নির্বাচনে সেনাবাহিনীর ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা চায় বিএনপি

নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) দেয়া বিএনপির চিঠিতে জানানো হয়েছে, ‘সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন ছাড়া কোনভাবেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। সেনাবাহিনীকে ‘ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা’ দিয়ে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনের দাবি জানিয়েছে বিএনপি। একইসঙ্গে দলটি বলেছে, নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্বিন্যাস, ভোটার তালিকা সংশোধন ও সেনাবাহিনী মোতায়নের বিধান বাতিলসহ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মকাণ্ডে কমিশন জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। চিঠিতে বলা হয়, ‘২০০৮ সালে তত্কালীন নির্বাচন কমিশন নীলনকশার অংশ হিসেবে ৩৫টি জেলার ১৩০টি সংসদীয় আসনের সীমানায় ব্যাপক পরিবর্তন এনে সারাদেশে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। একইভাবে সরকারের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ৮৭টি আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। সরকারের বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিকে সুবিধা দেয়ার জন্য অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সীমানা পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে।’ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাক্ষরিত চিঠিতে এসব কথা বলা হয়। গতকাল বুধবার সকাল ১১টায় দলটির যুগ্ম মহাসচিব সালাউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল এই চিঠি নির্বাচন কমিশনে পৌঁছে দেয়। কমিশনের পক্ষে চিঠিটি গ্রহণ করেন নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক। এসময় বিএনপির সহ দপ্তর সম্পাদক আব্দুল লতিফ জনি উপস্থিত ছিলেন। চিঠি প্রদান শেষে সালাউদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, আগামী নির্বাচনে সেনা মোতায়েন করতে হবে। এজন্য আরপিও’র আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সংজ্ঞায় সংশোধন আনার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। সালাউদ্দিন বলেন, আওয়ামী লীগের ইচ্ছা অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ করা হচ্ছে। যে ৮৭টি আসনে সীমানা পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে, সেখানে দেখা গেছে সরকার এবং দলীয় বিবেচনায় বর্তমান কমিশনাররা ওই আসনগুলোতে পরিবর্তন এনেছেন। আমরা কমিশনকে চারটি বিষয় আমলে নিয়ে সীমানা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছি। এক্ষেত্রে ভৌগলিক অখণ্ডতা, প্রশাসনিক সুবিধা, ভোটার এবং জনসংখ্যার বিভাজনকে গুরুত্ব দেয়ার দাবি জানান তিনি। বিএনপির চিঠির বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মোবারক বলেন, তিন পৃষ্ঠার একটি চিঠি আমরা পেয়েছি। তারা নির্ধারিত কোনো আসনের ব্যাপারে আমাদের বলেননি। ৫ লাখ ভোটারের বিষয়ে কমিশনার বলেন, ভোটার তালিকা থেকে কারা বাদ পড়েছে তা সুনির্দিষ্টভাবে আমাদেরকে জানাতে হবে। বিএনপির চিঠির জবাবে তিনি বলেন, ‘বিএনপির পক্ষ থেকে যে প্রস্তাবগুলো দেয়া হয়েছে তা কমিশন বৈঠকের মাধ্যমে বিবেচনা করবে।’ বিএনপির চিঠি প্রধান নির্বাচন কমিশনার বরাবর চিঠিতে বলা হয়, স্বাধীন বাংলাদেশ গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হওয়ার অপরিহার্য পূর্বশর্ত হলো অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। এ জন্য প্রয়োজন নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ এবং স্বচ্ছ ও সঠিক ভোটার তালিকা। ১৯৭৬ সালের সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ সংক্রান্ত অধ্যাদেশের বিধান অনুসারে এ পর্যন্ত ৮টি জাতীয় সংসদের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। ২০০৮ সালে তত্কালীন নির্বাচন কমিশন ৩৫টি জেলার ১৩০টি সংসদীয় আসনের সীমানায় ব্যাপক পরিবর্তন এনে সারাদেশে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। নীলনকশার অংশ হিসাবে এসব আসনে ব্যাপক রদবদল এনেছিল। আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে জয়ী করার স্বার্থে সেনা সমর্থিত ওই কমিশন বিএনপি অধ্যুষিত আসনগুলো পরিকল্পিতভাবে পুনর্বিন্যাস করে। এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা, জনগণের মধ্যে দীর্ঘকালের সামাজিক সম্পর্ক এসব কিছু উপেক্ষা করে একান্ত যান্ত্রিকভাবে কোন গ্রহণযোগ্য যুক্তি বা কারণ ছাড়া সীমানা পুনঃনির্ধারণ করে। সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের জন্য অসম অবস্থার সৃষ্টি করা হয়। বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় জনসংখ্যায় সমতা আনায়নের প্রয়োজনীয়তাকে সীমানা পুনঃনির্ধারণের প্রধান যুক্তি হিসাবে উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে দেখা যায় অনুল্লেখিত কারণে পুনঃনির্ধারিত নির্বাচনী এলাকা সমূহের জনসংখ্যা পৌনে তিন থেকে সোয়া পাঁচ লক্ষ পর্যন্ত ছিল। তাহলে কী উদ্দেশ্যে নির্বাচনী এলাকাসমূহে এই অযৌক্তিক কাটাছেড়া করা হলো সে প্রশ্ন থেকেই যায়। এতে বলা হয়, গত বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠনের পর থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কমিশনের কার্যক্রমকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে আসছে। প্রধান বিরোধী দলসহ আপামর জনতার আশা ও প্রত্যাশা ছিল নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, গত ৭ ফেব্রুয়ারি সারাদেশের ৮৭টি সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাসের খসড়া প্রকাশের পর জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সরকারের বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিকে সুবিধা দেয়ার জন্য অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সীমানা পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। বিশেষ করে ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত বিগত নির্বাচন কমিশনের পথ অনুসরণ করে এবার সীমানা পুনর্বিন্যাস করে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়েছে। বিধি বিধানের তোয়াক্কা না করে প্রধানতঃ সরকারের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী জাতীয় সংসদের ৮৭টি আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী প্রশাসনিক সুবিধা, আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও জনসংখ্যার বিভাজন বিবেচনায় রেখে সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাসের বিধান থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি। বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলের সুপারিশ আমলে নেয়া হয়নি। বরং মহাজোটের মন্ত্রী, এমপিসহ প্রভাবশালীদের সুপারিশ অনুযায়ী বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। আসন পরিবর্তনে প্রভাবশালী মহলের তদবির ও কমিশনারদের আঞ্চলিকতাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে সীমানা নির্ধারণ অধ্যাদেশ ১৯৭৫ এর বিধি বিধানের ব্যাপক লঙ্ঘন হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেনা মোতায়নের বিধান বাতিল করে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন। সংশোধিত খসড়ায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞা থেকে ‘সশস্ত্র বাহিনী’ বাদ দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আমাদের স্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে যে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেনা বাহিনী মোতায়েন ব্যতিরেকে কোনভাবেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হবে না এবং জাতি সেই নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেবে না। প্রয়োজনীয় ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ-সেনাবাহিনী নিয়োগের বিধান সংযুক্ত করে আরপিও সংশোধনের জন্য আমরা জোর দাবি জানাচ্ছি। চিঠিতে বলা হয়, আগামী দশম নির্বাচন আয়োজন নিয়ে রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে সাধারণ জনমনে নানা ধরনের শংকা দেখা দিয়েছে। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব অতি গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্বিন্যাস, ভোটার তালিকা সংশোধন ও সেনাবাহিনী মোতায়নের বিধান বাতিলসহ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মকাণ্ডে এবং তাদের বক্তব্যে কমিশন তাদের দায়িত্ব পালনে জনগণের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে বলে প্রতীয়মান হয় না। বাংলাদেশের নির্বাচন ইতিহাসের অমোঘ সত্য হলো নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ছাড়া কোন দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়। দলীয় সরকারের অসহযোগিতার মুখে কমিশনের সাংবিধানিক ক্ষমতা অকার্যকর হওয়ার ঘটনা আপনাদের পূর্ববর্তী কমিশনের সময়েও বহুবার ঘটেছে। নির্বাচন সংক্রান্ত বিরাজমান সংকট নিরসনে নির্বাচন কমিশন জাতির প্রত্যাশার পরিপ্রেক্ষিতে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য শুধুমাত্র যান্ত্রিক নিরপেক্ষভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করলে হবে না, সাহসী ও সৃজনশীল পদক্ষেপ গ্রহণ করে বিদ্যমান সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখবে-এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।