কোলোন ও রেক্টাল ক্যান্সার

অধ্যাপক, মেডিকেল অনকোলজি বিভাগ জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা পরিপাক নালীর শেষের অংশের নাম কলোন (বৃহদান্ত)। ক্ষুদ্রান্ত বা স্মল ইনটেস্টাইন এর পর শুরু হয় কলোন বা বৃহদান্ত যা নীচের দিকে নামতে নামতে এনাল ক্যানেল বা পায়ুপথ-এ শেষ হয়। দৈঘ্যে প্রায় পাঁচ ফুট এবং ব্যাস আড়াই ইঞ্চির মত। পরিপাক নালীর অন্যান্য অংশের মত কলোন ও রেক্টাম সম্পূর্ণভাবে মাংসপেশী দ্ব্বারা গঠিত। তবে কিছুটা ভিন্নতরভাবে বিন্যাস্ত। নালীর ভেতরে ও বাইরে আবরণী বা পর্দা দিয়ে ঢাকা। অসংখ্য রক্ত নালী (শিরা ও ধমনি), লিম্ফ নালী ও লিম্ফ নোড এবং স্নায়ু (নার্ভ) জড়িয়ে আছে। কলোনের পাঁচটি অংশ। কলোনের শেষ পাঁচ/ছয় ইঞ্চি হলো রেক্টাম। প্রতিটি অংশই সম্মিলিতভাবে কাজ সম্পাদন করে। খাবার পরিপাক ও হজম হওয়ার পর কলোনে পৌঁছে। প্রধান কাজ হজম হওয়া খাবার হতে পানি শুষে নেয়া এবং মল (স্টুল) তৈরী করে। খাবারের সাথে প্রবেশ করা কিংবা পরিপাকে তৈরী হওয়া ক্ষতিকর পর্দাথ মলের সাথে শরীর থেকে পায়ুপথে বের করে দেয়। শরীরকে দূষণমুক্ত করে। কলোন ও রেক্টাল ক্যান্সারকে এক সঙ্গে কলোরেক্টাল ক্যান্সার বলে। বেশীর ভাগ কলোরেক্টাল ক্যান্সার শুরু হয় ছোট্র পলিপ হতে। পলিপ হলো এক গুচ্ছো কলোরেক্টাল নালীর আবরণী কোষের সমাহার, যা ক্যান্সার নয়। দিনে দিনে এ পলিপ বড় হতে থাকে। একসময় এটা ক্যান্সারে রূপ নেয়। পলিপ হতে ক্যান্সারে রূপান্তর ঘটতে সময় লাগে গড়ে ১০ বছর। খুব ধীরে ধীরে এ পরিবর্তন ঘটে। তবে সব ধরনের পলিপ থেকে ক্যান্সার হয় না। পলিপ থেকে রক্তক্ষরণ হতে পারে। কলোন বা রেক্টামের নালী পথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। নারী পুরুষ উভয়ই এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। তবে পুরুষদের মধ্যে এ ক্যান্সারের হার তুলনামূলকভাবে বেশী। সাধারণতঃ আক্রন্ত রোগীরা পঞ্চাশ এবং পঞ্চাশ উর্ধ্ব বয়সী হয়ে থাকেন । তবে উল্লেযোগ্য সংখ্যক রোগীর বয়স ৪০ বছরের কম। বিশেষ করে রেক্টাল ক্যান্সার কম বয়সীদের মধ্যে বেশী পাওয়া যাচ্ছে। পৃথিবীর সকল দেশেই এ রোগের প্রকোপ এক রকম নয়। উন্নত দেশে বিশেষ করে আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের দেশে এ রোগ তৃতীয় প্রধান রোগ। পরিবেশ, জীবনযাত্রা, খাদ্রাভ্যাস ও জিন এ রোগে আক্রান্ত হতে প্রভাব ফেলে। উন্নত দেশে জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাস এর পরিবর্তন করার ফলে এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার ধীরে ধীরে কমে আসছে। ক্যান্সার স্ক্রিনিং করে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ সনাক্ত হচ্ছে এবং উপযুক্ত চিকিত্সায় এরোগ নিরাময় হচ্ছে এবং রোগ জনিত মৃত্যুর হার কমে আসছে। উন্নয়নশীল দেশে কলোরেক্টাল ক্যান্সারের প্রকোপ তুলনামূলক কম হলেও দিন দিন এ রোগের হার বেড়ে যাচ্ছে। কারণ উন্নত দেশের অনুকরণের জীবনযাপন ও খাবার দাবারের অভ্যাস করা। অজ্ঞতা ও অসচেতনাতার কারণে অনেক দেরীতে রোগ সনাক্ত হয়ে থাকে। কলোরেক্টাল ক্যান্সারের কি কি উপসর্গ থাকে একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে কোন উপসর্গই থাকে না। তাই এ রোগ নির্ণয়ের জন্য স্ক্রিনিং-এর গুরুত্ব এত বেশী। অর্থাত্ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের কলোরেক্টাল ক্যান্সারের জন্য নির্ধারিত পরীক্ষা করে রোগ সনাক্ত করা। কলোরেক্টাল ক্যান্সারের সংকেত গুলো হলো পায়ুপথ দিয়ে রক্তক্ষরণ মলত্যাগের পর পরই মলে (স্টুল) রক্ত ফোটা দেখতে পাওয়া। কিংবা পায়খানার পেনে রক্ত দেখা। মলের রং গাঢ় লাল বা কালো হওয়া মলের আকারের পরিবর্তন নীচের পেটে কামড়ানো ব্যথা পায়খানার বেগ চাপার মত অনুভূতি কিন্তু কোন পায়খানার করার প্রয়োজন নেই। অস্বস্থিকর অনুভূতি। পায়খানার অভ্যাসের পরিবর্তন। যেমন কিছুদিন খুবই কোষ্ঠ্যকাঠিন্য (কষা পায়খানা) আবার কিছুদিন পাতলা পায়খানা। কোন কারণ ছাড়া শরীরের ওজন কমে যাওয়া। কলোরেক্টাল ক্যান্সারের কারণ কি কারণে কলোরেক্টাল ক্যান্সার হয়, তা আজও অজানা। এ বিষয়ে নিরন্তন গবেষণা চলছে। তবে কিছু কিছু বিষয় কলোরেক্টাল ক্যান্সারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। বয়সঃ পঞ্চাশ বছর পার হলে এ রোগের ঝুঁকি বাড়তে থাকে। কারণ বেশীরভাগ কলোরেক্টাল ক্যান্সার রোগী পঞ্চাশ এবং পঞ্চাশ উধর্ব হয়ে থাকেন। তাদের ক্যান্সার সনাক্ত হওয়ার বেশ কয়েক বছর আগে থেকে কলোন ও রেক্টামে পলিপ (যা ক্যান্সার নয়) গজিয়ে থাকে। পরবর্তীতে তা ক্যান্সার হয়ে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে যে প্রতি চারজনের মধ্যে একজন এ ধরনেরর পলিপ থেকে কলোরেক্টাল ক্যান্সার হয়ে থাকে। পুরুষদের মধ্যে এ রোগের প্রকোপ বেশী। কারণ পুরুষদের কলোরেক্টাল পলিপ বেশী হয়। পরিবারে কোলন ও রেক্টাল ক্যান্সারের ইতিহাস থাকলেঃপরিবারের রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়দের কলোরেক্টাল ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে বেশী কাছের আত্মীয় যেমন- মা-বাবা, ভাই-বোন, ছেলে- মেয়ের মধ্য হতে যে কেউ আক্রান্ত হলে। ঝুঁকি আরো বেড়ে যায় আক্রান্ত আপন জন যদি কম বয়সী (৪৫ বছরের কম) কিংবা একাধিক ব্যক্তি আক্রান্ত হয়ে থাকেন। পরিবরে অন্যান্য ক্যান্সারের ইতিহাস থাকলেঃ যেমন ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার, জযায়ু ক্যান্সার, স্তন ক্যান্সার ইত্যাদি। নিজের কোলন বা রেক্টাল ক্যান্সারের ইতিহাস থাকলে, পলিপের ইতিহাস থাকলেঃ একবার কলোরেক্টাল ক্যান্সার হলে দ্বিতীয় বার ক্যান্সার হতে পারে। পলিপ থাকলেও ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এলকোহলঃ অতিমাত্রায় এলকোহল পান করলে। ডায়াবেটিস মেলাইটাসঃ কলোন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। খাদ্যাভাসঃ অতিমাত্রায় চর্বি জাতীয় খাবার বিশেষ করে গরু, খাসির মাংস খাওয়ার অভ্যাস থাকলে, পাশাপাশি আঁঁশ জাতীয় খাবার যেমন শাক-শবজি, তরকারী, ফল ইত্যাদি খাবার কম খাওয়া হলে কলোন ও রেক্টাম ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। যেহেতু ডায়াবেটিস হলে কলোন ক্যন্সার হওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাই এটি একটি ভাল ধারণা যে ডায়াবেটিস প্রতিরোধে যে সকল খাবার খেতে হয়, তা কলোরেক্টাল ক্যান্সারও প্রতিরোধ হয়। ধূমপানঃ কলোরেক্টাল ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে মহিলারা ধূমপান করলে, কলোরেক্টাল ক্যান্সারের ঝুঁকি আরো বেশী হয়। শারীরিক পরিশ্রমঃ শারীরিক পরিশ্রম কম করলে অথবা অলস জীবন যাবন কলোরেক্টাল ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। মুটিয়ে যাওয়াঃ শরীরের ওজন বেড়ে গেলে কলোরেক্টাল ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ-মহিলাদের স্বাভাবিক বিএমআই (ওজন কেজি/উচ্চতা মিটার২) হলো ১৮ হতে ২৪ পর্যন্ত। বিএমআই ৫ বেশী হলে পুরুষদের কলোরেক্টাল ক্যান্সারের ঝুঁকি ২৪% বেড়ে যায় এবং নারীদের ক্ষেত্রে তা ৯%। কলোরেক্টাল ক্যান্সার স্ক্রিনিং যখন ক্যান্সারের কোন চিহ্ন বা উপসর্গ থাকে না। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ক্যান্সারের চিহ্ন খুঁজে দেখা। প্রাথমিক পর্যায়ে এ রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থার নাম ক্যান্সার স্ক্রিনিং। স্ক্রিনিং এর জন্য বিভিন্ন রকম পরীক্ষা আছে। সবার জন্য সব পরীক্ষা উপযুক্ত নাও হতে পারে। চিকিত্সকের সাথে পরামর্শ করে তা নির্ধারণ করা উচিত। কলোরেক্টাল ক্যান্সার স্ক্রিনিং এ নিম্ন লিখিত পরীক্ষা করানো হয়ে থাকে বছরে একবার মল পরীক্ষা (মলে রক্ত সনাক্ত করা)। এর পরীক্ষার নাম অকাল্ট ব্লাড। পাঁচ বছরে একবার সিগমোয়ডস্কোপি পরীক্ষা করা দশ বছরে একবার কলোনোস্কোপি পরীক্ষা করা। ঝুঁকিপূর্ণ হলে চিকিত্সকের পরামর্শে আরো ঘন ঘন পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। কি ভাবে কলোরেক্টাল ক্যান্সার প্রতিরোধ যায় ১. নিজে কলোরেক্টাল ক্যান্সার এর জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ তা জানা। ঝুঁকিপূর্ণ হলে চিকিত্সকের পরামর্শ নিতে হবে। কলোরেস্টাল স্ক্রিনিং-এ অংশ নিতে হরে। কলোন ও রেক্টামে কোন পলিপ থাকলে অতি দ্রুত তা কেটে বাদ দিতে হবে। ২. স্বাস্থ্রসম্মত খাবার খেতে জানতে হবে এবং অভ্যাস করতে হবে। প্রাণীজ উত্স খাবার যেমন গরু, খাসি, ভেড়া (লাল মাংস, চর্বি), প্রক্রিয়াজাত মাংস খাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দেয়া। বেশী বেশী আঁশ জাতীয় খাবার যেমন শাক শবজি, তরকারী, ফল, শস্যদানা খাবার খাওয়া। খাদ্য তালিকায় ভিটামিন, এন্টিঅক্সিডেন্ট ও ফাইটোকেমিকেলস সমৃদ্ধ খাবার থাকতে হবে। একই খাবার বেশী করে না খেয়ে বিভিন্ন প্রকার ফল তরকারী ও শবজি খেতে হবে। বিভিন্ন রং এর ফল ও সবজি। দিনে অন্তত পাঁচ থেকে সাত বার। ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার যেমন দই, দুধ, ডিম, ছোট মাছ। ৩. শারীরিক পরিশ্রম এর সময় এবং মাত্রা বাড়ানো। ৪. শারীরিক ওজন স্বাভাবিক রাখা। বিশেষ করে যাতে উপরের পেটে চর্বি জমতে না পারে। ৫. এলকোহল পানে অভ্যস্ত থাকলে তা কমিয়ে দেয়া। একেবারে বাদ দেয়া উত্তম। ৬. ধুমপান থেকে বিরত থাকা।