দিনাজপুরে ৫৬ বধ্যভূমি ও গণকবর নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে

দিনাজপুরে ৫৬টি বধ্যভূমি ও গণকবর সংষ্কার আর সংরক্ষণের অভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে এগুলোকে সংরক্ষণ ও সংষ্কার করার দাবি জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধারা। তানা হলে স্বাধীনতার শত্রুরা আমাদের প্রকৃত ইতিহাসকে বিকৃত করে দিতে পারে। দিনাজপুর জেলা প্রশাসন ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সূত্রে জানা যায়, দিনাজপুরে মোট ৫৬টি বধ্যভূমি ও গণকবর রয়েছে। এর মধ্যে সদরে ৪টি, চিরিরবন্দরে ৬টি, পার্বতীপুরে ১২টি, হাকিমপুরে ৩টি, ফুলবাড়ীতে ৩টি, বিরলে ৫টি, খানসামায় ৩টি, বিরামপুরে ৪টি, ঘোড়াঘাটে ৬টি, নবাবগঞ্জে ৪টি, বীরগঞ্জে ৪টি ও সেতাবগঞ্জে ২টি বধ্যভুমি ও গণকবর রয়েছে। দিনাজপুরের বিরল, ফুলবাড়ী, নবাবগঞ্জ, পার্বতীপুরসহ বিভিন্ন বধ্যভূমি ও গণকবর পরিদর্শন করে জানা গেছে, বর্তমানে জরাজীর্ণ ও গোচারণভূমিতে পরিণত হয়েছে এসব। দেখে মনে হবে না যে এগুলো গণকবর ও বধ্যভূমি। কিন্তু এগুলোই আমাদের ইতিহাসের একটি অংশ। ৫৬টি বধ্যভূমি ও গণকবরের মধ্যে ১৯৭১ সালের ১৩টি ডিসেম্বর বিরলের বহলা গ্রামে হত্যা করা হয় ৪৩ জনকে। পরে স্থানীয়রা একটি কবরে সবাইকে দাফন করে। এই গণকবরের পার্শ্বে একটি স্মৃতিমিনার নির্মিত হয়েছে। এদিকে ১৯৭১ সালের ১০ অক্টোবর নবাবগঞ্জ উপজেলার চড়ারহাটে হত্যা করা ১০৫ জনের বধ্যভূমি ও গণকবরের কিছুদূরে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু ওই স্থানটিকে সংরক্ষন না করায় সেটি এখন গো-চারণ ভূমিতে পরিণত হয়েছে। ঐ স্থানটির কোন পবিত্রতা রক্ষা করা হচ্ছে না। ২১ নভেম্বর হিলির মুহড়াপাড়ায় পাক বাহিনীর সাথে যৌথ বাহিনীর যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৩৪৫ জন নিহত হয়। এই স্থানটি বর্তমানে আবাদি জমি হিসেবে ব্যবহূত হয়ে আসছে। ২৩ মার্চ দিনাজপুরের চিরিরবন্দরে সর্বপ্রথম পাকিস্তান বাহিনীর অত্যাচারের প্রতিবাদ করায় ৫০ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এটিই দিনাজপুরের প্রথম হত্যা। কিন্তু ঐ স্থানটিরও কোন সংস্কার হয়নি। এছাড়া পার্বতীপুর উপজেলার রহমতনগর, ইব্রাহীমনগর, আব্বাসনগর, মুজাফফরনগর, চিরিরবন্দর উপজেলার রানীরবন্দর হাইস্কুল বধ্যভূমি এবং বীরগঞ্জ উপজেলার ভবলদিঘি ও চাতলে অনেক মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। বর্তমানে সেগুলোও সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধারা জানান, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় দিনাজপুর জেলা সীমান্তবর্তী হওয়ায় এখানে অনেক গণহত্যা হয়েছে। এসব গণকবর ও বদ্ধভূমি আজও কালের সাক্ষী হিসেবে রয়েছে। জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সৈয়দ মোকাদ্দেস হোসেন বাবলু জানান, মুক্তিযুদ্ধের ৪১ বছর অতিবাহিত হলেও এখনও আমরা এসব সংস্কার ও সংরক্ষণ থেকে পিছিয়ে আছি। আগামী প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানাতে হলে অতিসত্বর এসব গণকবর ও বধ্যভূমি সংস্কার ও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। দিনাজপুর সদর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার লোকমান হাকিম জানান, গণকবর ও বদ্ধভূমিগুলোর বেশিরভাগই চিহ্নিত করা হয়নি। যাতে করে এই স্থানের সঠিক ইতিহাস অনেকের অজানা রয়ে গেছে। তিনি জানান, এসব গণকবর ও বধ্যভূমি চিহ্নিত এবং সংস্কার ও সংরক্ষণ করা না হলে স্বাধীনতার শত্রুরা বিকৃত ইতিহাস তৈরি করে আমাদের প্রকৃত ইতিহাসকে বিলুপ্ত করে দিতে পারে।