শ্রমিক আমদানি করতে হবে চীনকে!
প্রকাশ : ২২ মার্চ ২০১৩, ১৬:৪০
২০১১ সালে অনুষ্ঠিত আদমশুমারির রিপোর্টটি গত বছর প্রকাশিত হবার পর চমকে যায় চীন। এতে দেখা গেছে বিস্ময়কর সব জনসংখ্যাগত সমস্যার মুখোমুখি দেশটি। রিপোর্ট অনুযায়ী, চীনের মূল ভূমিতে লোক রয়েছে ১৩৪ কোটি। এটি কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা অন্য জায়গায়। জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির হার মাত্র শূন্য দশমিক ৫৭ শতাংশ। গত এক দশকে এই হার অর্ধেকে নেমে এসেছে। ২০০০ সালেও তা ছিলো ১ দশমকি শূন্য ৭ শতাংশ। এখানেই শেষ নয়, মোট প্রজনন হারেও পড়েছে প্রবল ভাটার টান। টিএফআর (টোটাল ফার্টালিটি রেট) এখন ১ দশমিক ৪, যা কিনা প্রতিস্থাপন হারের চেয়ে অনেক কম। জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার জন্য মোট প্রজনন হার প্রতিস্থাপন হারের ধারে-কাছে থাকাটা জরুরী। কাজেই চমকে না গিয়ে উপায় নেই।
জনসংখ্যার নিম্ন প্রবৃদ্ধির কারণে চীনে বুড়ো মানুষের সংখ্যা বেড়ে গেছে নাটকীয়ভাবে। মোট জনসংখ্যার ১৩ দশমকি ৩ শতাংশ ষাটোর্ধ্ব। অথচ ২০০০ সালে এমন লোক ছিলো ১০ দশমিক ৩ শতাংশ। এই হার অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ ৬৫-ঊর্ধ্ব লোকসংখ্যা পৌঁছবে ২৪ কোটিতে। আর বৃদ্ধ-বৃদ্ধা বেড়ে গেলে যা হওয়ার তাই হবে। ২০০০ সালের অনূর্ধ্ব-১৪ লোকসংখ্যা ছিলো ২৩ শতাংশ। এখন তা নেমে এসেছে ১৭ শতাংশে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ওপর বোঝা ভবিষ্যতে আরো বাড়বে। বৃদ্ধ বাবা-মা’র দেখ-ভালের পাশাপাশি সরকার পরিচালিত পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবা পদ্ধতিতে দিয়ে যেতে হবে সবরকম সমর্থন। চীনের এক সন্তান নীতি অদ্ভুত বয়স বিন্যাসের সাথে সাথে জন্ম দিয়েছে লিঙ্গগত ভারসাম্যহীনতা। মেয়ে শিশুর চেয়ে অনেক বেশি জন্ম নিচ্ছে ছেলে শিশু। তা সত্ত্বেও এক সন্তান নীতির কারণে মেয়ে শিশু কমে গেছে— এমন যুক্তি কিছুতেই মানতে নারাজ চীনা কর্মকর্তারা। দেশটির রীতি অনুসারে বাবা-মা ছেলে শিশুকেই অধিক গুরুত্ব দেন। কাজেই অনুমোদিত একমাত্র সন্তান যেনো ছেলে হয়, সেই ব্যবস্থা আগেই করে রাখে অনেকে। এক সন্তান নীতির প্রারম্ভিক পর্যায়ে নবজাত মেয়ে শিশু হত্যার ঘটনা ঘটতো দেদার। এ ব্যাপারে কড়াকড়ি আরোপ করাতে বেছে নেয়া হয় ভিন্ন পন্থা। আলট্রাসাউন্ড টেকনোলজি বিস্তৃত হওয়ায় লিঙ্গ-নির্ধারিত গর্ভপাত ঘটছে এখন অহরহ। আর এ কথা বলার প্রয়োজন পড়ে না যে, মেয়ে ভ্রূণ হত্যার প্রবণতাই বেশি।
নতুন আদমশুমারির উপাত্ত বলছে, অসুবিধাজনক প্রবণতাগুলো দূর হওয়ার কোন লক্ষণ নেই। বরং পরিস্থিতি দিন দিন আরো জটিল হচ্ছে। চীনে ২০১১ সালে ১০০টি মেয়ে শিশুর বিপরীতে জন্ম নিয়েছে ১১৮টি ছেলে শিশু। ২০১০ সালে ছেলে শিশুর সংখ্যা এরচেয়ে সামান্য কম ছিলো। আদমশুমারির রিপোর্ট চীনের এক সন্তান নীতিকে ঠেলে দিয়েছে প্রবল বিতর্কের মুখে। একাডেমিক ডেমোগ্রাফাররা (জনসংখ্যাবিদ) এখন সরব। তারা পরামর্শ দিচ্ছেন, নীতি শিথিল করার। ব্রুকিংসসিনহুয়া সেন্টার ফর পাবলিক পলিসি’র ওয়াং ফেং যুক্তি দেখিয়েছেন, ১৯৮০ সালে এক সন্তান নীতি চালুর পর থেকেই নাটকীয়ভাবে পাল্টে যেতে থাকে জনসংখ্যাগত ধরন। ১৯৫০ সালে মোট প্রজনন হার ছিলো ৫ দশমিক ৮। ১৯৮০ সালে ছিলো ২ দশমিক ৩ (প্রতিস্থাপন হারের সামান্য ওপরে)। এখন তা ১-এর নিচে। কাজেই এক সন্তানের নীতি পরিহার করাটাই হবে যুক্তিযুক্ত।
বর্তমানের অদ্ভুত জনবিন্যাসের জন্য এক সন্তান নীতি দায়ী- এ কথাটি মানতে নারাজ চীনা সরকার। তারা বরং এই নীতির প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তারা বলছেন, এক সন্তানের নীতি গ্রহণের পর থেকে এ পর্যন্ত কমপক্ষে ৪০ কোটি শিশু জন্মকে পরিহার করা সম্ভব হয়েছে। নইলে তারা ঠিকই দেখতো পৃথিবীর আলো। তখন এদের দায়-দায়িতত্ব নিতে গিয়েই ক্লান্ত হয়ে পড়তো চীন। ন্যাশনাল ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকসের প্রধান মা জিয়ানতাংয়ের মন্তব্য, ‘পরিবার পরিকল্পনা নীতিকে পুরোপুরি কার্যকর না করলে আমাদের জনসংখ্যার দ্রুত প্রবৃদ্ধিকে কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে রাখা যেতো না। সেজন্য এক সন্তান নীতি ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য।
ওয়াং ফেং ও তার সতীর্থরা যুক্তি দেখিয়ে বলেছেন, এক সন্তান নীতি বাদ দেয়া উচিত। প্রজনন হার কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে অনেক আগে। বর্তমান হার প্রতিস্থাপন স্তরের বেশ নিচে। এক সন্তানের বদলে দুই সন্তানের নীতি গ্রহণ করলে সমালোচকদের মুখ বন্ধ হয়ে যাবে। সিনহুয়া সেন্টার ফর পাবলিক পলিসির গবেষণা অনুসারে, চীনের খুব কম পরিবারই দুয়ের অধিক সন্তান গ্রহণে আগ্রহী।
সস্তা শ্রমের দিন শেষ হয়ে যাওয়ায় সরকারের এক সন্তান নীতি ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন। বর্ধিষ্ণু শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণের জন্য যতো শিশু জন্ম নেয়া প্রয়োজন, তার চেয়ে জন্ম নিচ্ছে অনেক কম। এক পরিবার-এক সন্তান নীতি গ্রহণ করে জনবিস্ফোরণের লাগাম বেশ ভালোভাবেই টেনে ধরেছে চীন। যদিও উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশের চেয়েই তাদের জনসংখ্যার ঘনত্ব কম। লোকসংখ্যা ১৩৪ কেটি হলেও রয়েছে বিশাল ভূখণ্ড। অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য ভবিষ্যতে চীন স্বাগত জানাবে অভিবাসীদের।
চীনের সাবেক প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও হালকা ইঙ্গিত দিয়েছিলো, দেশের দূরবর্তী অঞ্চলগুলোর জন্য এক সন্তান নীতিতে পরিবর্তন আসতে পারে, কিন্তু শহরাঞ্চলের জন্য ঠিকই আসবে। কারণ সার্বিকভাবে নিম্নহার ধরে রাখতে চীন মরিয়া। কেউ কেউ বলছেন, এ অবস্থান থেকেও শেষ পর্যন্ত সরকার সরে আসবে। গৃহীত হবে ‘টু-ফর-অল নীতি’। কিন্তু তাতেও হয়তো অনেকেই সন্তুষ্ট হবে না। সন্তানের সংখ্যার প্রশ্নে তারা পুরোপুরি স্বাধীনতা চায়। কিছুদিন আগেও পরিস্থিতি ছিলো ভিন্ন। পারিশ্রমিকে অতৃপ্ত থাকলেও শ্রমিকদের কিছুই করার থাকতো না। কারণ একটু এদিক-ওদিক করলেই চাকরি নট হয়ে যেতো। পেছনে অনেকেই দাঁড়িয়ে থাকতো সেই চাকরিটি দখলের অপেক্ষায়। কিন্তু এখন আর কম পারিশ্রমিকে লোক খাটিয়ে নেয়া যায় না। কাজ নেয়ার আগে তুলনামূলক মজুরির বিষয়টি মাথায় রাখে তারা।
— ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউন অনুসরণে