অনিয়ম করে মুনাফা বাড়িয়ে লভ্যাংশ ঘোষণা

নিয়ম বহির্ভূতভাবে ব্যাংকিং পরিচালনা ও নতুন কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে প্রাইম ব্যাংক। বিতরণ করা ঋণ খেলাপী হলে তার বিপরীতে প্রভিশন (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) রাখার বিধান থাকলেও তা করেনি ব্যাংকটি। প্রভিশন সঠিকভাবে করা হলে গেল বছরে ব্যাংকটির লোকসান হত। তা না করে জালিয়াতির মাধ্যমে উল্টো লাভ দেখানো হয়েছে। সে অনুযায়ী শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ২০ শতাংশ ডিভিডেন্ডও ঘোষণা করা হয়েছে। আর তাদের এ কাজে সহযোগিতা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। জানা গেছে, প্রাইম ব্যাংককে এত বড় ধরনের অনিয়মের সুযোগ দেয়ার বিষয়টি জেনে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা। অন্যদিকে প্রাইম ব্যাংক এ ধরনের সুযোগ পাওয়ায় অন্যান্য ব্যাংকও এ ধরনের অনিয়ম করতে উত্সাহিত হচ্ছে। এমনকি অবৈধ সুবিধা নেয়ার জন্য ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংককে অনুরোধ করেছে কয়েকটি ব্যাংক। অন্যথায় ব্যাংকটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে ওইসব ব্যাংকের পক্ষ থেকে। সূত্রমতে, ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকের প্রকৃত (নিট) মুনাফা দেখানো হয়েছে ২৬৮ কোটি টাকা। অথচ গত বছর শেষে ব্যাংকটির আরো ৪০০ কোটি টাকা খেলাপী থাকলেও তার বিপরীতে কোন প্রভিশন রাখা হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী যে প্রান্তিকে ঋণ খেলাপী হবে সে প্রান্তিকেই ব্যাংককে প্রভিশন রাখতে হবে। বিশেষ করে ডিসেম্বর প্রান্তিকে অবশ্যই প্রভিশন রাখার নিয়ম। এ পরিমাণ প্রভিশন রাখলে লাভের বদলে ১৩২ টাকা লোকসানে পড়তো ব্যাংকটি। জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগ (১) ও ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি এন্ড কাস্টমার সার্ভিসেস ডিপার্টমেন্টের পরিদর্শনে দেখা গেছে, টেরিটাওয়েল রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান বিসমিল্লাহ গ্রুপের কাছে ৩০৬ কোটি টাকা এবং চট্টগ্রামের জুবলী রোড শাখার এসএস শিপিং কর্পোরেশন ও এমএম কর্পোরেশনের কাছে ৯৪ কোটি টাকার ঋণ আদায় না হওয়ায় খেলাপী হয়েছে। এ ডিসেম্বর প্রান্তিকে এসব ঋণকে খেলাপী দেখালেও এর বিপরীতে প্রভিশন রাখার জন্য জুন পর্যন্ত সময় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর প্রভিশন রাখা টাকার মধ্যে নানা অনিয়ম জালিয়াতির কারণে ব্যাংকটির গত বছরে ১৩০ কোটি টাকা প্রভিশন রাখতে হয়েছে বলে ওই ব্যাংকের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী প্রতি প্রান্তিকে যে পরিমাণ ঋণ খেলাপী হবে তার বিপরীতে প্রভিশন রাখতে হবে। সে অনুযায়ী ৩১ ডিসেম্বরের আগেই সকল প্রভিশন সংরক্ষণ করার কথা। কিন্তু প্রভিশন না রেখে পরবর্তীতে তা সমন্বয় করে দেয়ার কথা বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছ থেকে বিশেষ অনুমোদন নেয় ব্যাংকটি। যা মারাত্মক অপরাধ। এক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ‘ম্যানেজ’ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এদিকে বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে এসে নিয়ম বহির্ভূতভাবে সকল ঋণের ক্ষেত্রে সুদ বাড়িয়ে দিয়েছে প্রাইম ব্যাংক। সব ঋণের ক্ষেত্রে দশমিক ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত সুদ বাড়ানো হয়েছে। ব্যাংক বলছে, বছরের শেষ তিন মাসের (চতুর্থ প্রান্তিক) জন্য এটা করা হয়েছে। অন্যদিকে এসএমএস (শর্ট মেসেজ সার্ভিস) চার্জ বাবদ ব্যাংকের সকল একাউন্ট থেকে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা কেটে রাখা হয়েছে। যেসব গ্রাহক এসএমএস পাওয়ার জন্য অপশন দেয়নি এমন গ্রাহক এবং অনেক একাউন্টে কোন মোবাইল নাম্বারও দেয়া নাই এমন একাউন্ট থেকেও টাকা কেটে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকটির এ ধরনের অনিয়মের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহাঃ রাজী হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ব্যাংক যখন লোকসানে পড়ার আশঙ্কা থাকে তখন এডজাস্ট করার জন্য কিছুটা সময় দেয়া হয়। গত বছরও সাত আটটা ব্যাংককে এ ধরনের সুযোগ দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী তা করা হয় কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা সব সময়ের জন্য নয়, যেসব ব্যাংক এ ধরনের সমস্যায় পড়ে শুধু তখনই এ সুযোগ দেয়া হয়। প্রাইম ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়াসিন আলী বলেন, বিসমিল্লাহ গ্রুপ ও জুবেলী শাখার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক যেটা করেছে তা হলো কোয়ালিটিটিভ জাজমেন্টের ভিত্তিতে। পরিদর্শক দল বলেছে যে, পরবর্তীতে এটা খেলাপী হতে পারে। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে সময় চাওয়ায় তারা সময় দিয়েছে। সুদ বেশি আদায় ও এসএমএস চার্জের কথা জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমার জানা নেই এবং এমডি ছাড়া অন্য কারো বলারও অনুমতি নেই। অর্থনীতিবিদ আবু আহমদ বলেন, যে প্রান্তিকের ঋণ খেলাপী হবে সে প্রান্তিকে প্রভিশন রাখার নিয়ম থাকলেও শেয়ারহোল্ডারদের ডেভিডেন্ট দেয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক এ সুযোগ দিয়ে থাকতে পারে। জানা গেছে, প্রাইম ব্যাংক পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক খাতের ‘এ’ ক্যাটাগরির ৩১ ডিসেম্বর ২০১২ পর্যন্ত সমাপ্ত অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীদের জন্য ১০ শতাংশ ক্যাশ এবং ১০ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি পরপর তিন বছর বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড না দিলে জেড ক্যাটাগরির হয়ে যায়।