ফো ন হ্যা কিং ক ল ঙ্ক
ব্রিটেনে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে
আইন হচ্ছে
প্রকাশ : ২৪ মার্চ ২০১৩, ২০:৩৫
২০০২ সালের ঘটনা। ২১ মার্চ যুক্তরাজ্যের সারে শহরে মিলি ডাউলার নামে স্কুল পড়ুয়া এক তরুণী নিখোঁজ হয়। ২৭ এপ্রিল একটি কর্মসংস্থান এজেন্সি মিলির মোবাইলে ফোন করে। স্বাভাবিক কারণে মোবাইলটি বন্ধ পেয়ে তারা মিলির কাছে একটি ভয়েস মেসেজ (কণ্ঠ বার্তা) রাখে। বার্তাটি ছিল- তাদের ওখানে একটি চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, মিলি যদি কাজটি নিতে চায় সে যেন দ্রুত ঐ এজেন্সির সাথে যোগাযোগ করে। এর সপ্তাহখানেক পর ব্রিটেনের জনপ্রিয় ট্যাবলয়েড ‘নিউজ অব দি ওয়ার্ল্ড’ অনেক বড় করে খবর প্রকাশ করে যে, নিখোঁজ মিলি ডাউলার সেজে চাকরি নিতে যাচ্ছেন অন্য এক তরুণী। এর আগেও পত্রিকাটি নিখোঁজ এই তরুণীকে নিয়ে আরো বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর খবর প্রকাশ করে। পাঠক খুব আগ্রহ ভরে এসব খবর পড়লেও বিপত্তি ঘটে অন্যখানে। আরেকটি জনপ্রিয় দৈনিক দ্যা গার্ডিয়ান বিষয়টিকে সন্দেহের চোখে দেখে। তারা তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের জানায়, নিউজ অব দ্যা ওয়ার্ল্ড নিশ্চয়ই মিলির ভয়েজ মেইল হ্যাক করেছে অর্থাত্ ফোনে আঁড়ি পেতেছে। পুলিশ বিষয়টিতে তাত্ক্ষণিক কোন কর্ণপাত না করলেও ২০১১ সালে এসে বিষয়টি সত্য প্রমাণিত হয়। এটিই হচ্ছে বিশ্ব গণমাধ্যমে ঝড় তোলা ব্রিটিশ মিডিয়ার ফোন হ্যাকিং কেলেঙ্কারি।
এই ফোন হ্যাকিং কেলেঙ্কারি এত বেশি গুরুত্ব পাওয়ার বিষয়টি কিন্তু আরো বেশি গুরুতর। ছয় মাস পর নিখোঁজ মিলির গলিত লাশ উদ্ধার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। তখন তারা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটিকে খুনের মামলা হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। ধীরগতিতে চলতে থাকে তদন্ত। ২০০৭ সালে নিউজ অব দি ওয়ার্ল্ড আরেকটি চাঞ্চল্যকর খবর প্রকাশ করে যে, প্রিন্স উইলিয়ামের হাঁটুতে সমস্যা আছে। এ তথ্যে ভীষণ চটে যায় রাজপরিবার। তখনও সন্দেহ করা হয়, নিউজ অব দি ওয়ার্ল্ড রাজপরিবারের ফোন হ্যাক করছে। নিউজ অব দি ওয়ার্ল্ড ঐ খবরের প্রতিবেদক ক্লাইভ গুডমেনকে চাকরিচ্যুত করে এ যাত্রায় রক্ষা পায়। কিন্তু বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে খেলোয়াড়, অভিনেতা, অভিনেত্রীসহ সেলিব্রেটিদের নিয়ে পত্রিকাটির রোমাঞ্চকর কিংবা চাঞ্চল্যকর খবর প্রকাশ কখনো থেমে থাকেনি। ২০০৯ সালে গার্ডিয়ান পত্রিকা সরাসরি নিউজ অব দি ওয়ার্ল্ড বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ফোন হ্যাকিং করছে বলে খবর প্রচার করতে শুরু করে। ২০১০ সালে ডেভিড ক্যামেরন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর নিউজ অব দি ওয়ার্ল্ডের সাবেক সম্পাদক এন্ডি কুলসনকে তার ‘ডিরেক্টর অব কমিউনিকেশন’ দায়িত্ব দেন। তখন গার্ডিয়ান পত্রিকায় আরো বেশি সমালোচনার ঝড় ওঠে। বলা হয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে নিউজ অব দি ওয়ার্ল্ডের মালিক এবং সম্পাদকের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে- যা থেকে তিনি বড় অংকের পার্টি তহবিলসহ অন্যান্য রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করেন। ডেভিড ক্যামেরন এ নিয়ে মহাবিপাকে পড়েন।
নিউজ অব দি ওয়ার্ল্ডের মালিক নিউজ ইন্টারন্যাশনাল। এ কোম্পানির বেশিরভাগ শেয়ারের মালিক অস্ট্রেলিয়ান আমেরিকান রুপার্ট মার্ডকের পরিবার। বিশ্ব মিডিয়া জগতে এ কোম্পানির আধিপত্য সবচেয়ে বেশি। শুধু ব্রিটেনে তাদের সান, টাইমসসহ চারটি দৈনিক রয়েছে। স্কাই এবং ফক্স নিউজেরও অন্যতম অংশীদার তারা।
২০১১ সালের ২১ জানুয়ারি এন্ডি ক্যুলসন এক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর ডিরেক্টর অব কমিউনিকেশনের পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরপর নিউজ অব দি ওয়ার্ল্ডের চারজন সাংবাদিক গ্রেফতার হন। এ বছরের এপ্রিল মাসে নিউজ অব দি ওয়ার্ল্ডের মূল কোম্পানি নিউজ ইন্টারন্যাশনাল ২০০৪ সাল থেকে ২০০৬ পর্যন্ত কিছু ফোন হ্যাকিংয়ের ঘটনার দায় স্বীকার করে ভুক্তভোগীদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং ক্ষতিপূরণ দেবে বলে জানায়। তবে ঘটনার এ পর্যায়ে আবারো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মিলি ডাউলার। ২০১১ সালের জুন মাসে পুলিশ মিলির পরিবারকে জানায়, তারা লেভি বেলফিল্ড নামের একজন নাইট ক্লাব দারোয়ানকে মিলি হত্যার দায়ে গ্রেফতার করেছেন। পুলিশ আরো জানায়, কেউ একজন নিখোঁজ মিলির ফোন হ্যাক করেছিল। হ্যাকাররা নতুন নতুন ভয়েস মেইল জমা হওয়ার জন্য পুরনো মেইলগুলো ডিলিট করে দিয়েছিল। ঐ ভয়েস মেইলগুলো শুনা গেলে হয়তো অনেক আগেই এ মামলার সুরাহা করা সম্ভব হতো। স্বাভাবিক কারণে সন্দেহের তীর যায় নিউজ অব দি ওয়ার্ল্ডের দিকে। কারণ ভুয়া মিলি সেজে চাকরির আবেদনের খবরের কোন জবাব ছিল না তাদের কাছে। মিলির পরিবার এ নিয়ে মামলা করার সিন্ধান্ত নেয়। এরপর মিলির পরিবারের কাছে রুপার্ট মার্ডকের সরাসরি ক্ষমা প্রার্থনা আর ৩ মিলিয়ন পাউন্ড ক্ষতিপূরণ দেয়ার প্রস্তাবসহ টানা দুইদিন ব্রিটেনের সবগুলো দৈনিকে পূর্ণ পৃষ্ঠা ক্ষমা প্রার্থনার বিজ্ঞাপন কোন কিছুই নিউজ অব দি ওয়ার্ল্ডকে টিকিয়ে রাখতে পারেনি। ঐ বছরের ১০ জুলাই ১৬৮ বছরের পুরনো পত্রিকাটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
এই ফোন হ্যাকিং কেলেঙ্কারির জের ধরে আমূল পরিবর্তন আসছে ব্রিটেনের মিডিয়াতে। এতদিন এ দেশে মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণে কোন আইন ছিল না। অবাধ ও স্বাধীন গণমাধ্যমের অনন্য উদাহরণ ছিল ব্রিটিশ মিডিয়া। গত সপ্তাহে মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণে নতুন একটি কর্তৃপক্ষ গঠনের পাশাপাশি সর্বোচ্চ ১০ লাখ পাউন্ডের জরিমানার বিধান রেখে আইন প্রণয়নে সম্মত হয়েছেন ব্রিটেনের ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ এবং ক্ষমতাসীন জোটের শরিক লিবারেল ডেমোক্রেট ও বিরোধী লেবার পার্টি— এই প্রধান তিনটি রাজনৈতিক দলের নেতারা। ব্রিটেনের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ লর্ড সভায় বিল তোলা হবে। লেবার পার্টির নেতা এড মিলিব্যান্ড বলেছেন, এতে এমন কিছুই নেই যা স্বাধীন সংবাদপত্রের জন্য ভয়ের কারণ হতে পারে। লিবারেল ডেমোক্রেট নেতা উপ-প্রধানমন্ত্রী নিক ক্লেগ বলছেন, এতে যেমন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সুরক্ষিত হবে, তেমনি তাদের হাতে নিরপরাধ লোককেও যেন হয়রানি হতে না হয় তার নিশ্চয়তাও থাকবে। এ আইন বাস্তবায়ন হলে ব্রিটিশ গণমাধ্যম শুধু তার সুদীর্ঘ ঐতিহ্যই হারাবে না এর স্বাধীনতাও খর্ব হবে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।