এ পতাকা তোমাদের
প্রকাশ : ২৫ মার্চ ২০১৩, ১৯:২৬
আমি সেই জাতীয় পতাকাটি একটি কিশোরকে দিয়েছিলাম উত্তোলনের জন্য। আমার মনে হয়েছিল, আমরা দেশ স্বাধীন করলাম। আমাদের পরবর্তীর প্রজন্মের হাতে সে দেশ গড়ার দায়িত্বই যেন সঁপেছিলাম সেদিন। আসলে আমি বলতে চেয়েছিলাম, এ পতাকাটা তোমাদের। তোমরাই এই পতাকার সম্মান টিকিয়ে রাখবে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি ছিলাম ১ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার। ১৯৭১ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। এর আগে মেজর জিয়াউর রহমান (এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত) এই দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালের মার্চে আমি ছিলাম চট্টগ্রামে ইপিআরের সেক্টর অ্যাডজুট্যান্ট। সে সময় আমার অধীনে ১৮০০ ইপিআর সেনা ছিল, যার মধ্যে প্রায় ১৩০০ বাঙালি। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যে দিকে এগোচ্ছিল সে অবস্থায় মার্চের প্রথম দিক থেকেই মনে মনে আমাদের একটা প্রস্তুতি ছিল। ৩ মার্চ চট্টগ্রামের ওয়্যারলেস কলেজের সামনে দিয়ে একটি বিক্ষোভ মিছিল আসছিল। মিছিলে অবাঙালিরা ও সাদা পোশাকে অবাঙালি সেনারা আক্রমণ চালায়। রাইফেল, রাম-দা, বল্লম, ছুরি নিয়ে এরা সেই মিছিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এতে প্রায় শতাধিক মানুষ নিহত হয়। সেই নিহতদের গায়ে আর্মিদের ব্যবহূত বুলেট পাওয়া গিয়েছিল। কোনো সেনা এভাবে বাঙালিদের হত্যা করতে পারে না, যদি সরকারের সর্বোচ্চ মহলের নির্দেশ না থাকে। এ ঘটনার পরই আমি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে থাকি। যদি একদিন যুদ্ধ করতেই হয়, ভেতরে ভেতরে তারই প্রস্তুতি নিতে থাকি। বিশ্বস্ত কয়েকজন বাঙালি সেনার সঙ্গে আলোচনা করি। আর জনগণকে সঙ্গে না রাখলে এ যুদ্ধ চালানো যাবে না। এ সময়ের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ জহুর আহমেদ চৌধুরী, এম এ হান্নান, জাফর সাহেব, কায়সার সাহেব—এঁদের সঙ্গে যোগযোগ ছিল। যদি চট্টগ্রাম শহর দখলে রাখতে হয়, তবে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সহায়তা খুব জরুরি। কীভাবে সীমান্তে পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাদের নিরস্ত্র করা হবে, কীভাবে কোয়ার্টার গার্ডের দখল নেওয়া হবে—এসব কিছুরই পরিকল্পনা করছিলাম। মার্চের ১৪-১৫ তারিখের দিকে মেজর জিয়াউর রহমানের সঙ্গেও কথা বলি আমার পরিকল্পনা নিয়ে। তিনি তখন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। আমাদের পরিকল্পনা ছিল—শহর ও সীমান্ত দখলে নেওয়া। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট যদি ক্যান্টনমেন্টের দখল নিতে পারে তাহলে পুরো চট্টগ্রাম শহর আমাদের দখলে চলে আসবে। জিয়াউর রহমানের সঙ্গে এসব নিয়ে আলোচনা করি। ১৭ মার্চ অলি আহমদ, শমসের মবিন চৌধুরী, লে. হারুণের সঙ্গেও গোপন বৈঠক হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ান আলম সাহেবের বাসায়।
এ সময় চট্টগ্রাম বন্দরে ‘এম ভি সোয়াত’ জাহাজে অস্ত্রের একটা চালান এসেছিল। কিন্তু বন্দর-শ্রমিকদের অসহযোগে এ অস্ত্র খালাস করা যাচ্ছিল না। এ সময় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রধান ছিলেন একজন বাঙালি ব্রিগেডিয়ার। তাঁকে সরিয়ে সেখানে অবাঙালি ব্রিগেডিয়ার আনসারীকে আনা হয়। তিনি এসে বলেন, যেকোনো মূল্যে এটা খালাস করা হবে। এ সময় আনসারীর নির্দেশে সেনারা প্রচুর শ্রমিক ও বাঙালিদের হত্যা করে। আমার পরিকল্পনা ছিল, পাকিস্তানি সেনা আক্রমণ করার আগেই আমরা আক্রমণ চালাব। আর বন্দরে এ ঘটনার পর আমার ধারণা হয়েছিল ওরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আক্রমণ করবে। আমিও ২৪ মার্চ সন্ধ্যায় হালিশহরে গোপন আস্তানায় বার্তা পাঠিয়ে কিছুক্ষণ পর সেখানে পৌঁছাই। সীমান্তেও সেনাদের সংকেত পাঠাই নিয়ন্ত্রণ নেবার জন্য। এর কিছুক্ষণ পর সেখানে জিয়াউর রহমান এসে পৌঁছান। কিন্তু সেদিন জিয়াউর রহমান এসে বলেন, এখনই আক্রমণ শুরু করা ঠিক হবে না। যেহেতু ঢাকায় আলোচনা চলছে এবং আলোচনা ফলপ্রসূ না হলে আমরা বিদ্রোহ করব; আলোচনা শেষ হোক। তখন আমি খুব জটিল সময়ে পড়েছিলাম। এদিকে সীমান্তে নির্দেশ চলে গেছে। সেনারা অবাঙালি সেনাদের বন্দী করেছে। এখন যদি খবর চলে আসে তবে আমার সঙ্গে সঙ্গে কোর্ট মার্শাল হবে। যাহোক, পরদিন যখন রাত সোয়া আটটার দিকে আওয়ামী লীগ নেতা জাফর সাহেব আর কায়সার সাহেব এসে বললেন, ঢাকায় আলোচনা ভেস্তে গেছে, ‘নাউ ইট ইজ ইয়োর টার্ন।’ সঙ্গে সঙ্গে গোপন আস্তানায় খবর দিলাম যে, পূর্বের নির্দেশ পালন করা হোক। আমি তখন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। হালিশহরে ক্যাপ্টেন হায়াতের নেতৃত্বে তখনও এক প্লাটুন সেনা ছিল। আমি দ্রুত ওই প্লাটুনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অবাঙালি সেনাদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিই। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের নিয়ন্ত্রণও চলে আসে। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যে চট্টগ্রাম শহর আমাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। যদিও পরে আমাদের শহর ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল।
চট্টগ্রাম মুক্ত হয়েছিল ১৭ ডিসেম্বর। ভাটিয়ারি-ফৌজদারহাট এলাকায় পাকিস্তানিরা শক্ত প্রতিরক্ষা অবস্থান নিয়েছিল। আমরাও শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলি। এ ছাড়া ওদের ঘাঁটিতে পেছন দিক থেকে আক্রমণ চালানোর জন্য আমি লে. বিজয় সিংয়ের নেতৃত্বে দুই ব্যাটালিয়ন সেনা পাঠাই। আর পাকিস্তানি বাহিনীর চোখ ফাঁকি দেওয়ার জন্য সাগরের দিকে একটি দল পাঠাই। এ সময় দু-পক্ষেই গোলাবর্ষণ চলছিল। ধীরে ধীরে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিল। এ সময় পাকিস্তানি বাহিনীর দিক থেকে একটি সাদা পতাকা উঠল যুদ্ধ-বিরতির প্রস্তাব দিয়ে। ততক্ষণে দু-পক্ষই জেনে গেছি, ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনী স্যারেন্ডার করেছে। তবে আমি সেদিনই আত্মসমর্পণ গ্রহণ করিনি। পরদিন সকাল সাড়ে নয়টার দিকে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজ মাঠে আত্মসমর্পন পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। আমি সেই জাতীয় পতাকাটি একটি কিশোরকে দিয়েছিলাম উত্তোলনের জন্য। আমার মনে হয়েছিল, আমরা দেশ স্বাধীন করলাম। আমাদের পরবর্তীর প্রজন্মের হাতে সে দেশ গড়ার দায়িত্বই যেন সঁপেছিলাম সেদিন। আসলে আমি বলতে চেয়েছিলাম, এ পতাকাটা তোমাদের। তোমরাই এই পতাকার সম্মান টিকিয়ে রাখবে।
অনুলিখন : আসিফুর রহমান সাগর