শুধু যোগ্যদের জন্য ভয় নেই
প্রকাশ : ২০ মার্চ ২০১৩, ২০:৫৪
শুধু বাংলাদেশ নয় পুরো বিশ্বজুড়েই চাকরি বাজার সংকুচিত হয়ে বেকারত্বের হার বাড়ছে। তবে অন্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশে বেকারদের সংখ্যা আশংকাজনক হারে বেড়ে যাবার মূল কারণ হচ্ছে এ দেশে যে হারে কর্মক্ষেত্র বাড়ছে সে হারে কাজের লোক বাড়ছে না। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সার্টিফিকেট নিয়ে শিক্ষার্থী বের হচ্ছে ঠিকই কিন্তু তারা একদিকে যেমন কর্মমুখি শিক্ষা নেয়নি, অন্যদিকে কর্মক্ষেত্রে সর্বাধিক আউটপুট নিশ্চিত করার পর্যায়ভুক্ত প্রশিক্ষণও পাচ্ছে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা সার্টিফিকেট অর্জন করার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠছে। যে কারণে ক্রমে সার্টিফিকেটনির্ভর প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ছে।
চাকরি না পাওয়ার আরেকটি বড় কারণ কাজ করে যোগ্যতার ভিত্তিতে আয়ের মানসিকতা কমে যাওয়া। একটি শিক্ষার্থী যখন পড়াশোনার করে, তখনি তার শিক্ষকদের কাছ থেকে সে এটি শিখে নেয়। কেননা, বলতে গেলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগ শিক্ষক স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নিজের দায়িত্বে ফাঁকি দিয়ে হয় বাসায় প্রাইভেট পড়ায় অথবা প্রফেশনাল কোচিং সেন্টার দিয়ে বসে। আর সেসব কোচিং সেন্টার বা প্রাইভেট সেন্টারে শিক্ষার চেয়ে প্রশ্ন কমনের চর্চাই বেশি হয়। শিক্ষার্থী পড়ার জন্যে বা শিক্ষার জন্যে বা প্রশিক্ষণের জন্যে নয় বরং অল্প পড়ে, ফাঁকি দিয়ে কিভাবে প্রশ্ন কমন পেতে পারে সেটি সামনে রেখেই ওই সব শিক্ষকের সহজ পন্থার ফাঁদে পা বাড়ায়। ফাঁকিবাজি শেখার শুরু সেখান থেকেই। মানসিকভাবে তার মধ্যে ধারণা জন্ম নেয় কিভাবে সহজে চাকরি পাওয়া যায়। এখানে চাকরির মূল দায়িত্বের কথা ভুলে কিভাবে অতিরিক্ত আয় করা যাবে সেটাই মুখ্য হয়ে ওঠে।
চাকরিদাতার মূল লক্ষ্য থাকে, তার কাজের জন্য যথেষ্ট লোকটিকে সে নিয়োগ দেবে। কাজটির আউটপুট তার কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চাকরিদাতা লোক নিয়োগ দিয়ে প্রথমত নিজে প্রফিট করবে। সেখান থেকে কর্মীকে বেতন দেবে এবং প্রতিষ্ঠান নির্বাহ করবেন। এ ক্ষেত্রে যারা চাকরি নিতে আসে তার ধারণা থাকে মাস গেলে কখন বেতন পাবে। আর চাকরিদাতার চিন্তা থাকে মাস গেলে নিয়োগকৃত কর্মীর আউটপুট কী এল। আউটপুট না পাওয়া গেলে সেই চাকরিজীবীকে রাখার কোনো কারণ নেই নিয়োগকর্তার।
বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে এখন বেকারদের সংখ্যা দুই কোটি। কাজ না পাবার কারণেই মানুষ বেকার থাকে। কখনো চাকরি করতে গেলে তাকে কাজই করতে হবে। এ ক্ষেত্রে শুধু ব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকি নিয়ে থাকে নিয়োগদাতা। কিন্তু চাকরি না পেয়েও যে কিছু করা যায় আর সেটি নিয়ে জীবন নির্বাহ করা যায় এটি সবাই বেমালুম ভুলে যাচ্ছে। কাজকে সম্মান না করা এবং দায়িত্ব ক্ষেত্রে আন্তরিকতার অভাবই এই অবস্থা সৃষ্টি করছে। প্রায়ই দেখা যায় একাধিকবার নিয়োগ দিয়েও চাকরির লোক পাওয়া যাচ্ছে না। এর কারণ ওই পদের জন্যে যোগ্য লোক নেই। ডিগ্রির সাথে অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার সমন্বয়েই চাকরি হয়।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গ্রন্থগত বিদ্যা শেখানো হয়, বাস্তব শিক্ষা শেখানো হয় না। কাস্টমার কেয়ার, ব্যবস্থাপনা, মার্কেটিং, ম্যানেজমেন্ট, সাইকোলজি শেখানো হয় না। একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মীর আচরণবিধি কেমন হতে হবে তা শেখানো হয় না। আবার বাংলাদেশের বাণিজ্য বাজার এবং মার্কেটিং পরিবেশের সাথে পাঠ্য বইতে শেখা বিদ্যার মিল নেই। যে কারণে চাকরিপ্রার্থী চাকরি পাওয়ার পর লক্ষ করে যে, বই এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে যে শিক্ষা গ্রহণ করেছে তার মধ্যে মিল নেই। এ কারণে কয়েক বছর লেগে যায় প্রতিষ্ঠানের আচরণ বিধি ও দক্ষ কর্মী হবার শিক্ষা শিখতে।
আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যেসব শিক্ষার্থী বের হয় তাদের বলা হয় র’হ্যান্ড। এদেরকে কর্মোপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন বাড়তি শিক্ষা। এই বাড়তি প্রশিক্ষণের জন্যে কোনো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নেই। কিছু ক্ষেত্রে দু’একটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কর্পোরেট হাউজ শিক্ষা শেষে নিয়োগের পূর্বে ইন্টার্নির ব্যবস্থা করে। এ অবস্থার পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন।