খুনিদের কখনোই সনাক্ত
করা সম্ভব হবে না!
প্রকাশ : ২৫ মার্চ ২০১৩, ২২:৪৩
সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের পর প্রায় সাড়ে ১৩ মাস অতিবাহিত হয়েছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত প্রকৃত খুনিরা গ্রেফতার হয়নি। এমনকি কে খুন করেছে তাও সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। শুধু গলাবাজি আর আশার বাণী শুনিয়েছেন তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ এবং প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাগণ। সাগর-রুনির খুনিদের কখনোই সনাক্ত কিংবা গ্রেফতার করা সম্ভব হবে না বলে মন্তব্য করেছেন এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা।
র্যাব নিশ্চিত ছিল খুনিদের সনাক্ত কিংবা তাদের সম্পর্কে তথ্য দিতে পারবে সাগর-রুনির ফ্ল্যাটের দারোয়ান হুমায়ুন কবীর ওরফে এনামুল। অনেক চেষ্টা করে দারোয়ান হুমায়ুন কবিরকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় র্যাব। তাকে রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের পরেও খুনিদের সম্পর্কে কোন তথ্য মেলেনি। সাগর-রুনির ডিএনএ যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে পরীক্ষা করে দুইজনের ডিএনএ থাকার আলামত পেয়েছে। এটি কী খুনির ডিএনএ আলামত না অন্য কারোর ডিএনএ আলামত এ নিয়ে র্যাব নিশ্চিত হতে পারেনি।
হত্যাকাণ্ডের সংবাদ পেয়ে প্রথমে মেহেরুন রুনির মা ও ভাই ঘটনাস্থলে গিয়েছিল। এরপর হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে প্রায় সব গণমাধ্যমের সাংবাদিক, এই সাংবাদিক দম্পতির বন্ধু-বান্ধবসহ নানা পেশার মানুষ তাদের বাসায় গিয়েছিল। উপস্থিত ছিল পুলিশ, র্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্য। এ অবস্থার মধ্যে সঠিকভাবে আলামত সংগ্রহে থানা পুলিশ ও সিআইডির বিশেষজ্ঞ দল চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।
গত ১৬ বছরে এই সাংবাদিক দম্পতিসহ সারাদেশে ১৭ সাংবাদিক খুন হয়েছে। সম্প্রতি একজন সাংবাদিক দম্পতি হত্যাকাণ্ডের বিচারের রায় হয়েছে। বাকি ১৫ সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি। দুর্বল তদন্তের কারণে দুইটি হত্যা মামলার সব আসামি খালাস পেয়ে গেছে। সম্প্রতি সাগর-রুনিসহ সব সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নসহ সাংবাদিক সমাজের আন্দোলনের মুখে তথ্য মন্ত্রণালয় একটি মনিটরিং সেল গঠনের ঘোষণা দেয়। ঘোষণা পর্যন্তই শেষ। এখনো গঠন করা হয়নি মনিটরিং সেল।
সাংবাদিক খুন হলে এদেশে বিচার পাওয়ার নজির তেমন একটা নেই। নিহত সাংবাদিকদের বিচারের দাবিতে সহকর্মীরা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা বরাবরই দিয়ে আসছে। প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে এর শেষ কোথায়? না-কি রাজনৈতিক ফায়দা লুটা পর্যন্তই আন্দোলন সীমাবদ্ধ থাকবে? নিহত সাংবাদিক পরিবারের সদস্যরা বলেছেন, দুর্বল তদন্তকাজ ও সাক্ষী প্রমাণ তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ আদালতে উপস্থাপন করতে রহস্যজনক কারণে ব্যর্থ হন। এ কারণে সাংবাদিক হত্যা মামলার আসামিরা নিরপরাধ হিসাবে ছাড়া পেয়ে যায়।
সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাংবাদিকরা আন্দোলন করে আসছেন। নিহত অন্য সাংবাদিকদের দাবি, সাগর-রুনির পাশাপাশি বাকি ১৫ জন সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি নিয়ে যেন একসাথে কথা বলা হয়।
গত বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি ভোরে সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় খুন হন। এ হত্যা মামলার প্রথম তদন্ত করে শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ। পরে
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ হত্যা মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে। প্রায় ২ মাসের অধিক তদন্ত করে খুনি সনাক্ত কিংবা হত্যা রহস্য উদঘাটন করতে পারে নি সংস্থাটি। হাইকোর্টের নির্দেশে সাগর রুনি হত্যা মামলার তদন্তভার র্যাবের কাছে ন্যস্ত করা হয়। গত বছর এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে র্যাব সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে। হত্যাকাণ্ডের দিন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বর্তমান টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেফতার করা হবে বলে গণমাধ্যম কর্মীদের জানান। পরবর্তীতে বিভিন্ন সভায় শীর্ষ কর্মকর্তারা ১০ দিনে কিংবা দ্রুত সাগর রুনি খুনিদের গ্রেফতার করা হবে বলে আশ্বাস দেন।
গতকাল র্যাবের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রকৃত খুনি কেউ গ্রেফতার হয়নি। একজন কর্মকর্তা বলেছেন, রুনির মৃত্যুর আগে তার মোবাইল ফোনে সর্বশেষ ৬ মিনিটের অধিক সময় কথা বলেছিলেন। ১১ ফেব্রুয়ারি অর্থাত্ ঘটনার দিন সকাল ৭টার পরেই রুনির মোবাইল ফোনে কথা হয়। কলটি কঠোরভাবে মনিটরিং ও যাচাই বাছাই করলে হয়তো হত্যাকাণ্ডের সপক্ষে কোন তথ্য মিলতে পারে। তবে কললিস্ট অনুযায়ী রুনির মোবাইল থেকে যে মোবাইল ফোনে কথা বলেছে। সেখানে তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ দুর্বলতা প্রকাশ করেছেন। সর্বশেষ ফোনে কে কথা বলেছেন এবং কি সব কথা ৬ মিনিট অধিক সময় ধরে হয়েছে তা নিয়ে তদন্ত হয়নি। র্যাবের একজন কর্মকর্তা বলেন, এ বিষয়টি তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও বর্তমান পরিবেশের কারণে তদন্ত করতে পারছি না। সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে এ পর্যন্ত আটজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতরা হচ্ছে, রুনির বন্ধু তানভীর রহমান, সাগর রুনির ফ্ল্যাটের দারোয়ান হুমায়ূন কবীর, পলাশ রুদ্র পাল ও মহাখালী বক্ষব্যাধি হাসপাতালের ডা. নিতাই হত্যা মামলার ৫ আসামিকে সাগর রুনি হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। এ ৫ জন হচ্ছে পেশাদার ডাকাত কামরুল হাসান অরুন, রফিক, বকুল মিন্টু ও সাঈদ। তাদেরকে র্যাব দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করে ও বিভিন্নভাবে অনুসন্ধান চালিয়ে সাগর রুনি হত্যাকাণ্ডে কোন তথ্য পায় নি।
একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ নয়, আমেরিকা, লন্ডনসহ উন্নত দেশে কোন কোন চাঞ্চল্যকর কিংবা ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডে খুনিদের সনাক্ত করতে বছরের পর বছর অতিবাহিত হয়। মন্ত্রী ও শীর্ষ কর্মকর্তা খুনিদের ২৪ ঘণ্টা ও ১০ দিনে গ্রেফতার কিংবা হাতের মুঠোই খুনিরা রয়েছে এ সব দায়িত্ব জ্ঞানহীন কথা না বললে তদন্ত কাজ আরো সাবলীল ভাবে এগুতো। তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের বিষয় তারাই এটা বলবে। গলাবাজি ও বিভ্রান্তিকর কথা বলে সাগর-রুনি হত্যাকান্ডের তদন্ত কাজে সৃষ্টি হয়েছে অনেক প্রতিবন্ধকতা বলে ওই কর্মকর্তা জানান।
র্যাবের মহাপরিচালক মোখলেছুর রহমান সাগর রুনি হত্যাকাণ্ডে খুনিদের গ্রেফতারে আশা প্রকাশ করছেন। তবে তিনি বলেন এটা এতো তাড়াতাড়ি সম্ভব নয়। তবে নিরাপরাধ লোক গ্রেফতারের বাহাবা নেয়া সম্ভব নয়। প্রকৃত খুনিদের গ্রেফতার করা হবে বলে তিনি জানান।