সীমিত বাজেটের সংসার

অনিলা অফিসে যেতে যেতে বাসে বসে ভাবছিল, সংসার জীবনে খরচ এক অদ্ভূত জিনিস। যতই কমাতে চায় ততই বেড়ে চলে। তাদের দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে এই চারজনের পরিবার সামলাতে গিয়ে আজ তার নাজেহাল দশা। তার স্বামীও চাকরিজীবী। বহু চিন্তা ভাবনার মাধ্যমে সংসারের খরচ করলেও দেখা যায় মাসের শেষের আগে টাকা শেষ। তার স্বামী মাস শেষে নানা বিল, লোন শোধের জন্য বিভিন্ন জনের কাছে ধার নিতে থাকে। তাই মাসের পর মাস ধরে চলতে থাকে দেনা-পাওনার হিসাব। সময়ের সাথে সাথে সন্তানদের চাওয়া-পাওয়াও বাড়ছে। তাদেরকে যথেষ্ট সময় দিয়ে, সংসার পরিচালনা করা ও পাশাপাশি অফিস চালাতে গিয়ে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুহূর্ত পার করতে হচ্ছে অনিলাকে। প্রতিটি নারীর জীবনেই এমন একটা কঠিন পরীক্ষার সময় পার করতে হয়। যেখানে সংসার চালানোর জন্য বাজার, রান্নাবান্না, শিশুদের লেখাপড়া দেখাশোনার পাশাপাশি চাকরিক্ষেত্রে এগিয়ে যাবার লক্ষ্যে সকলের মধ্যে ভাল করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়। এই সময় জীবন যুদ্ধে টিকে থাকতে হলে প্রয়োজন ধৈর্যের সাথে ঠাণ্ডা মাথায় সব পরিস্থিতি মোকাবিলার ক্ষমতা। প্রয়োজন সঠিকভাবে সময় ভাগ করে নিয়ে পাশাপাশি সব ধরনের কাজ চালিয়ে যাবার দক্ষতা। এজন্য প্রতি মাসের শুরুতেই সাংসারিক খরচের হিসাব করে নিতে হবে। তাতে অবশ্যই স্বামী ও টিনএজ সন্তানের উপস্থিত থাকতে হবে। বাড়ির নানা বিল, বাড়ি ভাড়ার টাকা মাসের শুরুতেই ভিন্ন ভিন্ন ব্যাগে রেখে দিতে হবে। মোট বাজেটের সবচেয়ে বেশি খরচ হয় খাওয়া দাওয়ার জন্য। এ খাতে যেন প্রয়োজনের অতিরিক্ত খরচ না হয় সেদিকে সচেতন থাকতে হবে। বাজারের ক্ষেত্রে অনেক সময় দেখা যায় স্বামী কী প্রয়োজন তা না জেনেই নানা ধরনের বাজার করে নিয়ে আসে। হয়ত অনেক বাজার আগেই বাড়িতে আছে। তাই কে কী বাজার করবে, কী পরিমাণ করবে তা নিয়ে মাসের শুরুতেই আলোচনা করে রাখতে হবে। কোন শপিং মলে যাবার আগে প্রয়োজনে ফ্রিজ খুলে বাড়িতে কি কি আছে তা দেখে নিতে হবে, যেন শুধু শুধু কিছু নষ্ট না হয় তা বিবেচনা করতে হবে। বাইরে দোকানে গেলেই সন্তানের জন্য চিপস, চকোলেট, খেলনা এসব কিনতে হলে তার স্বভাব পরিবর্তন করতে হবে। ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে উপলব্ধি করাতে হবে কোনটি সখ ও কোনটি প্রয়োজন। তার স্কুল ফি, যাতায়াত ভাড়া, বইপত্রে খরচ এসবই প্রয়োজনীয়। বাইরে ব্যয়বহুল পার্কে যাওয়া, খেলনা কেনা, ভাল দোকানে খাওয়া এসবই সখ। স্ত্রী ও স্বামীর স্বল্প আয়ের মধ্যে সংসার চালাতে হলে সন্তানকেও প্রয়োজন ও সখের মধ্যে সমতা রক্ষা করে চলা শিখতে হবে। সন্তানদের হাত খরচের জন্য কিছু টাকা রাখতে হবে। তাদের জমানোর জন্য ছোট ব্যাঙ্ক বা টাকা জমাবার বাক্স উপহার দেয়া যেতে পারে। তাদের জমানো টাকা থেকেই তার বন্ধুদের জন্য উপহার কিনে দিলে সেও জমানোর প্রয়োজনীয়তা ও টাকা খরচের ব্যাপারে সচেতন হয়ে উঠবে। নিজস্ব ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে তার লিমিট দেখে খরচ করতে হবে। মাস শেষে ক্রেডিট কার্ডের বিল দিতে না পারার জন্য বাড়তি জরিমানার ফাঁদে যেন না পড়তে হয় সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। দিন দিন জিনিসপত্রের দাম বেড়েই চলেছে। এসময় একজনের আয়ে পরিবার চালানো খুবই কঠিন। তাই স্ত্রীরও স্বামীর পাশাপাশি চাকরি চালিয়ে যেতে হবে। একদিকে যেমন মাসের শুরুতে সম্পূর্ণ বাজেট করার মধ্যে দিয়ে পুরো মাসের খরচ চালানোর মত পরিকল্পনা করতে হবে, তেমনি অফিসে সারা মাসে নিজ কাজের পরিকল্পনাও গড়তে হবে। পারিবারিক ও চাকরি জীবন যেন একে অপরের শত্রুতে না পরিণত হয় সে ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে। স্বামী-স্ত্রী দু’জনই পরামর্শের মধ্যে দিয়ে নিজেদের ক্যারিয়ারে যেন এগিয়ে যেতে পারেন সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, সন্তানের কথা চিন্তা করে একজন মাকে তার চাকরি জীবন বিসর্জন দিতে হয়। তেমনি নিশীতা (ছদ্মনাম)। তিন বছর আগে, তার মেয়ে তন্বী জন্মানোর আগে একটা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিতে কাজ করতেন। প্রিম্যাচিউর বাচ্চাকে অনেক সময় দিতে হবে এসব চিন্তা থেকে তিন বছর ধরে চাকরি থেকে বহু দূরে এক অন্য জগতে চলে গিয়েছিলেন। এখন নিশীতার আবার সেই চাকরিজীবনে ফেরত আসার ইচ্ছা। কিন্তু সে ভীত, প্রতিযোগিতার এই যুগে এত দিন পর সে কি আবার ফেরত আসতে পারবে? এ ধরনের ক্ষেত্রে নারীদের আত্মবিশ্বাস হারালে চলবে না। কেননা এই সময়ে কর্মক্ষেত্রের বাইরে থেকেও অজান্তে একজন নারী অনেক কিছু শিখে ফেলে। একাধিক বিষয় একসাথে ব্যবস্থাপনা করা। সময়ের মধ্যে সব কাজ সম্পন্ন করা। সব ধরনের পরিস্থিতিতে মানিয়ে চলা। যেসব অভিজ্ঞতা কখনই তুচ্ছ নয় । নানা ধরনের চাকরির ক্ষেত্রে এই জ্ঞানও কাজে লাগবে। তাই কোন কারণে চাকরিজীবন থেকে ঝরে পড়লেও অসুবিধা নেই, যে কোন সময় তা আবার শুরু করা যেতে পারে। সেসময়ে সাংসারিক জীবন থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতাও কোন অংশে কম নয়। সাংসারিক কারণে নিজের ক্যারিয়ার সম্পূর্ণ বিসর্জন না দিয়ে এ ধরনের ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসের সাথে চাকরিজীবনের পথে এগিয়ে আসতে হবে। এটা খুবই সম্ভব।