল বেশিরভাগ দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা স্থায়ী সংকট হয়ে দেখা দিয়েছে এবং যখনই এসব দেশে নির্বাচনের সময় হয় তখন সংঘাত-সহিংসতা বেড়ে যায়। এর ফলে যথাসময়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে সবসময়ই এক ধরনের অনিশ্চয়তা থাকে এসব দেশে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ গতকাল ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, বাংলাদেশসহ বেশিরভাগ উন্নয়নশীল দেশে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তরের শান্তিপূর্ণ উপায় না থাকার অন্যতম কারণ হচ্ছে-এসব দেশে সরকারের হাতে এতবেশি ক্ষমতা থাকে যে, তারা যা খুশি তা করতে পারে বা করে। সেই অপরিসীম ক্ষমতার কারণেই হোক, কিংবা অন্য যে কারণেই হোক-সরকারগুলো ক্ষমতার ব্যাপক অপব্যবহার করে। ক্ষমতা না থাকলে তখন তাদের সবই হারাতে হয়। এ কারণে ক্ষমতায় টিকে থাকতে তারা মরিয়া হয়ে ওঠে, কোনোভাবেই ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চায় না। বৈধ কিংবা অবৈধ পন্থায় সরকারের নানা সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে একটি স্বার্থান্বেষী মহলও গড়ে ওঠে। এই মহলটিও তখন ক্ষমতার বাইরে যাবার প্রশ্নে নিজেদের নিরাপদ ভাবতে পারে না। এই বিষয়টি যতদিন ঠিক না হবে ততদিন এসব দেশে রাজনৈতিক সংকট বা অস্থিরতা চলতেই থাকবে।
বাংলাদেশসহ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্বাধীন হওয়া উন্নয়নশীল দেশগুলোর দিকে দৃষ্টি ফেললে দেখা যায়, কম-বেশি সব দেশেই রাজনৈতিক সমস্যা রয়েছে। যেসব দেশে সমস্যা প্রকট সেখানকার প্রধান কারণই হচ্ছে-রাষ্ট্রে ক্ষমতা হস্তান্তরের শান্তিপূর্ণ উপায় এখনো নিশ্চিত না হওয়া। এই একটি মাত্র কারণে পাকিস্তান সবসময়ই অস্থির বা উত্তাল থাকছে, নেপালে বর্তমানে সরকার নেই বললেই চলে। তবে দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়াসহ কোনো কোনো দেশ এই অবস্থা থেকে ইতিমধ্যে অনেকটাই বের হয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। ফিলিপিনও কিছুটা পেরেছে; কিন্তু বাংলাদেশ ও নেপালসহ কয়েকটি দেশে নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। লেবানন, উত্তর কোরিয়া, সিরিয়া, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, সুদান, সোমালিয়া, ইজরায়েল, ঘানা, সেনেগাল, ক্যামেরুন, বেনিন, পশ্চিম আফ্রিকা, উগান্ডা, উজবেকিস্তান, পূর্ব তিমুর ও কসোভোসহ অনেকগুলো রাষ্ট্রে লেগে থাকা সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মূল কারণও রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তরের শান্তিপূর্ণ পদ্ধতির অভাব।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলেও দেখা যায়- এখানকারও রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রধান কারণ ক্ষমতা হস্তান্তরের শান্তিপূর্ণ উপায় খুঁজে না পাওয়া। দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা এখনও মেলেনি। অনেক কাঠখড় পোড়ানোর পর ক্ষমতা হস্তান্তরের শান্তিপূর্ণ উপায় হিসাবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হলেও সেটিও টেকসই হয়নি কিংবা হতে দেয়া হয়নি। যার ফলে ১৯৯১ সালের পর সংসদীয় পদ্ধতির গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হলেও প্রতিবারই নির্বাচন নিয়ে কমবেশি অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। যার ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালে যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানই সম্ভব হয়নি। আসন্ন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন যথাসময়ে হবে কিনা তা নিয়েও অনিশ্চয়তা ভর করেছে জনমনে। সুশাসনের জন্য নাগরিক, সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এ ব্যাপারে গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, বাংলাদেশসহ অনেক উন্নয়নশীল দেশে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তরের শান্তিপূর্ণ উপায় টেকসই না হবার বড় কারণ দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অভাব। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে বলতে হয়, এখানে পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় থাকার অর্থ হচ্ছে রাজত্ব পাওয়া, লুটপাটের ইজারা প্রাপ্তি ও ফায়দা লোটার লাইসেন্স পাওয়া। সরকারের লোকজন অন্যায় করেও পার পেয়ে যায়। অন্তত পাঁচ বছরের জন্য এই গ্যারান্টি থাকে। ক্ষমতাচ্যুত হলে হামলা, মামলা ও নির্যাতনের কবলে পড়তে হয়। এজন্য এখানে ক্ষমতায় টিকে থাকার এবং ক্ষমতায় যাবার অদৃশ্য স্পৃহা থাকে রাজনৈতিক দলগুলোতে, তাদের অভিধানে নির্বাচনে হেরে যাওয়া বলতে কিছু নেই। তার মতে, এই দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন যতদিন বন্ধ না হবে ততদিন এই অশুভ প্রতিযোগিতা চলতেই থাকবে।
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল যেসব দেশে প্রায় অভিন্ন প্রকৃতির রাজনৈতিক সমস্যা বিদ্যমান, সেসব দেশের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়- ক্ষমতার প্রবল অপব্যবহারের কারণে ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতাহীন হতে ভয় পান। যে কারণে এখানকার সরকারগুলো নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রশাসনসহ আনুষঙ্গিক সবকিছুকে নিজেদের মত করে সাজিয়ে রাখে। যেন পরবর্তী নির্বাচনের ফলও নিজেদের ঘরে আসার শতভাগ গ্যারান্টি থাকে। নিজেদের অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপ ও স্বার্থান্বেষী মহলের কারণে সরকারগুলো এক পর্যায়ে জনগণের ওপরও আস্থা রাখতে পারে না। এজন্য নির্বাচন নিয়ে ‘ম্যাকানিজম’ করে। এছাড়া বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলের ভেতরে যেমন গণতন্ত্রের চর্চা নেই, তেমনি একটি দলের সঙ্গে আরেকটি দলের সম্পর্ক কিংবা আচরণের ক্ষেত্রেও গণতন্ত্র নেই। যারা ক্ষমতায় থাকে পাঁচবছর তারা নিরাপদে থাকেন, ব্যবসা-বাণিজ্য, সরকারি চাকরি সবকিছুই তাদের অনুকূলে থাকে। পক্ষান্তরে বিরোধী দলকে চলতে হয় নানা হয়রানি ও ঝামেলার মধ্যদিয়ে। এনিয়ে দেখা দেয় রেষারেষি। এই রেষারেষি ক্রমশ: তীব্র হতে থাকে। সরকার ও বিরোধী দলের এই রেষারেষির কারণেই ক্ষমতা হস্তান্তর ও নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়। এসব দেশের শাসনব্যবস্থায় খাতা-কলমে বিরোধী দল সরকারের অংশ হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। ‘পলিটিক্স ইজ আর্ট অব কম্প্রোমাইজ’ হলেও এখানে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় না। বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু থাকলেও পরমত কিংবা ভিন্নমত গ্রহণের মানসিকতায় রয়েছে দৈন্য। বরং অসহিষ্ণুতা ও প্রতিহিংসার রাজনীতির চর্চাই বেশি হয়। এছাড়া রাজনৈতিক সমস্যা রাজনৈতিকভাবে সমাধানের আগ্রহে রয়েছে প্রবল ঘাটতি। সর্বত্র দলীয়করণ ও রাজনৈতিক বিভক্তিই এখানকার স্বাভাবিক নিয়ম। ফলে এসব দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোও সবসময়ই প্রশ্নবিদ্ধ। সবমিলিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে। যার কারণে অনেক সময় ‘আগুনের সঙ্গে খেলা করলে ছাই নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়’- মহাত্মা গান্ধীর এই উক্তিরই বাস্তবতা মেলে এসব দেশের সাধারণ মানুষের কপালে।