মার্চের দিনলিপি

গ্রন্থনা :আসিফুর রহমান সাগর ১ মার্চ ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা হলেও চূড়ান্ত আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল পয়লা মার্চ। পাকিস্তানের তত্কালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এদিন বেতার ভাষণে ৩ মার্চের গণপরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। ২ মার্চ ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক ছাত্রসমাবেশে বাংলাদেশের মানচিত্র-খচিত পতাকা উত্তোলন করা হয়। লাল, সবুজ, সোনালি—তিন রঙের পতাকাটি সেই যে বাংলার আকাশে উড়ল তা আর নামাতে পারেনি পাকিস্তানের সুসজ্জিত সেনাবাহিনী ও সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক জনসভা আহ্বান করা হয়। সেই বিশাল সভায় পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ছাত্রলীগ সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী ও সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি আ স ম আব্দুর রব, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কুদ্দুস মাখন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। ৩ মার্চ একাত্তরের এই দিনে ঢাকা ছিল প্রতিরোধের নগরী। এই দিনেই ঘোষিত হয় স্বাধীনতা সংগ্রামের রূপরেখা। পল্টনে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আয়োজিত বিশাল সমাবেশ থেকে অসহযোগের ডাক দিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেখানে পাঠ করা হয় স্বাধীনতার ইশতেহার। এই দিনেই নির্ধারণ করা হয়—সাড়ে সাত কোটি মানুষের স্বপ্নলালিত দেশের নাম হবে ‘বাংলাদেশ’; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা’ হবে জাতীয় সংগীত। এদিন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এক ঘোষণায় আগামী ১০ মার্চ ঢাকায় নেতৃবৃন্দের সম্মেলন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। রাওয়ালপিন্ডির প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে ঘোষণা করা হয়—এই সম্মেলনের পর দু-সপ্তাহের মধ্যে জাতীয় পরিষদ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার আমন্ত্রণ তাত্ক্ষণিকভাবে প্রত্যাখান করেন। ৪ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত এবং আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে সরকারের চক্রান্তের প্রতিবাদে গোটা পূর্ব বাংলার মানুষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে আন্দোলনে যোগ দিতে শুরু করে। সরকারি-বেসরকারি সকল কর্মচারী, রেডিও-টেলিভিশনের শিল্পী-কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্কুল-কলেজের শিক্ষক—সবাই এসে মিলিত হচ্ছিল স্বাধিকার আদায়ের এ আন্দোলনে। সারা দেশে সেনাবাহিনীর গুলিতে অসংখ্য মানুষ শহীদ হন। হরতাল চলাকালে খুলনায় সেনাবাহিনীর গুলিতে ৬ জন শহীদ হন। চট্টগ্রামে দু-দিনে প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়ায় ১২১ জনে। ৫ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে পঞ্চম দিনের মতো হরতাল পালনকালে সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যদের গুলিতে টঙ্গী শিল্প এলাকায় ৪ জন শ্রমিক শহীদ হন এবং ২৫ জন শ্রমিক আহত হন। এ সংবাদে ঢাকাসহ সারা দেশের জনগণের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। জনরোষের মুখে সন্ধ্যায় সরকারিভাবে সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরিয়ে নেবার ঘোষণা দেওয়া হয়। ৬ মার্চ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান দুপুরে এক বেতার ভাষণে ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন। তিনি বলেন, যা-ই ঘটুক, যদ্দিন পর্যন্ত পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আমার হুকুমে রয়েছে এবং আমি পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান রয়েছি তদ্দিন আমি পূর্ণাঙ্গ ও নিরঙ্কুশভাবে পাকিস্তানের সংহতির নিশ্চয়তা বিধান করব। ৭ মার্চ সফেদ পাজামা-পাঞ্জাবি আর হাতাকাটা কালো কোট পরে দৃঢ়তার সাথে হেঁটে এসে সেদিন মঞ্চে উঠেছিলেন দীর্ঘদেহী এক বাঙালি। সাথে করে তিনি নিয়ে এসেছেন সাড়ে সাতকোটি বাঙালির ভবিষ্যত্, আত্মসম্মান ও অধিকার আদায়ের মন্ত্র। পুরো জাতি তাঁর বজ্রনির্ঘোষ সেই উচ্চারণ শোনার প্রতীক্ষায় উদ্গ্রীব। সেই ভাষণ শুনতে ঢাকার প্রতিটি বাড়ির প্রতিটি ছেলে এসে উপস্থিত রেসকোর্স ময়দানে। কোনো ছেলে ঘরে বসে ছিল না। শুধু ঢাকা নয় সারা দেশের মানুষ উন্মুখ হয়ে বসেছিল সেই ভাষণের প্রতীক্ষায়। বঙ্গবন্ধুর সেদিনের সেই ভাষণ শুধু বাংলার নয়, পৃথিবীজুড়ে মানবমুক্তির আন্দোলনের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী উদাহরণ। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা ৭ই মার্চের ভাষণে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির মুক্তির সনদ ঘোষণা করেছিলেন। ৮ মার্চ এদিন থেকে পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকাসহ সকল শহর-গঞ্জে, সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত, স্কুল, কলেজ, বিশ্বদ্যািলয়, কলকারখানা জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বন্ধ করে দেয়। এমনকি সরকারের পুলিশবাহিনী ও ইপিআর বাঙালি সদস্যদের অনেকেই পরোক্ষভাবে বঙ্গবন্ধুর পদক্ষেপকে সমর্থন করেছিলেন। ৯ মার্চ ইতিহাসের এই দিনে আওয়ামী লীগ-প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ন্যাপ-প্রধান মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর মধ্যে সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। বিকেলে পল্টন ময়দানের জনসভায় তুমুল করতালির মধ্যে মওলানা ভাসানী বলেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকেও তা-ই বলি, অনেক হয়েছে, আর নয়। তিক্ততা বাড়াইয়া আর লাভ নাই। লা কুম দিনুকুম ওয়ালইয়া দিন, অর্থাত্ ‘তোমার ধর্ম তোমার, আমার ধর্ম আমার’ এ নিয়মে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা স্বীকার করিয়া লও। ১০ মার্চ এদিন তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রভাবশালী পত্রিকা ‘দৈনিক পাকিস্তান’ অবিলম্বে জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানিয়ে সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। কালবিলম্ব না করে জনগণের দাবিও মেনে নেওয়ার কথা বলা হয়। ১৯৭১ সালের এই দিন সকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজ বাসভবনে একদল বিদেশি সাংবাদিকদের সাথে সাক্ষাত্কার বৈঠকে মিলিত হন। বঙ্গবন্ধু এ সময় বলেন, সাত কোটি বাঙালি আজ নিজেদের অধিকার সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন। ১১ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে মিলিত হন ন্যাপ (ওয়ালি) পূর্ব বাংলা শাখার সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, পাঞ্জাব আওয়ামী লীগ সভাপতি এম খুরশীদ, কাউন্সিল মুসলিম লীগ প্রধান মমতাজ দৌলতানার বিশেষ দূত পীর সাইফুদ্দিন ও ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘের সহকারী আবাসিক প্রতিনিধি কে উলফ। ১২ মার্চ এই দিন লাহোরে এক সংবাদ সম্মেলনে গণ-ঐক্য আন্দোলনের প্রধান এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খান বলেন, পূর্বাঞ্চলের জনসাধারণ সমান অধিকার নিয়ে থাকতে চায়, পশ্চিমাঞ্চলের দাস হিসেবে নয়। পাকিস্তানকে রক্ষা করার জন্য এখন একটিমাত্র পথ খোলা রয়েছে আর তা হচ্ছে, শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর। ১৩ মার্চ ঢাকার জাতিসংঘ ও পশ্চিম জার্মানি দূতাবাসের কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারবর্গসহ ইতালি, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডার ২৬৫ জন নাগরিক বিশেষ বিমানে পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করেন। ১৪ মার্চ এই দিনে সকালে আওয়ামী লীগ-প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ন্যাপ নেতা খান আবদুল ওয়ালী খান আলোচনা বৈঠকে মিলিত হন। বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে রুদ্ধদ্বারকক্ষে প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী আলোচনায় জাতীয় পরিষদে আওয়ামী পার্লামেন্টারি দলের উপনেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ এইচ এম কামরুজ্জামানসহ অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বঙ্গবন্ধু বলেন, স্বাধীন দেশে স্বাধীন নাগরিক হিসেবে জীবনযাপনের জন্যই আমাদের সংগ্রাম। ১৫ মার্চ এদিন প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান কড়া নিরাপত্তার মধ্যে করাচি থেকে ঢাকা আসেন। বিমানবন্দরে সামরিক গভর্নর লে. জেনারেল টিক্কা খান তাঁকে স্বাগত জানান। কোনো সাংবাদিক ও বাঙালিকে এ সময় বিমানবন্দরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। ১৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সকালে ঢাকায় প্রেসিডেন্ট ভবনে প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের সাথে আড়াই ঘণ্টাব্যাপী এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হন। শেখ মুজিবুর রহমান গাড়িতে কালো পতাকা উড়িয়ে প্রেসিডেন্ট ভবনে প্রেসিডেন্টের সাথে সাক্ষাত্ করতে যান। আলোচনা শেষে বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে বের হয়ে এলে সেখানে অপেক্ষমাণ দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের জানান, ‘আমি রাজনৈতিক এবং অন্যান্য সমস্যা সম্পর্কে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনা করেছি। আরও আলোচনা হবে। কাল সকালে আমরা আবার বসছি। এর চেয়ে বেশি কিছু আমার বলার নেই।’ ১৭ মার্চ এদিন ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৫২তম জন্মদিন। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ মিছিল করে বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাসভবনে গিয়ে তাঁদের প্রাণপ্রিয় নেতাকে শুভেচ্ছা জানান। ১৮ মার্চ মুজিব-ইয়াহিয়া পরবর্তী বৈঠকের কোনো সময় নির্ধারিত না হওয়ায় জনমনে উত্কণ্ঠার সৃষ্টি হয়। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত উত্সুক জনতা তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে ভিড় জমায়। ১৯ মার্চ এক দিন বিরতি দিয়ে বঙ্গবন্ধু ও ইয়াহিয়া খান তৃতীয় দফা বৈঠক করেন। দেড় ঘণ্টাব্যাপী ওই বৈঠকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে কোনো সহকারী উপস্থিত ছিলেন না। সন্ধ্যায় প্রেসডেন্ট ভবনে উপদেষ্টা পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ২০ মার্চ এদিন সকালে কঠোর সামরিক প্রহরা পরিবেষ্টিত রমনার প্রেসিডেন্ট ভবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের মধ্যে চতুর্থ দফা আলোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর সাথে তাঁর ছজন শীর্ষস্থানীয় সহকর্মী উপস্থিত ছিলেন। প্রায় সোয়া দুই ঘণ্টা আলোচনা শেষে বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে বের হয়ে এসে সাংবাদিকদের বলেন, আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। তিনি এর বেশি কিছু বলতে অপারগতা জানিয়ে বলেন, ‘সময় এলে অবশ্যই আমি সব কিছু বলব।’ ২১ মার্চ সকালে জাতীয় পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর মহমান প্রেসিডেন্ট ভবনে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সাথে পঞ্চম দফা বৈঠকে মিলিত হওয়ার পূর্বে তাঁর নিজ বাসভবনে বিশিষ্ট আইনজীবী এ কে ব্রোহির সাথে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় মিলিত হন। ২২ মার্চ এদিন সকালে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করে বলেন, পাকিস্তানের উভয় অংশের নেতৃবৃন্দের মধ্যে আলোচনাক্রমে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের পরিবেশ সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টির জন্য ২৫ মার্চের অধিবেশন স্থগিত রাখা হয়েছে। ২৩ মার্চ আওয়ামী লীগ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সদস্যদের সামরিক কায়দায় অভিবাদনের মধ্য দিয়ে সকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বাসভবনে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। এ সময় ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ গানটি সমবেত কণ্ঠে পরিবেশিত হয়। ২৪ মার্চ সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ভবনে আওয়ামী লীগ ও সরকারের মধ্যে উপদেষ্টা পর্যায়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে আওয়ামী লীগের পক্ষে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ ও ড. কামাল হোসেন উপস্থিত ছিলেন। তাজউদ্দীন আহমদ উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বক্তব্য প্রদান শেষ হয়েছে। এখন প্রেসিডেন্টের উচিত তাঁর ঘোষণা দেওয়া। তিনি বলেন, আজ প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টাদের স্পষ্ট করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, আলোচনা অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে না। আওয়ামী লীগ আলোচনা আর দীর্ঘায়িত করতে প্রস্তুত নয়। ২৫ মার্চ এদিন ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাযজ্ঞের ভয়াল কালরাত। একাত্তরের এই রাতে স্বাধীনতাকামী বাঙালির ওপর বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী হিংস্র হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। পাকিস্তানি বাহিনী পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী পূর্ণ সামরিক অস্ত্র নিয়ে শুরু করে সারা দেশব্যাপী পৃথিবীর ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসলীলা। সামরিক ভাষায় ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পরিচিত ছিল এই হত্যা-অভিযান। মধ্যযুগীয় কায়দায় হানাদাররা রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা ইপিআর সদর দপ্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ গোটা ঢাকা শহরে চালায় হত্যাযজ্ঞ এবং অগ্নিসংযোগ। এই রাতেই গ্রেপ্তার করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। তিনি দেশকে শুত্রুমুক্ত করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তে দেশের মানুষের প্রতি আহ্বান জানান। ২৬ মার্চ ২৬ মার্চ আমাদের মহান স্বাধীনতা দিবস। ২৫ মার্চের মধ্যরাত থেকে শুরু হওয়া ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বাঙালি এই দিন থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও দেশ স্বাধীন করার শপথ গ্রহণ করে। এই দিনেই প্রতিটি বাঙালির মনে নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের বীজ রোপিত হয়। নব সূর্যোদয়ের মধ্য দিয়ে সূচিত হয় নতুন প্রতিজ্ঞার ইতিহাস। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি বাহিনী বিভীষিকাময় অবস্থার সৃষ্টি করে মেশিনগান-মর্টারের গোলা আর আগুনের লেলিহান শিখায়। দিনের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরপরাধ বাঙালির বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ ঘোষণা করলে মুক্তি সংগ্রামের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন, ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনী অতর্কিতে পিলখানায় ইপিআর ঘাঁটি, রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রমণ করেছে এবং শহরের লোকদের হত্যা করেছে। ঢাকা, চট্টগ্রামের রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ চলছে। আমি বিশ্বের জাতিসমূহের কাছে সাহায্যের আবেদন করছি। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা বীরত্বের সঙ্গে মাতৃভূমি মুক্ত করার জন্য শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করছে। সর্বশক্তিমান আল্লাহর নামে আপনাদের কাছে আমার আবেদন ও আদেশ দেশকে স্বাধীন করার জন্য শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যান। কোনো আপোস নাই, জয় আমাদের হবেই। আমাদের পবিত্র মাতৃভূমি থেকে শেষ শত্রুকে বিতাড়িত করুন। সকল দেশপ্রেমিক ও স্বাধীনতাপ্রিয় লোকদের এ সংবাদ পৌঁছে দিন। আল্লাহ আপনাদের মঙ্গল করুন। জয় বাংলা।’