মনিরামপুরে জামায়াত-পুলিশ
সংঘর্ষে নিহত ১, আহত ২০
যশোর অফিস ও মনিরামপুর সংবাদদাতা
প্রকাশ : ২২ মার্চ ২০১৩, ২২:২৮
যশোরের মনিরামপুরে জামায়াত-শিবির কর্মীদের সাথে সংঘর্ষে পুলিশের গুলিতে একজন জামায়াত কর্মী নিহত এবং পুলিশসহ ২০ জন আহত হয়েছে। জয়পুর গ্রামের ইব্রাহিম মোল্লার ছেলে নিহত জামায়াত কর্মী আনিসুর রহমান (৩২) স্থানীয় ইটভাটায় শ্রমিকের কাজ করতো। আহতদের যশোর ও মনিরামপুরের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। প্রতিবাদে জেলা ১৮ দল রবিবার মনিরামপুরে অর্ধদিবস হরতাল ডেকেছে।
ঘটনার পর বিক্ষুব্ধ জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালায়। একইসাথে জামায়াত-শিবির কর্মীরা যশোর-সাতক্ষীরা মহাসড়কের চালকিডাঙ্গা, বেগারীতলা ও জালঝাড়াতে বড় বড় গাছের গুঁড়ি ফেলে রাস্তা অবরোধ করে। প্রায় ১০ ঘণ্টা অবরোধ চলার পর বিকাল প্রায় ৫টার দিকে পুলিশ ও র্যাব বিক্ষোভকারীদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দিতে সক্ষম হয়। ঘটনাস্থলে অবস্থানকারী যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুভাষ চন্দ্র সাহা গতকাল শুক্রবার বিকালে ইত্তেফাককে জানান, বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিজিবি সদস্যদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে। মনিরামপুর থানার এসআই শরিফুল জানান, সংঘর্ষে পুলিশ ২০ রাউন্ড চাইনিজ রাইফেল ও ১৫৭ রাউন্ড শর্টগানের গুলিবর্ষণ করেছে। মনিরামপুর থানায় মামলা হয়েছে।
মনিরামপুর থানার এএসআই হাফিজুর রহমান জানান, শুক্রবার খুব ভোরে মনিরামপুর থানা পুলিশ ও যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ জয়পুর গ্রামে অভিযান চালায়। এ এলাকায় বিভিন্ন সময় জামায়াত-শিবিরের হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার আসামিদের আটকের জন্য এ অভিযান চালানো হয়। ৪ জনকে আটক করা হয়। কিন্তু এর পরপরই জামায়াত-শিবির কর্মীরা মাইকে ডাকাতের প্রচারণা চালিয়ে গ্রামবাসীদের নিয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালায়। তারা লাঠিসোঁটা নিয়ে পুলিশের গাড়ি ঘেরাও, ভাঙচুর ও বেধড়ক মারপিট শুরু করে। এতে এসআই শঙ্কর চন্দ্র, কনস্টেবল মনিরুল, মোশাররফ, তন্ময়সহ ১০ পুলিশ সদস্য আহত হন। এক পর্যায়ে পুলিশ শর্টগানের গুলিবর্ষণ শুরু করলে দুইপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। এতে জামায়াত কর্মী আনিসুর রহমান নিহত এবং জামায়াত-শিবিরের কর্মীসহ ১০ গ্রামবাসী আহত হন। এরা হলেন:জয়পুর গ্রামের কাউসার আলীর ছেলে আলমগীর হোসেন (২৮), মতিয়ার রহমানের ছেলে আলমগীর হোসেন (২৫), মোহাম্মদ আলীর ছেলে রফিকুল (৩৫), ইউনুসের ছেলে আলী (৪৫), আবদুর রাজ্জাকের ছেলে সবুজ (২৮), ইবাদত হোসেনের ছেলে সাখাওয়াত হোসেন (৫৫), নূর ইসলামের স্ত্রী জোহরা বেগম (৪২), কাদের মোল্যার ছেলে আমজাদ (৪২), মশিয়ার রহমানের ছেলে এনামুল (১৮) ও ফরহাদ আলীর ছেলে শহিদুল ইসলাম (৪২)। আহতদের যশোর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও মনিরামপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
সংঘর্ষের পর পুলিশ চলে গেলে জয়পুর গ্রামের অন্তত ২০ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বাড়িতে হামলা চালায় জামায়াত-শিবির কর্মীরা। তারা বাড়িগুলোতে লুটপাটও চালায় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী গ্রামবাসী জানায়, ভোর সাড়ে ৫টার দিকে মনিরামপুর থানা পুলিশ মনিরামপুর উপজেলা জামায়াতের আমীর ফজলুর রহমান ও অপরাপর মামলার ৪ আসামিকে আটক করতে জয়পুর গ্রামে যায়। এ সময় পুলিশ ফজলুর রহমানকে না পেয়ে জয়পুর পশ্চিমপাড়ার জামতলা মসজিদের সামনে উপস্থিত হয়। সে সময় মসজিদে নামাজ চলছিল। নামাজ শেষে মুসল্লিরা বের হলে পুলিশ জামায়াতের কর্মী আক্কাস, মিজানুর, মন্টু ও মোশারফ হোসেনকে মসজিদের গেট থেকে আটক করে। এ সময় মসজিদের মাইক থেকে পুলিশকে প্রতিরোধের আহ্বান জানিয়ে মাইকিং করা হয়। স্থানীয় গ্রামবাসী লাঠিসোঁটা নিয়ে পুলিশের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং আটককৃত জামায়াত কর্মীদের ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। পুলিশ এ সময় গ্রামবাসীর ওপর লাঠিচার্জ করলে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুভাষ চন্দ্র সাহার নেতৃত্বে সেখানে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বাড়তি পুলিশ মোতায়েনের খবরে গ্রামবাসীদের মধ্যে উত্তেজনা তীব্র হয়ে ওঠে। পুলিশ গ্রামবাসীকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। গুলিবিদ্ধ আনিসুর রহমান সকাল সাড়ে ৬টার দিকে মারা যায়। এরপর বিক্ষুব্ধ জনতা যশোর-ঢাকুরিয়া ও যশোর-মনিরামপুর সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে গাছের গুঁড়ি ফেলে সড়ক অবরোধ করে। ফলে যশোরের সাথে সাতক্ষীরা, মনিরামপুর ও কেশবপুরের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। গ্রামের নারী-পুরুষ লোহার রড, বাঁশের লাঠি ও দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে রাস্তায় পাহারা বসায়। বিকাল ৫টার কিছু আগে অবরোধকারীদের সরিয়ে দিয়ে পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা সড়ক স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসে।
সহকারী সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা আটক
যশোরে নাশকতা পরিকল্পনার অভিযোগে বায়েজিদ মোস্তফা নামে এক সহকারী সেটেলমেন্ট কর্মকর্তাকে আটক করা হয়েছে। তিনি যশোরের শার্শা উপজেলার শালকোনা গ্রামের আমানত বিশ্বাসের ছেলে এবং খুলনার রূপসা উপজেলার সহকারী সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা। বৃহস্পতিবার রাতে যশোর শহরের খোলাডাঙ্গা এলাকা থেকে তাকে আটকের পর শুক্রবার সকালে আদালতে সোপর্দ করা হয়। যশোর কোতয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম রহমান জানান, বায়েজিদ মোস্তফার খোলাডাঙ্গার বাড়িতে জামায়াত-শিবির কর্মীদের আশ্রয় প্রদান ও নাশকতা পরিকল্পনার অভিযোগ রয়েছে।
মনিরামপুরে রবিবার অর্ধদিবস হরতাল
পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জামায়াত কর্মী নিহত হওয়ার ঘটনায় মনিরামপুরে আগামীকাল রবিবার অর্ধদিবস হরতালের ডাক দিয়েছে জেলা ১৮ দল। শুক্রবার সন্ধ্যায় যশোর জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাস্টার নূর-উন-নবী হরতাল ঘোষণা নিশ্চিত করে জানান, সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত হরতাল। শুক্রবার রাতে যশোর জেলা বিএনপি কার্যালয়ে ১৮ দলের জরুরি সভায় মনিরামপুরের ঘটনায় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় শুধু মনিরামপুর নয়, জেলাব্যাপী হরতাল আহ্বান নিয়ে সভায় আলোচনা চলছিল। রাত পৌনে ৮টায় রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি।