তাঁর কবিতায় দেশমাতৃকা
মাগো, ওরা বলে
প্রকাশ : ২১ মার্চ ২০১৩, ১৮:৩৬
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ্ বাংলা কবিতায় একটি বিশেষ আর্কেটাইপকে প্রতিষ্ঠা দিতে চেয়েছেন। তার চেতনার ভেতর বাসা বেঁধেছিল মা ও মাতৃপ্রেমের শূন্যতা। মাকে হারিয়েছেন শৈশবে। হারানো মায়ের শূন্যতা তার সংবেদনময় মনে বিরাট প্রভাব ফেলে। ফলে কবিসত্তার ভেতর বড় আসন করে নেন মা ও মাতৃকল্পবোধ। মাতৃকল্প কবিসত্তার প্রধান প্রেরণা হওয়ায় তিনি মাকে নিয়ে লিখেছেন ‘মাগো, ওরা বলে’সহ আরও অনেক কবিতা— ‘সাত নরী হার’, ‘কখনো রঙ কখনো সুর’, ‘বৃক্ষ, বৃক্ষ করো’, ‘মা তুমি, আত্মচরিত’, ‘কাজের ভিড়ে অবসরে’, ‘কয়েকটা শব্দ’, ‘ডাকতে চেয়েছি’ এবং ‘যে কবিতা শুনতে জানে না’ ইত্যাদি। ব্যক্তি-মাকে তিনি এইসব কবিতার ভেতর সঞ্চারিত করে একটি মাদার আর্কেটাইপ বা প্রত্নমাতৃকা সৃষ্টি করতে চেয়েছেন। প্রত্নমাতৃকা শেষপর্যন্ত ব্যক্তিসত্তার স্তর ছাপিয়ে দেশমাতৃকার চেতনায় রূপ নেয়। ‘মাগো, ওরা বলে’ সেই চেতনার অনন্য ফসল।
বাহান্ন পঙিক্তর কবিতা ‘মাগো, ওরা বলে’। শিরোনামের আদ্যশব্দ ‘মা’ আর পঙিক্তসীমানা ‘বাহান্ন’ হওয়ায় সহজেই বুঝে নেওয়া যায় আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ্ জাতীয় জীবনে ঘটে যাওয়া বিশেষ এক প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এই কবিতা লিখেছেন। কবি শিরোনামের নিচে ইটালিক অক্ষরে প্রথম বন্ধনীর ভেতরও বলে দিয়েছেন, এ কবিতার উত্সর্গিত পটভূমি ‘একুশ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২’। আমাদের অনেকের ভালো লাগার কবিতা ‘মাগো, ওরা বলে’; আর বাংলাভাষী সকলের পরম অহংকারের অধ্যায় মহান একুশে ফেব্রুয়ারি।
অনেকে বলেন, পূর্বধারণাবাহিত কিংবা ঘটনাশাসিত কবিতা শেষপর্যন্ত প্রকৃতকবিতা হয়ে ওঠার পথ পায় না। প্রকৃত কবিতার আবেদন সব সময় ব্যক্তিভেদে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা নিয়ে হয়ে ওঠে চিরকালীন। ঘটনা কবিতার বড় প্রেরণা হলে, ঘটনাকে শিল্পের কলাকুশলতা দিয়ে অনেকটা আড়ালে রাখতে হয়। তা না হলে, ঘটনার কথনে কবিতার প্রাণসত্তা পূর্ণশক্তিতে বেরিয়ে আসতে পারে না। প্রেরণা ঘটনার, আর আড়াল শিল্পের—এই দুইয়ের সমীকরণ হলে কবিতা বিবৃতিদুষ্ট হয় না। ঘটনা ও তার আড়াল ঘটনাপ্রভাবী কবিতার জন্য অনিবার্য শর্ত।
জাতীয় জীবনের বিভিন্ন প্রেরণা নিয়ে অসংখ্য কবিতা রচিত হয়েছে। সব কি কবিতার প্রাণ নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছে? গুটিকয়েক বাদে অধিকাংশই শেষপর্যন্ত বিবৃতি, স্লোগান, মিছিল কিংবা শব্দের কুচকাওয়াজ প্রকাশ করেছে। শিল্পের আড়াল দিয়ে আবেগকে বোধে সঞ্চারিত করতে না পারলে ওইসব কবিতা কেবল ইতিহাসের মুগ্ধতা নিয়ে শব্দের কোলাহল তৈরি করে, কবিতার দ্যুতি তাতে প্রকাশ পায় না, কিছু মাত্র। যারা বলেন, পূর্বধারণা কবিতা হয়ে-ওঠার বড় অন্তরায়, তাদের সঙ্গে আমরা সমমত প্রকাশ করি কী করে! জীবনের যেকোনো অভিজ্ঞতাই কবিতার উপকরণে আমন্ত্রিত হয়ে আসতে পারে, যদি তাকে শিল্পরসে উত্তীর্ণ করা যায়। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ্ এই কাজটিই করেছেন দারুণ এক মুগ্ধতা নিয়ে। বাঙালির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়কে তিনি তার কবিতার উপকরণ ও কেন্দ্রীয় পটভূমিতে শিল্পোত্তীর্ণ জায়গা দিয়েছেন। বর্ণনাধর্মী ঘটনার বিবরণে এগিয়ে গেলেও কবি ‘মাগো, ওরা বলে’ কবিতাকে অব্যর্থ এক কবিতাযজ্ঞ করতে পেরেছেন, এ বিষয়ে আমাদের কোনো সংশয় নেই।
কয়েকটি বিশেষ গুণে এই কবিতাটি বাংলা কবিতার অনন্য অর্জন। এই কবিতার ভেতর ঘটেছে বহুরসের সমাবেশ, বহুধারার মিলন ও বহুভঙ্গির প্রকাশ। ‘মাগো, ওরা বলে’— এটি বাহান্ন লাইনের কবিতা, আবার এই কবিতাটি একইসঙ্গে একটি গল্প, একটি নাট্যভঙ্গি, পত্ররীতি, একটি ন্যারেটিভ, একটি বোধ এবং সবকিছুর ঊর্ধ্বে কয়েকটি চিত্রকল্পের সমাহারও বটে।
জাতীয় জীবনের এমন একটি রক্তমাখা অধ্যায়ের পটভূমি নিয়ে এই কবিতা গড়ে উঠেছে যেখানে ইতিহাসের সত্যগল্পের এক মূল প্রেরণা হয়ে কথা বলে এর প্রতিটি পঙিক্ত। এই সত্যগল্পের ভেতর কবি স্বতঃস্ফূর্তভাবে তিনটি চরিত্রকে কবিতার শরীরে বিস্তৃত করে দিয়েছেন। চরিত্রত্রয়— মা, পুত্র ও কবি নিজে। মা-পুত্রের সংলাপ বিনিময় ঘটেছে পত্র আদান-প্রদানের মাধ্যমে, ফলে সৃষ্টি হয়েছে নাট্যভঙ্গি ও পত্রকাব্যের সূক্ষ্ম আমেজ। টুকরো সংলাপের মাঝে মাঝে কবিচরিত্র সূত্রধরের মতো সময়ের বর্তমান বাস্তবতার সমান্তরাল ছবি এঁকে গেছেন। একটি ন্যারেটিভ দিয়ে কবিতাটি যাত্রা করলেও আবেগের কোলাহলে তা ঢেকে যায়নি, বরং সংকেতের ভেতর দিয়ে কবি ইতিহাসের প্রেরণাসঞ্চারী ঘটনার নবকাব্যরূপ দিয়েছেন।
কুমড়ো ফুলের নুয়ে পড়া লতা আর সজেন ডাঁটায় ভরে যাওয়া গাছের ছবি এঁকে কবি মিছিলে যাওয়া সন্তানের ফিরে আসার জন্য মায়ের অপেক্ষাতুর মনের আবেদন সংকেতায়িত করেন। মায়ের মনের বেদনামাখা অপেক্ষা কবি গ্রামের অতি পরিচিত দৃশ্য কুমড়ো লতা আর সজেন ডাঁটার মোটিফ দিয়ে সহজভাবে হূদয়গ্রাহী করে দিলেন— ‘কুমড়ো ফুলে ফুলে /নুয়ে প’ড়েছে লতাটা/সজেন ডাঁটায় /ভরে গেছে গাছটা,/আর আমি/ডালের বড়ি শুকিয়ে রেখেছি।/খোকা তুই কবে আসবি?/কবে ছুটি।’
সন্তান যুদ্ধে গিয়েছে দেশমাতৃকাকে রক্ষা করার জন্য। বাংলা ভাষাকে যারা রাষ্ট্রভাষা করতে চায় না, যারা বাংলা মায়ের রাষ্ট্রীয় অধিকার থেকে বাংলাদেশকে বঞ্চিত করতে চায়, সেইসব নরখাদক পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাংলার দামাল ছেলেরা বাহান্নর একুশে ফেব্রুেয়ারিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠা করে এদেশকে রাখতে হবে শত্রুমুক্ত এমন মন্ত্রে উজ্জীবিত সন্তান সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পৃথিবীতে মা-সন্তানের সম্পর্ক সব সম্পর্কের ঊর্ধ্বে। মা দেশের বৃহত্তর স্বার্থে তার পরম ধন পুত্রকে পাঠিয়ে দেন মিছিলে, পুত্রও মায়ের স্নেহ- ভালোবাসার প্রশান্তি ছেড়ে জড়িয়ে পড়ে আসন্ন যুদ্ধে, শত্রুর বিরুদ্ধে। মা-পুত্রের পারস্পরিক ভালোবাসার নিবেদন এবং মহত্তর আত্মত্যাগের ঘটনাকে কবি এই কবিতায় কয়েকটি চিত্রকল্পের ভেতর মূর্ত করে রাখতে চেয়েছেন।
মা তার আন্দোলনে যাওয়া সন্তানকে ক্লান্ত খোকা বলে সম্বোধন করেন। ‘ক্লান্ত’ বিশেষণের মধ্য দিয়ে কবি মাতৃভাষার জন্য সংগ্রামরত পুত্রের দায়িত্বশীল অভিযাত্রাকে প্রকাশ করেন। মা খোকার জন্য নারকেলের চিড়ে কোটেন, উড়কি ধানের মুড়কি ভাজেন, তৈরি করেন খোকার প্রিয় আরও অনেক খাবার। যুদ্ধশেষে বীরের বেশে ক্লান্ত হয়ে খোকা ফিরে আসবে তার মায়ের কাছে, মা সেই অপেক্ষারই প্রহর গুনছেন। কবি বলেন, ‘তার খোকা যে বাড়ি ফিরবে/ক্লান্ত খোকা।’ অতিবর্ণনায় উচ্চকিত না হয়ে কবি শুধু একটি ‘ক্লান্ত’ শব্দ যোগ করে সংহত ভঙ্গিতে জানিয়ে দিলেন সাহসী সন্তানের দেশপ্রেমের দায়। আর এই সংহত ভঙ্গি যখন সংকেতধর্মী হয়ে ওঠে তখন সৃষ্টি হয় চিত্রকল্প।
‘মাগো, ওরা বলে’ কবিতায় সময়ের একটি প্যারালালিজম তৈরি করেছেন কবি। বাংলায় প্যারালালিজমকে কেউ কেউ বলেছেন সমান্তরালতা। প্যারালালিজম বা সমান্তরালতার কাজ হলো দুটি সময় বা দুটি ঘটনার মধ্যে সমান্তরাল ঐক্য তৈরি করা। ঘটনার গুরুত্বারোপ বা স্থায়ী রূপকল্প সৃষ্টির লক্ষ্যে কবি এই কাজটি করে থাকেন। বর্তমান কবিতায় আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ্ অতীত ও বর্তমান সময়খণ্ড নিয়ে একটি সমান্তরালতার আবহ সৃষ্টি করেছেন। কবিতার চারটি স্তবকের মধ্যে প্রথম দুটিতে এই প্যারালালিজম সুস্পষ্টরূপে প্রকাশ পেয়েছে। খোকা যুদ্ধে গিয়েছে আর মা খোকার ফিরে আসার জন্য ঘরের উঠোনে অপেক্ষারত। খোকা এখানে অতীত সময়খণ্ডে সংকেত দিচ্ছে আর উঠোনে মায়ের অপেক্ষা, নুয়ে পড়া কুমড়ো ফুল, শুকিয়ে যাওয়া সজেন, ঝরে পড়া ডাঁটা এবং মায়ের ঝাপসা চোখ বর্তমানের প্রেক্ষাপটকে উন্মোচিত করছে। দুটি সময়ের আবহের ভেতর পত্রসংলাপের টুকরো টুকরো চিত্র দিয়ে কবি সৃষ্টি করলেন অভূতপূর্ব সমান্তরালতা।
শেষের দুই স্তবকে কবি এঁকে দিলেন বর্তমান সময়খণ্ডে রূপকল্প। মা এখন কী করছেন! সন্তান ফিরে আসবে বলে সেই পথের দিকে চেয়ে আছেন, দাওয়ায় বসে বসে ধান ভানছেন, বিন্নি ধানের খই ভাজছেন—/ এখন
/মা’র চোখে চৈত্রের রোদ/পুড়িয়ে দেয় শকুনীদের।/তারপর /দাওয়ায় ব’সে/মা আবার ধান ভানে, /বিন্নি ধানের খই ভাজে,/খোকা তার /কখন আসে কখন আসে।//এখন/মা’র চোখে শিশির-ভোর /স্নেহের রোদে ভিটে ভ’রেছে।
ফাল্গুন চলে গিয়ে চৈত্রের রোদ পড়েছে মায়ের উঠোনে। মায়ের চোখে ভোরের শিশির আর স্নেহমাখা রোদ তার ভিটায় জানান দিয়ে যায় যুদ্ধরত খোকার ক্লান্ত মুখখানির ছবি। মায়ের এই অপেক্ষার ভেতর একপর্যায়ে কবি বেদনাবিদ্ধ বাস্তবতার আরেক চিত্র এঁকে দেন। শকুনি আর চৈত্রের রোদ দিয়ে কবি ইতিহাসের সেই রক্তমাখা অধ্যায়কে এখানে বিন্দুবদ্ধ করেন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নরখাদক শকুনির মতো হিংস্র। তাই ওই ধিকৃত শাসকদের শকুনির সঙ্গে তুলনা করেন কবি। শকুনিদের আক্রমণে খোকা মৃত্যুবরণ করে। কবি খোকার মৃত্যুবরণের ছবি কোনো ন্যারেশনে প্রকাশ করেননি, অত্যন্ত সতর্কদক্ষতার সঙ্গে কিছু প্রতীকের মাধ্যমে সংকেতায়িত করে গেছেন। প্রথম স্তবকে কবি ইঙ্গিত করেছেন, ‘চিঠিটা তার পকেটে ছিল/ছেঁড়া আর রক্তে ভেজা’ এবং তৃতীয় স্তবকে ইঙ্গিতকে আরও ঘনীভূত করেছেন, ‘মা’র চোখে চৈত্রের রোদ/পুড়িয়ে দেয় শকুনীদের’। মাগো, ওরা বলে কবিতার আরও এক গুণ তার ইঙ্গিতধর্মিতা, তার সংকেতময়তা। ইঙ্গিত ও সংকেত এই কবিতার আবেদনে সৃষ্টি করেছে স্থায়ী সর্বজনীন আবেদন।
এই সর্বজনীনতার আরও একটি মানদণ্ড আছে। মা, পুত্র এবং কবি— এই তিন সত্তা কেউ আর এই কবিতায় ব্যক্তি থাকেননি, ব্যক্তিস্তর থেকে তারা বেরিয়ে এসেছেন। একটি ঘটনা, ইতিহাসের একখণ্ড সময় আর তিনজন পাত্রপাত্রী নিয়ে এই কবিতার শরীর তৈরি হয়েছে সত্য, কিন্তু এই সত্যের আড়ালে আরো এক সর্বজনীন মহত্তর রূপকল্প এই কবিতায় সঞ্চারিত হয়েছে। এই রূপকল্প তিনি এঁকেছেন সংকেতে-ইঙ্গিতে—মা এখানে ব্যক্তি-মায়ের স্তর থেকে হয়েছেন স্বাধীন সার্বভৌম সোনার বাংলাদেশ, পুত্র একটি যুদ্ধে অংশগ্রহণের মাধ্যমে হয়েছেন ত্যাগী দেশপ্রেমের প্রতীক এবং কবি সেই আলোকে ছড়িয়ে দিতে গিয়ে হয়েছেন অনন্যসাধারণ শিল্পস্রষ্টা। কবিতা এইভাবে তার অনন্যতা নিয়ে টিকে থাকে ইতিহাসের পাতায়, পাঠকের মনে।