সুন্দরবন সংলগ্ন নদ-নদীতে নিষিদ্ধ জাল দিয়ে পোনা আহরণ চলছেই

সুন্দরবন উপকূলীয় নদ-নদীতে সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে নিষিদ্ধ কারেন্টজাল দিয়ে নির্বিচারে বাগদা, গলদা চিংড়ি ও পারশে মাছের পোনা আহরণ চলছে। কোষ্টগার্ড পশ্চিম (মংলা) জোনের সদস্যরা গত ১ বছরে প্রায় ১৭ কোটি টাকার কারেন্ট জাল আটক করলেও উপকূলীয় এলাকায় নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল দিয়ে পোনা আহরণ চলছেই। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতি ক্ষুদ্র ফাঁসের এ জাল থেকে অন্য পোনাও রেহাই পাচ্ছে না। একটি বাগদা পোনা সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রায় ৫০ রকম মাছের পোনা তিন শতাধিক জলজ উদ্ভিদ ধ্বংস হচ্ছে। এর ফলে সুন্দরবনসহ উপকূলীয় দক্ষিণাঞ্চলের মত্স্য সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য চরম হুমকির মুখে পড়েছে। মংলা উপজেলা মত্স্য অফিস সূত্রে জানা যায়, জানুয়ারী থেকে জুন মাস পর্যন্ত ৬ মাস বাগদা চিংড়ি পোনা আহরণ মৌসুম। প্রতি বছর সাগর ও সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী-খালে নিষিদ্ধ নেট জাল দিয়ে পোনা ধরতে আসা জেলেরা উপকূল সংলগ্ন নদীর চরে মৌসুমভিত্তিক অস্থায়ী বসতি গড়ে তোলে। সুন্দরবন সংলগ্ন মংলার পশুর নদীর বাজুয়া, লাউডোব, আমতলা, বানিশান্তা বাজার, চিলা ও জয়মনিরঘোলে ঘুরে যায় প্রতিদিন কয়েক হাজার নেট জাল ফেলে আর চরে টানা জাল দিয়ে পোনা ধরছে মৌসুমী জেলেরা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সুন্দরবনের সবচেয়ে বেশি টাকা আয় হয় পারশে পোনা থেকে। এক কেজি পারশেপোনার মূল্য ২৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা। গত ডিসেম্বর মাস থেকে পারশে ধরার মৌসুম শুরু হয় এবং এপ্রিল মাস পর্যন্ত চলবে। একশ্রেণীর মহাজনেরা লাভের আশায় গরিব জেলেদের হাজার হাজার টাকা অগ্রিম দিয়ে পোনা নিধনের জন্য সুন্দরবনে পাঠিয়েছে, মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে এতে সহযোগিতা করছে কতিপয় বনকর্মকর্তা-কর্মচারী। মংলার চিংড়ি ঘের ব্যবসায়ী ও মিঠেখালী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মাহামুদ হাসান বলেন, হ্যাচারীর বাগদা পোনার তুলনায় নদী থেকে আহরিত বাগদা চিংড়ির পোনা ঘেরে ছাড়লে তাতে উত্পাদন অনেক বেশি হয়ে থাকে। এ কারণেই ব্যবসায়ীদের কাছে নদীর পোনার চাহিদা বেশি। দামও বেশি হওয়ায় জেলেরা পাল্লা দিয়ে নদী-খাল থেকে এ সময় পোনা আহরণে ব্যস্ত থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ড. গাউসিয়া ওয়াহিদুন্নেসা চৌধুরী জানান, বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনষ্টিটিউট-এর এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, একটি বাগদার পোনা আহরণে ১৯ রকম চিংড়ি প্রজাতির পোনা, ৩১ রকম অন্যান্য মাছের পোনা ও ৩শ ১২ রকমের জলজ উদ্ভিদ ধ্বংস হচ্ছে। আমাদের মত্স্য সম্পদের জন্যে এ ক্ষতি অপূরণীয়। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি দরিদ্র এ জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। সেই সাথে কারেন্ট জাল ব্যবহারের ক্ষতির দিক সম্পর্কে স্থানীয় জনসাধারণকে আরো বেশি জানাতে হবে। যাতে তারা নিজেরাই সচেতন হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মংলা উপজেলা মত্স্য কর্মকর্তা বিশ্বজিত্ কুমার দেব বলেন, নেট জাল দিয়ে পোনা আহরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকলেও জেলেরা অবৈধভাবে পোনা সংগ্রহে নিয়োজিত রয়েছে। উপজেলা প্রশাসন ও আইন প্রযোগকারী সংস্থার সাথে সমন্বয় করে খুব শিগগিরই ব্যাপকভাবে উপকূল জুড়ে পোনা নিধন রোধে অভিযান কার্যক্রম পরিচালিত হবে। পরিবেশবিদ ও মংলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, এভাবে পোনা শিকার করলে সুন্দরবনের জলজ সম্পদ হুমকির মুখে পড়বে। এতে সামুদ্রিক মত্স্য সম্পদ কমে দেশে আমিষের ঘাটতি দেখা দেয়ার আশংকা রয়েছে। এ ব্যাপারে সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জ কর্মকর্তা সাহাব উদ্দিন জানান, অবৈধ পোনা শিকারীদের আটকে বন বিভাগের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কোষ্টগার্ড পশ্চিম (মংলা) জোনের অপারেশন কর্মকর্তা লে. কমান্ডার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ২০১২ সাল থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সুন্দরবন উপকূলসংলগ্ন বিভিন্ন নদী-খাল থেকে আমরা প্রায় ১৭ কোটি টাকার কারেন্ট জালসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ জাল আটক করেছি। নিষিদ্ধ কারেন্টজাল আটকে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।