শিক্ষক যে পাঠশালায় ছাত্র

ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়। উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ শিক্ষক তৈরির উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় শিক্ষকদের পাঠশালা। শিক্ষকরাই এখানে ছাত্র। শেখানো হয় ছাত্রদের আরো ভালোভাবে শেখানোর কৌশল। শিক্ষকেরাই শিক্ষার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ও শক্তি। তাঁরা শিক্ষিত ও চরিত্রবান মানুষ গড়েন। আর টিচার্স ট্রেনিং কলেজ হচ্ছে শিক্ষক গড়ার প্রাণকেন্দ্র। ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ বিগত শতবর্ষে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। অধ্যক্ষ দীপক কুমার নাথ বলেন, নতুন প্রজন্মকে শুধু শিক্ষা, জ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন করলেই চলবে না, সেই সঙ্গে তাঁদের নৈতিক মূল্যবোধ, সততা, নিষ্ঠা, জনগণের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। উপাধ্যক্ষ সৈয়দ সাদিক জাহিদুল ইসলাম বলেন, শিক্ষকদের আর্থিক সংকট নিরসন ও সামাজিক মর্যাদা বাড়াতে নতুন বেতন কাঠামো তৈরি করতে হবে। টিচারদের ট্রেনিংয়ের পাশাপাশি এসব বিষয়গুলো নিয়ে সরকারকে নতুন করে ভাবতে হবে। বিএড অনার্স ইন এডুকেশন, বিএড কোর্স ইন ওয়ান ইয়ার্স ও এমএড কোর্স ইন ওয়ান ইয়ার্স তিনটি কোর্স নিয়ে চলছে কলেজ কার্যক্রম। মূলত শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য তৈরি হলেও ১৯৯৫-৯৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে চালু হয়েছে শিক্ষায় স্নাতক ডিগ্রি। কলেজের অধ্যক্ষ দীপক কুমার নাগ বলেন, ‘আমাদের ছাত্র-ছাত্রী প্রাথমিক-মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং থানা শিক্ষা কর্মকর্তা। পাঠদানের জন্য রয়েছেন ৭০ জন শিক্ষক। তবে বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষক সংকট রয়েছে।’ প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই মূল ভবনের দোতলায় কলেজ গ্রন্থাগার। পাঠ্যবই, জার্নাল, ম্যাগাজিনসহ গ্রন্থাগারে বইয়ের সংখ্যা ৩০ হাজারের বেশি। ক্যাম্পাসে রয়েছে কম্পিউটার ল্যাব, মিলনায়তন, গবেষণাকেন্দ্র, খেলার মাঠ, মসজিদ ও তিনটি হোস্টেল। ছাত্র-ছাত্রীদের অর্ধেকেরও বেশি পাচ্ছে আবাসিক সুবিধা। এখানকার ছাত্র আবু বকর আলিফ বলেন, ‘হলে তেমন কোনো সমস্যা নেই।’ ১৯০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে প্রতিবছর ভর্তি করা হয় প্রায় এক হাজার ২০০ ছাত্র-ছাত্রী। কলেজের অধ্যক্ষ দীপক কুমার নাগ বলেন, ‘শ্রেণিকক্ষে শিক্ষণ-শিখন কার্যক্রম আরো প্রাণবন্ত করতে ক্যাম্পাসে চালু করা হয়েছে ডিজিটাল কন্টেন্ট কোর্স। এই শিক্ষণ পদ্ধতিতে প্রজেক্টর ও ভিডিও স্লাাইডের মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে পাঠ্য বিষয় আরো জীবন্ত ও সহজবোধ্যভাবে তুলে ধরা যাবে।’ সামাজিক-সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য রয়েছে বেশ কয়েকটি সংগঠন। এর মধ্যে রোভার স্কাউট, ডিবেটিং সোসাইটি, সাপ্তাহিক পাঠচক্র, লিও ক্লাব এর নাম উল্লেখযোগ্য। মিলনায়তনে প্রায়ই মঞ্চস্থ হয় নাটক। বিতর্ক, নাচ, গানসহ সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় নিয়মিত। চতুর্থ বর্ষের আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সবাই মিলে ম্যাগাজিন প্রকাশ, দেয়ালিকা তৈরি, বর্ষবরণ, র্যাগ ডে, রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী পালন করি।’ ক্লাসের ফাঁকে ক্যাম্পাসে নানা প্রান্তে জমে আড্ডা। প্রথম বর্ষের আল মাহমুদ পলাশ বললেন, ‘ছোট ক্যাম্পাস বলে আমরা সবাই সবাইকে চিনি। সবাই আমরা বন্ধু। সুমনা চৌধুরী মজা করলেন, ‘আড্ডা শুধুই হাসি-গল্পে সীমাবদ্ধ থাকলেও ধীরে ধীরে তা হয়ে উঠছে ক্যারিয়ার নিয়ে গোলটেবিল বৈঠক।’ তবে ছাত্র-ছাত্রীদের অভিযোগ আছে এখানে। চতুর্থ বর্ষের আল ইমরান বললেন, ‘শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন থেকেই এখানে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের পড়ানোর জন্য নেই যথেষ্ট শিক্ষক।’ দ্বিতীয় বর্ষের তুলির অভিযোগ, ‘পড়ালেখা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রমসহ আমাদের কলেজের মান ভালো। কিন্তু পত্র-পত্রিকা বা কোথাও প্রচার নেই।’ এসব সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিলেন অধ্যক্ষ দীপক কুমার নাগ। তািন বলেন, ‘ছাত্র-ছাত্রীদের দাবি-দাওয়া সম্পর্কে আমরা সচেতন। সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি।’ একটু পিছনের ইতিহাস জানার চেষ্টা। ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়। উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ শিক্ষক তৈরির উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৬ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত কলেজটি আরমানিটোলাতেই ছিল। পরবর্তীকালে এটি ধানমন্ডিতে স্থানান্তর করা হয়। কলেজের প্রথম প্রিন্সিপাল নিযুক্ত হন ইভান ই.বিস। ১৯০৯-১৯১০ শিক্ষাবর্ষে সর্বমোট ১২ জন প্রশিক্ষণার্থী নিয়ে কলেজের বি. এড. কোর্স চালু হয়। ১৯০৬ খ্রীস্টাব্দে অবিভক্ত বাংলায় এনট্রান্স পরীক্ষায় ভয়াবহ ফলাফল বিপর্যয় দেখা দিলে এ অঞ্চলে শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। — ছবি: মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর