যারা মূলত গানের শ্রোতা তাদের জন্য কোনো গান হচ্ছে না

মু খো মু খি আসিফ আকবর। এ দেশের অন্যতম জনপ্রিয় একজন কণ্ঠশিল্পী। অসংখ্য জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন তিনি। দীর্ঘ বিরতির পর নিজের নতুন অ্যালবাম নিয়ে আগামী রোজার ঈদে ফিরছেন তিনি। পাশাপাশি চলচ্চিত্রের প্লে-ব্যাকেও কাজ করছেন। আজ এই গুণী শিল্পীর শুভ জন্মদিন। তার জন্মদিনে বিনোদন প্রতিদিন-এর পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা। নিজের সাম্প্রতিক ব্যস্ততা, জন্মদিন ও মিডিয়ার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন বিনোদন প্রতিদিন-এর সঙ্গে। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন রবি হাসান আজ তো আপনার জন্মদিন, আজকের এই বিশেষ দিনটি কীভাবে কাটানোর পরিকল্পনা করেছেন? হুমম, আজ আমার ৪২তম জন্মদিন। আমার ছেলে তো খুলনায় পড়ালেখা করে, আজকের দিনটিতে সে আমার কাছে নেই। আগামী মাসের ১৮ তারিখে ঢাকায় ফিরবে। তাই তেমন কোনো আয়োজন নেই, তবে আমার ছেলের ঢাকার বন্ধুরা আজ দুপুরে আমার সাথে খাওয়ার আবদার তুলেছে। তাই আজ জন্মদিন উপলক্ষে দুপুরের খাবারটা বাচ্চাদের সাথেই হচ্ছে। তারাই জানে কীভাবে সাজিয়েছে। আর সন্ধ্যায় আমার বন্ধুরা আসবে, রাতে একসাথে আমরা খিচুরি খাব। আপাতত এতটুকুই পরিকল্পনার মধ্যে আছে। মূলত আজ আমি সবার অতিথি, আমি শুধু দাওয়াত খাব। আপনার বর্তমান ব্যস্ততাগুলো একটু বলুন। শ্রীলঙ্কা যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সেটাতো বাদ দিয়েছি। এই বাদ দেওয়ার খবরটা তো আপনাদের পত্রিকায় প্রকাশও হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মারা যাওয়ায় দেশের বাইরে গিয়ে শো করাটা খারাপ দেখায় বলে যাইনি। এটা আসলে তার প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন ও শোক প্রকাশ করার জন্য আমার একটা ছোট্ট প্রয়াস। আপনি যেই অ্যালবামটির কাজ করছেন দীর্ঘদিন ধরে, সেটি সম্পর্কে জানতে চাই। আগামী রোজার ঈদেই অ্যালবামটি বাজারে প্রকাশ পাবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। প্রায় সব কাজই গুছিয়ে এনেছি। এখনকার গান নিয়ে কী বলবেন আপনি? সব সময়ই তারুণ্যের সময় ছিল, এখনও তাই। তবে এখন যন্ত্রনির্ভরতাটা একটু বেশি হয়ে গেছে। তারপরও তারা যদি তাদের গানের টেস্ট ফিল করতে পারে এবং শ্রোতারাও যদি সেই টেস্টটি সমানভাবে উপভোগ করতে পারে তাহলে অবশ্যই ভালো। আমাদের দেশে যখন ব্যান্ড সংগীত বেরিয়েছিল, তখন অনেকেই নাক সিঁটকিয়েছিল। কিন্তু এখন দেখুন, ব্যান্ড আমাদের সংগীত জগতে কত বড় অবদান রেখেছে, অডিও ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে বড় উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যান্ড। ঠিক এখন যারা মিউজিক করছে তাদের গানের মূল মজা উপভোগ করতে হলেও আরও দশ বছর অপেক্ষা করতে হবে। তবে কিছু কিছু কাজ খুবই বিরক্ত লাগে। আর এ রকম বিরক্তিকর কাজ সব জায়গাতেই আছে। এটা স্বাভাবিক। যাই হোক, এখনকার গানকে এবং তরুণদের চেষ্টাকে আমি পুরোপুরি পজেটিভলি দেখছি। গত প্রায় দেড় বছর ধরে এমন কোনো গান আসেনি যেটি সারা বাংলাদেশে হিট হয়েছে। এর কারণ কী বলে মনে হয়? আসলে সিডি ব্যবহারের যেই বিষয়টি ছিল, তা নষ্ট হয়ে গেছে। প্রথমত পাইরেসি এই ব্যবসাটাকে সংকুচিত করে দিয়েছে। তার উপরে রয়েছে নকল সিডির প্রচলন। এই দুই মিলিয়ে গান শোনার এই মাধ্যমটাকেই মূল্যহীন করে দিয়েছে। আরেকটা সমস্যা হয়েছে যে, যারা গীতিকার তারাই গায়ক, তারাই সুরকার আবার তারাই কম্পোজার। একাই সবকিছু হয়ে যাওয়াতে ভালো মানের কিছু বের হচ্ছে বলে মনে হয় না। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, আগে গানের মধ্যে প্রকৃতির একটা ভাব ও ছাপ থাকত, এখন সেটা নেই। গানবাজনা এখন রুমনির্ভর হয়ে গেছে। সবার গানের কথাতেই প্রায় একই শব্দ ও অর্থ। আর একক ব্যক্তিকেন্দ্রিক মিউজিক হওয়াতে সমস্যাটা আরও বেশি হয়েছে। সে যে খারাপ মিউজিক করে তা না, তবে তার কাজে এক্সপেরিমেন্টাল কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না। কাজে ভেরিয়েশনের জন্য শুধুমাত্র একজনকে দিয়ে কাজ করাটা ঠিক বলে মনে হয় না। তারপর আমাদের গান আসলে কোন শ্রেণীর মানুষ বেশি শুনে তার উপর কোনো জরিপ করা হচ্ছে না। যারা মূলত গানের শ্রোতা তাদের জন্য গান তৈরি হচ্ছে না। যারা তৈরি করছে তারা শুধুই নিজের জন্য তৈরি করছে। সমস্ত বিশ্বেই সিডির বাজার চাঙা, শুধুই আমাদের দেশ ছাড়া। এসব অনলাইন ঝামেলা আসলে তেমন কোনো বিষয় না। কিছু কিছু ওয়েব সাইট আছে যেখানে অ্যালবাম দুপুরে প্রকাশ পেলে সন্ধ্যায় আপলোড হয়ে যায়। এই পাইরেটেড সাইটগুলো বন্ধের কোনো উদ্যোগ কি আপনারা নিচ্ছেন? এগুলো নিয়ে তো অনেক আগে থেকেই কথা হয়ে আসছে। যদিও এখনও বড় ধরনের কোনো সুরাহা হয়নি। তবে বর্তমান সরকার একটা পদক্ষেপ নিয়েছেন। তা হলো তাদের ওয়েবে কমপ্লেইন করলে দ্রুত অ্যাকশনে যাবে তারা। এখন প্রয়োজন হচ্ছে শিল্পীরা, অডিও ব্যবসায়ীরা একসঙ্গে বসে মিলেমিশে একটা সিদ্ধান্তে যেতে হবে এবং এসব পাইরেটেড সাইটের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নিতে হবে। এখন এটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আলোচনায় বসার আয়োজনটা করাই হচ্ছে মুখ্য বিষয়। সবাই বলছে অডিও বাজারের মন্দাবস্থা। একেবারেই ব্যবসা নেই, তারপরও অ্যালবাম প্রকাশ নিয়ে কেউ থেমে নেই। কেউ কেউ আবার কোনো কোনো গানের ভিডিওর পেছনে ৩০ লক্ষ টাকাও ব্যয় করছে। এই বিষয়টা নিয়ে আপনার মতামত জানতে চাই। আসলে এখন যারা অ্যালবাম বের করছে তাদের অধিকাংশই হচ্ছে নতুন শিল্পী। আর তারা অ্যালবাম বের করছে একেবারেই শখের বসে। আমাদের সময় যেটা হয়েছে যে সবাই প্রতিটি অ্যালবামের জন্য কোম্পানি থেকে টাকা পেয়েছে। এমনকি আমার প্রথম থেকে শেষ অ্যালবাম পর্যন্ত কোম্পানি আমাকে টাকা দিয়েছে। এখন যারা আসছে মিডিয়াতে তারা অধিকাংশই হচ্ছে লোভের বশবর্তী। আর কারও কারও টাকা আছে সেটা দিয়েই করছে। আবার কেউ স্টেজ থেকে নিয়মিত টাকা পাচ্ছে, সেখান থেকে অ্যালবাম করছে। যাই হোক ইন্ডাস্ট্রিতে অ্যালবাম আসছে এটা ভালো দিক। কেউ কেউ দামি মিউজিক ভিডিও বানাচ্ছে এটাও ভালো দিক। কিন্তু সবাইকেই খেয়াল রাখতে হবে এর আউটপুট কী হচ্ছে। খরচ করলাম কিন্তু ফেরত পেলাম না, ব্যবসা হলো না তাহলে সেটাকে প্রোডাকশন বলা যায় না। ফ্লপ জিনিস। আপনি আমাদের অডিও ইন্ডাস্ট্রিতে একটা বৈপ্লবিক উদাহরণ, আপনার অ্যালবাম কেনার জন্য মানুষ লাইনেও দাঁড়িয়েছে। তারপর আর এ রকমটা দেখা যায়নি কেন বলে মনে হয়? প্রথমত আমাদেরকে শ্রোতার চাওয়া বুঝতে হবে। শ্রোতারা কি গান চায় সেই চাহিদাটা বুঝার চেষ্টা তো কেউ করছে না। কেউ কেউ গান করে নিজের ভালো লাগা থেকে। আবার কেউ কেউ নিজেকে মিডিয়ায় ব্যস্ত রাখতে। তবে আমি বলতে পারি যে, সেই নজির আমি আবার দেখাব এবারের অ্যালবামটি দিয়ে আসছে রোজার ঈদে। সবাই আবারও দোকান থেকে সিডি কিনেই গান শুনবে। শুনতে বাধ্য হবে। এতটুকু গ্যারান্টি আমি দিচ্ছি এখনই, ইনশাহ আল্লাহ।