স্বাধীনতা দিবসে রাজধানী উত্সবের নগরী
প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০১৩, ২২:৩৪
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিময় গণসঙ্গীত, নাচ, চলচ্চিত্র, নাটক, চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি আর যুদ্ধদিনের স্মৃতিচারণে গতকাল মঙ্গলবার উত্সবের নগরী হয়ে উঠেছিল রাজধানী ঢাকা। স্বাধীনতার ৪২তম পূর্তি, স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদযাপন উপলক্ষে মঞ্চে মঞ্চে ছিল বর্ণিল আয়োজন। আর এর মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হয় ৩০ লাখ শহীদকে। সব আয়োজনে স্বাধীনতার চেতনায় ঋদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবি উঠে আসে।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, জাতীয় জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, শিল্পকলা একাডেমী, বাংলা একাডেমী, শিশু একাডেমী, ছায়ানটসহ নানা সাংস্কৃতিক সংগঠন দিনভর নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ‘রং তুলিতে মুক্তিযুদ্ধ’ শিরোনামে চিত্রাঙ্কন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে চ্যানেল আই। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রমনা পার্ক, চারুকলা, টিএসসি, রবীন্দ্র সরোবরসহ নগরজুড়ে বসেছিল স্বাধীনতা উত্সবে প্রাণের মেলা। শাহবাগের গণজাগরণ চত্বরেও ছিল বর্ণাঢ্য আয়োজন। এছাড়া, মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আনন্দে মাতোয়ারা ছিলেন রাজধানীর মানুষ। সরকারি ছুটি হওয়ায় মঙ্গলবার সকাল থেকেই নগরীর বিনোদন কেন্দ্রগুলো জমে উঠে নানা বয়সী মানুষের পদচারণায়। পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরে বেড়াতে বেরিয়েছিল বহু পরিবার। সকাল থেকে কেন্দ্রীয় শিশুপার্ক, শ্যামলী শিশুমেলা, মিরপুর চিড়িয়াখানা, বোটানিক্যাল গার্ডেন, সংসদ ভবন, চন্দ্রিমা উদ্যান, বলধা গার্ডেন, মিরপুর বেড়ি বাঁধ, পুরান ঢাকার নবাবপুর, বড় কাটরা, ছোট কাটরা, ধানমন্ডি লেক, নগরীর প্রায় সব বিনোদন কেন্দ্রে ছিল উপচে পড়া ভীড়। আশুলিয়ার ফ্যান্টাসি কিংডম ও নন্দন পার্কেও ছিল দর্শনার্থীদের ভিড়ে ঠাসা। শিশুদের নিয়ে ছুটির দিন আনন্দে কাটাতে অনেক বাবা-মা ছুটে গেছেন চিড়িয়াখানা আর শিশু পার্কে।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের স্বাধীনতা উত্সবের সমাপনী দিনে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নানা বয়সী মানুষের ঢল নামে। মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণাদায়ী গান, নাচ, আবৃত্তি, পথনাটক মঞ্চস্থ করে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন। ফাঁসিতে ঝুলিয়ে সকল যুদ্ধাপরাধীর বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার তাগিদ দেয়া হয় এই অনুষ্ঠানে। ধানমন্ডি রবীন্দ্র সরোবরেও অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সপ্তদশ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সাতদিনের অনুষ্ঠানের পঞ্চম দিন গতকাল মঙ্গলবার সকালে জাদুঘর প্রাঙ্গণে ‘শিশু-কিশোর আনন্দ’ শীর্ষক বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়। এতে অংশ নেয় ইউসেফ স্কুল, খেলাঘর, ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি গার্লস স্কুল ও স্পন্দন। যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারের দাবি ভেসে উঠে শিশুদের পরিবেশনার মধ্য দিয়ে। সন্ধ্যায় মানিকগঞ্জের লোকনাট্য গোষ্ঠী পরিবেশন করে যাত্রাপালা ‘বর্গি এলো দেশে’।
উত্সবের অংশ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে ‘এক ছাদের নিচে মুক্তিযুদ্ধের বই’ স্লোগান নিয়ে চলা বইমেলাতেও ছিল উত্সুক পাঠকদের ভিড়। দিনভর জাদুঘর গ্যালারি পরিদর্শন করেছেন রেকর্ডসংখ্যক দর্শনার্থী। আগারগাঁওয়ে নির্মীয়মাণ জাদুঘর প্রাঙ্গণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেয় বধ্যভূমি সন্তানদল, ইউসেপ স্কুল ও মনিপুর সঙ্গীতাঙ্গন।
মিরপুর জল্লাদখানা বধ্যভূমির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ছিল গতকাল। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও স্বাধীনতা দিবসের অংশ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের উদ্দীপনামূলক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয় সেখানে।
ছায়ানট শিল্পীদের সম্মেলক গান ‘আজি রক্তনিশি ভোরে’ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাদের অনুষ্ঠানমালা। অনুষ্ঠানে আরও তিনটি সম্মেলক গান পরিবেশন করেন শিল্পীরা।
কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলার নিজস্ব মিলনায়তনে ছিল আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রধান অতিথি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল (অব.) এম. মাসুদুর রহমান বীরপ্রতীক। বক্তব্য রাখেন দিল মনোয়ারা মনু, আলপনা চৌধুরী এবং শিশু-বক্তা নাফিজা। সভাপতিত্ব করেন খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেয় সুর বিতান, নৃত্য বিতান ও কথা বিতান।
এদিকে, তেজগাঁয়ের চ্যানেল আই ভবনে ছিল ‘রং তুলিতে মুক্তিযুদ্ধ’ শিরোনামে চিত্রাঙ্কন অনুষ্ঠান। যেখানে অংশ নেন দেশবরেণ্য প্রায় অর্ধশতাধিক চিত্রশিল্পী। ছোট ছোট শিশুরাও রং তুলি নিয়ে মেতে উঠেছিল এই বর্ণাঢ্য আয়োজনে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক ও তার স্ত্রী আনোয়ারা সৈয়দ হক। রংতুলিতে মুক্তিযুদ্ধ তুলে ধরেন হাশেম খান, সৈয়দ ইকবাল, সমরজিত্ রায় চৌধুরী, রনজিত্ দাশ, নাসিম আহমেদ নাদভী, নাইমা হক, শহীদ কবির, মনিরুজ্জামান, আবদুশ শাকুর, বীরেন সোম, জাহিদ মুস্তাফা, আবদুল মান্নান, রেজাউল করিম, শেখ আফজাল, মাহজাহান আহমেদ, সোহানা শাহরীন, আলপ্তগীন তুষার, ফারজানা আহমেদ, সৈয়দ জাহিদ ইকবাল, অনুপম চন্দ্র মজুমদার, সব্যসাচী হাজরা, শেখ জহুর, মোহাম্মদ জহির উদ্দিন, হামিদুজ্জামান খান, গোলাম রব্বানী শামীম, রেজাউন নবী, রাফি হক প্রমুখ। তাদের চিত্রকর্মে উঠে এসেছে একাত্তরের বিভিন্ন স্মৃতি, জাতীয় পতাকা ও প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ। আবৃত্তি করেন সৈয়দ হাসান ইমাম, আসাদ চৌধুরী, আসাদুজ্জামান নূর ও জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়।
বাংলা একাডেমীর রবীন্দ্রচত্বরে ‘স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় : প্রেক্ষাপট-প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক একক বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল মান্নান। স্বাগত বক্তব্য দেন একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমীর সভাপতি ইমেরিটাস প্রফেসর আনিসুজ্জামান। অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, যে অন্ধকার শক্তি পবিত্র ধর্মের দোহাই দিয়ে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, আজ ঠিক একই কৌশলে তারা ধর্মের নামে দেশে নৈরাজ্য ও অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টায় লিপ্ত।
শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে ছিল আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আলোচনা পর্ব শেষে অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে-আওয়ামী শিল্পী গোষ্ঠী, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদ, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর রেপার্টরি সঙ্গীত দল। দলীয় নৃত্য পরিবেশন করেন শিল্পকলা একাডেমীর রেপার্টরি নৃত্য দল। আবৃত্তি পরিবেশন করেন কাজী আরিফ, ডালিয়া আহমেদ, আহ্কামউল্লাহ ও ঝর্ণা সরকার। সবশেষে পরিবেশিত হয় নৃত্যনাট্য-যতদিন রবে পদ্মা মেঘনা।
এদিকে, শিশু একাডেমী বইমেলার শহীদ মতিউর মঞ্চে মেলার সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন সংসদ সদস্য বেবী মওদুদ এবং কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন। সভাপতিত্ব করেন একাডেমীর চেয়ারম্যান শেখ আবদুল আহাদ।