বনভূমি উজাড় হয়ে যাওয়া, জলে-স্থলে মানুষের আগ্রাসন এবং বাতাস ও পানির দূষণ সব কিছু মিলিয়ে প্রকৃতির অবস্থা আজ খাদের কিনারে এসে দাঁড়ানোর উপক্রম। জীববৈচিত্র্যের অবস্থা বোঝার জন্য জাতিসংঘের পৃষ্ঠপোষকতায় সম্প্রতি একটি গবেষণা করা হয়েছে। গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে গত সোমবার। গবেষণায় অংশ নিয়েছিলেন পৃথিবীর ৫০০ জনের বেশি বিশেষজ্ঞ এবং ৫০টি দেশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অলিখিত এক জরুরি অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতি।
অতি শুষ্ক মরুভূমি থেকে ক্রান্তীয় বৃষ্টিপ্রবণ অরণ্য পর্যন্ত, বরফে আবৃত কঠিন পর্বত থেকে সাগরের গভীরে বিস্তৃতি হয়ে থাকা বিভিন্ন প্রজাতির জীব জগতের রং, আকৃতি, আকার ইত্যাদির বিভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট না করে জীবন ধারণ করে আসছে কোটি কোটি প্রাণী। মার্কিন জীব বিজ্ঞানী ই এ নরসের মতে, জল, স্থল সকল জায়গায় সকল পরিবেশে থাকা সকল ধরনের জীব এবং উদ্ভিদের বিচিত্রতাই হলো জীববৈচিত্র্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্যের চিত্র। গত ৫০ বছর ধরে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়া বিভিন্ন প্রজাতির কথা ফুটে উঠেছে এ প্রতিবেদনে। আগামীতে হুমকির মুখে থাকার অনেক প্রজাতি সম্পর্কেও বলা হয়েছে। এ প্রতিবেদনের পর ইন্টারগভার্নমেন্টাল সাইন্স-পলিসি প্লাটফরম অন বায়োডাইভারসিটি এবং ইকোসিস্টেম সার্ভিস (আইপিবিইএস) প্রত্যাশা করছে যে এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে পৃথিবীবাসী হয়তো জরুরি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্যোগী হবে।
পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য নিঃশেষ হচ্ছে দ্রুত
পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের অবস্থা বোঝার জন্য করা বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক এই প্রতিবেদনে বিভিন্ন প্রজাতির বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। গ্রাফিক্সে তারা দেখিয়েছেন, জীববৈচিত্র্য দিন দিন রুগ্ণ অবস্থার দিকে যাচ্ছে। আইসিইউএনের লাল তালিকায় থাকা প্রাণীদের বর্তমান অবস্থা আরো নাজুক হয়ে পড়েছে। রয়েল বোটানিক গার্ডেনসের পরিচালক অধ্যাপক আলেকজেন্ডার অ্যান্থোনেলি বলেন, এই গ্রহের উদ্ভিদ এবং প্রাণী মিলে বহু প্রজাতি এখন খুব দ্রুত বিলুপ্তির পথে। এক লাখেরও বেশি প্রজাতি বিলুপ্তির পথে। এর তিন চতুর্থাংশই মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।
পৃথিবীর বৃহত্তম স্তন্যপায়ীদের মধ্যে গ্লার অন্যতম। এদের সর্বশেষ উপযুক্ত আবাসস্থল আফ্রিকা। অথচ আফ্রিকার অনেক দেশেই আজ বিলুপ্তির পথে গ্লার। সুদানে থাকা সর্বশেষ সাদা পুরুষ গ্লারটিও মারা গেছে গত বছর। অন্য এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২১০০ সালের মধ্যে আফ্রিকার প্রায় অর্ধেক প্রজাতির পাখি-ই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। গত এক দশকে ইউরোপ এবং মধ্য এশিয়ার স্থলভাগের ৪২ ভাগ প্রাণী এবং উদ্ভিদ কমে গেছে।
বন্যপ্রাণীর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি বাসস্থান সংকট
সাম্প্রতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন এবং দূষণ কারণে বন্যপ্রাণীর বাসস্থান কমে যাচ্ছে। যা কিনা পরোক্ষভাবে বন্যপ্রাণীকে ঠেলে দিচ্ছে বিলুপ্তির দিকে। কৃষি, জ্বালানি এবং কাঠের জন্য বনভূমি ধ্বংস করায় একাধারে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ হারাচ্ছে। সেই সঙ্গে নষ্ট হচ্ছে বন্যপ্রাণীদের বাসস্থান। এর পাশাপাশি শিকারিদের হাতেও মারা যাচ্ছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রাণী। জলবায়ু পরিবর্তনে যতটা জোর দেওয়া হয় সেই পরিমাণ জোর দেওয়া হয় না বন্যপ্রাণীর বাসস্থান ধ্বংসের দিকে। জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ এবং তাদের উপযুক্ত বাসস্থান নিশ্চিত করা খুবই জরুরি।
দখলদারিত্ব মানসিকতায় কমছে প্রাকৃতিক বসতি
বর্তমান পৃথিবীতে ৭০০ কোটির বেশি মানুষের বাস। বিপুলসংখ্যক এই মানুষের খাদ্য, বস্ত্র এবং আবাসনের জোগান দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে সবুজ গ্রহ পৃথিবীকে। কৃষি এবং বসতি গড়া এবং নগরায়ণের জন্য দিন দিন বনভূমি ধ্বংস করা হচ্ছে। ২০০১ সালের পর থেকে ইন্দোনেশিয়ার বর্নিয়ো জঙ্গল শতকরা ৪০ ভাগ দখল করেছে মানুষ। আমাজন জঙ্গল ৭০ লাখ বর্গকিলোমিটার অববাহিকা পরিবেষ্টিত এক অরণ্য। আমাজন বনে ১৬ হাজার প্রজাতির ৩৯০ বিলিয়ন বৃক্ষ রয়েছে। ৪২৮ প্রজাতির উভচর, ৩৭৮ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ৪২৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী রয়েছে। এছাড়া আমাজন নদীতে ৩০০০ প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণী রয়েছে। কিন্তু আজকাল আমাজনেও কমছে বহু প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী।-বিবিসি