বিজিএমইএ ভবন হাতিরঝিল প্রকল্পের জন্য ক্যান্সার

হাইকোর্ট বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক সমিতির (বিজিএমইএ) অবৈধ ভবন ৯০ দিনের মধ্যে ভেঙ্গে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে। একইসঙ্গে বিজিএমইএ যাদের কাছে ভবনের ফ্লোর বিক্রি করেছে তাদেরকে এক বছরের মধ্যে বিক্রির টাকা ফেরত দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আদালত রায়ে বলেছে, বিজিএমইএ ভবনটি সৌন্দর্য ও মহিমান্বিত হাতিরঝিল প্রকল্পের জন্য ক্যান্সারের মতো। এই ধংসাত্মক ভবন অচিরেই বিনষ্ট করা না হলে এটি শুধু হাতিরঝিল প্রকল্পই নয় সমস্ত ঢাকা শহরকে সংক্রমিত করবে। বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেনের ডিভিশন বেঞ্চের ঘোষিত পূর্ণাঙ্গ রায় গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত হয়েছে। ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল ওই বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করে। ঘোষিত ৭২ পৃষ্ঠার রায়ে বলা হয়, বিজিএমইএ ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে ঢাকা মাস্টার প্ল্যান, জলাধার আইন ও রাজউকের অনুমোদন গ্রহণ না করে এবং একান্তই বিজিএমইএ’র সদস্যদের নিজস্ব স্বার্থের খাতিরে। যার ফলে ভবনটি ভেঙ্গে দিতে সরকার ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষ বাধ্য। এছাড়া বিজিএমইএ যাদের কাছে ওই ভবনের ফ্লোর বিক্রি করেছে এবং সে জন্য করা চুক্তি ছিল বেআইনি। কেননা বিজিএমইএ’র ওই ভবন নির্মাণ বা ভবনের অংশ কারো কাছে বিক্রি করার কোন আইনগত অধিকার ছিল না। তবে ক্রেতারা যেহেতু নিজেরাও জানত বা তাদের জানা উচিত ছিল যে, এই জমির ওপর বিজিএমইএ’র মালিকানা নেই এবং ভবনটি বেআইনিভাবে নির্মাণ করা হয়েছে সুতরাং আদালতের মতে তারা কোন সুদ পাওয়ার দাবিদার নয়। রায়ে বলা হয়, আর্থিক প্রতিপত্তির কারণে ভবনটি নির্মাণ করে বিজিএমইএ বহু প্রত্যাশিত হাতিরঝিল প্রকল্প বাস্তবায়নে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে যা কোন অবস্থাতেই আইনের শাসনের আঙ্গিকে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আদালত বলেছে, বিজিএমইএ’র পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ ও ব্যারিস্টার আখতার ইমাম বলেছেন, বিজিএমইএ এমন একটি সংস্থা যা আমাদের অর্থনীতিতে অসামান্য অবদান রাখে। তাই তাদের ভবন ভাঙ্গা ঠিক হবে না। কোন অবস্থাতেই এই মতবাদের সঙ্গে আদালত একাত্মতা প্রকাশ করতে পারে না। কারণ একটি সংস্থা আর্থিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে এবং দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে বলে তাদের আইনের উর্ধ্বে রাখতে হবে এ যুক্তি কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিজিএমইএ’র সদস্যরা দেশের অর্থনীতিতে যেমন অবদান রাখছেন, দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা রাখার জন্য গার্মেন্টস শ্রমিকরাও তেমনি অবদান রাখছেন। তাদের শ্রমের জন্যই গার্মেন্টস কারখানা চলছে। হাজার হাজার প্রবাসী বাঙালিও দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে রাখছেন। দরিদ্র কৃষকদের অবদানও কোন অবস্থাতেই খাটো করার সুযোগ নেই। তাদের শ্রমের বিনিময়ে ফসল উত্পাদন হচ্ছে বলে বিরাট অংকের বৈদেশিক মুদ্রা বেঁচে যাচ্ছে। তাদের উত্পন্ন দ্রব্য না থাকলে বিজিএমইএ’র সদস্যসহ গোটা দেশের জনগণকে উপোষ থাকতে হতো। রায়ে বলা হয়, আর্থিক পেশীশক্তির অধিকারী বলে একটি শক্তিশালী মহলকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে এমন যুক্তি অগ্রহণযোগ্য। দেশের অন্য দশজনের মতো এই আর্থিক পেশীশক্তির অধিকারী লোকেরাও দেশের সাধারণ আইনের আওতাধীন। সংবিধান অনুযায়ী ধনী দরিদ্রের মধ্যে আইনের প্রয়োগের ব্যাপারে কোন বৈষম্য চলতে পারে না। বস্তুত একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা হিসাবে বিজিএমইএকে আইনের প্রতি আরও অধিক শ্রদ্ধাশীল হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। অথচ তারা তা না করে আইনকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে ব্যবহার করেছে। রায়ে বলা হয়, বিজিএমইএ’র ওই ভবনের জমির ওপর কোন মালিকানা নেই। কেননা জমিটি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল রেলওয়ের জন্য ১৯৬০ সালে। অধিগ্রহণ আইন অনুযায়ী কোন দাবিদার কর্তৃপক্ষের জন্য শুধু জনস্বার্থে কোন ভূমি অধিগ্রহণ করা যায়। পরে যদি দাবিদার কর্তৃপক্ষ অধিগ্রহণকৃত জমি বা সে জমির অংশ অপ্রয়োজনীয় মনে করে তাহলে দাবিদার কর্তৃপক্ষ সে জমি সরকার বা জেলা প্রশাসনকে ফেরত দিতে বাধ্য থাকে। সরকার সে অবস্থায় হয় ওই জমি অন্য কোন জনস্বার্থে ব্যবহার করবে অথবা জমি মূল মালিকের কাছে ফেরত দিতে বাধ্য থাকবে। এখানে দেখা যাচ্ছে, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ অর্থাত্ যাদের প্রয়োজনে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল তারাই মোট ৬.২১ একর জমি অপ্রয়োজনীয় বিবেচনায় ছেড়ে দেয় একই বছরে অর্থাত্ ১৯৬০ সালে। পরে ১৯৯৮ সালে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ওই জমি একটি স্মারকের মাধ্যমে বিজিএমইএকে এর নিজস্ব ভবন তৈরির জন্য বেঅইনিভাবে প্রদান করে। অথচ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ২০০৬ সালের আগ পর্যন্ত আদৌ ওই জমির মালিক ছিল না। রায়ে বলা হয়, ২০০১ সালে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো একটি লিখিত কিন্তু নিবন্ধনবিহীন দালিলের মাধ্যমে বেআইনিভাবে ওই জমি থেকে একটি অংশ বিজিএমইএকে প্রদান করার প্রয়াস পায়। অথচ তখনও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ওই জমির মালিকানা পায়নি। শুধুমাত্র ২০০৬ সালেই সরকার টুইন টাওয়ার নির্মাণের জন্য একটি সাব কবলার মাধ্যমে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোকে ওই জমি প্রদান করে। ওই প্রদানকে বৈধ বলে ধরা যেতে পারে। কেননা অন্য একটি জনস্বার্থে অর্থাত্ একটি টুইন টাওয়ার নির্মাণের জন্য রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোকে জমিটি প্রদান করা হয়েছিল নিবন্ধনকৃত সাফ কবলার মাধ্যমে। এ থেকে যা দাঁড়ায়, ২০০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো প্রথমবারের মতো ওই জমির মালিকানা পায়। রায়ের অভিমত, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো কোনক্রমেই বিজিএমইএকে তার নিজস্ব ভবন তৈরির জন্য প্রদান করতে পারে না। সম্পত্তি হস্তান্তর ও নিবন্ধন আইন অনুযায়ী কোন জমি লিখিত কবলা ও নিবন্ধন ছাড়া হস্তান্তর করা যায় না। এখানে স্বীকৃতভাবেই এখন পর্যন্ত কবলা বা সাফ কবলা বিজিএমইএ’র নামে নিবন্ধিত হয়নি। রায়ে বলা হয়, ওই জমি বিজিএমইএ জবরদখল করে আছে এবং অন্য যে কোন জবরদখলকারীর মতোই বিজিএমইএকে উচ্ছেদ করতে এবং তার ভবন ভেঙ্গে দিতে সরকার বাধ্য। রায়ে আরও বলা হয়, জমিটি অধিগ্রহণকৃত জমি বিধায় সরকারের কাছে দু’টি পথ খোলা আছে। হয় এটি আদি মালিকের কাছে ফেরত দিতে হবে অথবা টুইন টাওয়ার বা অন্য কোনভাবে বিকল্প জনস্বার্থে ব্যবহার করতে হবে। হাইকোর্টের এ রায় স্থগিতের জন্য ২০০১ সালে বিজিএমইএ’র তত্কালীন সভাপতি সফিউল ইসলাম সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় আবেদন করেন। পরদিন আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন হাইকোর্টের রায়ের উপর ছয় সপ্তাহের স্থগিতাদেশ দেন। পরে এ সময়সীমা বাড়ানো হয়। বর্তমানে এ রায়ের ওপর স্থগিতাদেশ রয়েছে। এ রায় স্থগিত থাকায় এ মুহূর্তে তা কার্যকর করা যাবে না বলে গতকাল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন ডেপুটি এটর্নি জেনারেল এডভোকেট অমিত তালুকদার। রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই বিজিএমইএ ভবন নির্মাণ করা নিয়ে ২০১০ সালে দৈনিক ‘নিউ এজ’ পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনটি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ডিএইচএম মনির উদ্দিন আদালতে উপস্থাপন করেন। বিজিএমইএ ভবন কেন ভাঙার নির্দেশ দেয়া হবে না তার কারণ জানতে চেয়ে হাইকোর্ট স্বপ্রণোদিত হয়ে (সুয়োমোটো) রুল জারি করেন। ওই রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে হাইকোর্ট ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল বিজিএমইএ ভবন নির্মাণকে অবৈধ ঘোষণা করে তা ভেঙ্গে ফেলার নির্দেশ দেয়।