খালেদার হূদয়ে আছে ‘পেয়ারে পাকিস্তান’

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন না। তার হূদয়ে রয়েছে ‘পেয়ারে পাকিস্তান’। তাই তাকে বলবো, দেশের জনগণকে আর কষ্ট ও যন্ত্রণা না দিয়ে আপনার পেয়ারে পাকিস্তানে চলে যান। গতকাল বুধবার বিকালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। খালেদা জিয়া গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া দেশের গণতন্ত্র হত্যার জন্য সেনাবাহিনীকে উস্কে দিচ্ছেন। তিনি বুঝতে পেরেছেন যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষাকারী হিসেবে বিএনপিকে দেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী জনগণ ভোট দেবে না। তাই গণতন্ত্রকে হত্যার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। উনার স্বামী সেনাবাহিনীকে নিয়ে অনেক খেলা খেলেছেন। সেনাবাহিনীর কাঁধে চড়ে ক্ষমতায় গিয়ে জিয়াউর রহমান অসংখ্য সেনা অফিসার ও সৈনিককে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করেন। সেই স্বপ্নই তিনি (খালেদা জিয়া) বার বার দেখছেন। উনাকে কে পরামর্শ দিচ্ছেন জানি না, তবে তাকে মনে রাখতে হবে এটা ১৯৭৫ সাল নয়, ২০১৩ সাল। পৃথিবী এবং বিশ্বের মানুষ অনেক বদলে গেছে। দেশের মানুষও আজ অনেক সচেতন ও গণতন্ত্রকামী। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র নিয়ে তারা কাউকে ছিনিমিনি খেলতে দেবে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের জানমাল রক্ষায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে সরকারের যা করার তাই করবে। এ সময় তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশের কোন কোন এলাকায় বিএনপি-জামায়াতের দুস্কৃতকারীরা সহিংসতা চালাচ্ছে, যানবাহন ও ট্রেনে আগুন লাগিয়ে মানুষ হত্যা করছে, এসব সহিংসতা কারা চালাচ্ছে তাদের নাম-ঠিকানা খুঁজে বের করুন। জনগণের জানমালের রক্ষায় পুলিশ বাহিনীর পাশাপাশি দেশের সচেতন মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে। মানুষের জীবন নিয়ে আর যাতে কেউ ছিনিমিনি খেলতে না পারে সেজন্য ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। যাতে রাজাকার-আলবদর ও মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তিরা জনগণের জানমালের কোনো ক্ষতি করতে না পারে সেজন্য তিনি জনগণের পাশে থেকে তাদের নিরাপত্তা রক্ষায় প্রতিটি স্থানে সজাগ ও সতর্ক থাকার জন্য দলীয় নেতাকর্মীদেরও নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়া বলছেন, দেশে নাকি গণহত্যা হচ্ছে। কিন্তু গণহত্যা তো আপনারা করেছিলেন। ২০০১ সালে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে ক্ষমতায় এসে পাঁচটি বছর সারাদেশে গণহত্যা চালিয়েছেন। এ সময় অপারেশন ক্লিনহার্টের নামে আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মীসহ অনেক সংখ্যালঘুদেরও হত্যা করা হয়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টে আইভি রহমানসহ ২৪ জনকে হত্যা করা হয়। সারের জন্য গুলি করে আপনি মানুষ মেরেছেন। বিদ্যুত্ দাবি করায় মানুষ মেরেছেন। এখনো তিনি হত্যা চালিয়ে যাচ্ছেন। আসলে গণহত্যাকারীতো আপনি। গণহত্যার জন্য দেশের মাটিতে যদি বিচার হয়, তবে সেটা খালেদা জিয়ারই হবে। প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলীয় নেত্রীর উদ্দেশ্যে বলেন, আপনি নিজেকে মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী দাবি করেন। আপনি ও আপনার দল বলেন জিয়াউর রহমান নাকি ২৭ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন! যদি তাই হয় তবে মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী হয়ে যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় পরাজিত শক্তি জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে ২৭ মার্চ হরতাল ডাকলেন কীভাবে? দেশের জনগণের কাছে এর জবাব আপনাকে দিতে হবে। আপনি কী আপনার স্বামীর স্বাধীনতার ঘোষণায় বিশ্বাস করেন, নাকি স্বাধীনতা বিরোধী ও যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় বিশ্বাস করেন? প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনার রক্তপিপাসু চেহারা জাতির সামনে স্পষ্ট হয়ে গেছে। মানুষের রক্ত না দেখলে আপনার ভালো লাগে না। তবে যারা স্বাধীনতা দিবসে বিশ্বাস করে না এবং স্বাধীনতা বিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে চান তাদের ঠাঁই এদেশে হবে না। দেশকে অন্ধকারে ঠেলে না দেয়ার জন্য তিনি বিরোধী দলীয় নেত্রীর প্রতি আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, পালানোর ইতিহাস আমাদের নেই। পালানোর বহু ইতিহাস খালেদা জিয়ার রয়েছে। অবশ্য তার জন্ম বাংলাদেশে নয়, ভারতে। তাই দেশের মাটির প্রতি তার কোন টান নেই। ১৯৮৬ সালে তিনি পালিয়েছিলেন। বিডিআর বিদ্রোহের দিন তিনি পালিয়ে গেলেন। ওয়ান ইলেভেনে গাট্টি-গোট্টা বেঁধেছিলেন পালানোর জন্য। উনার পছন্দের ব্যক্তি মঈনুদ্দিন-ফখরুদ্দিনরা তাদের পরিবারের সদস্যদের এক এক করে দেশ থেকে বের করে দিয়েছিল। অথচ সে সময় আমি জোর করে দেশে ফিরে এসেছিলাম। আগে সেপাই-জনতার বিপ্লবের কথা বলে উনি পালিয়ে আত্মগোপনে গিয়েছিলেন। কিন্তু তার ডাকে সেপাহি বা জনতা কেউ-ই সাড়া দেয়নি। পরে তাকে হোটেল পূর্বাণী থেকে দরজা ভেঙ্গে আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় বের করা হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিডিআরের খুনীদের বাঁচানোর জন্য তত্পর বিএনপি-জামায়াতের লোকেরা। তাহলে এ ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত? প্রধানমন্ত্রী বলেন, পালানোর ইতিহাস আমাদের নেই। বিরোধী নেত্রীকে উদ্দেশ্য করে শেখ হাসিনা বলেন, ’৮৬ সালে পালিয়েছিলেন কেন? ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে পালিয়ে পূর্বাণী হোটেলে গেলেন। সঙ্গে ছিল কেএম ওবায়দুর রহমান। বিডিআর বিদ্রোহের সময় পালালেন; সাত দিন কোনো খবর নেই। এক মাস পর ক্যান্টনমেন্টের বাসায় ফিরলেন। ওয়ান ইলেভেনে গাট্টি-গোট্টা বেঁধেছিলেন পালানোর জন্য। অথচ আমি ওই সময় ওয়ারেন্ট মাথায় নিয়ে দেশে এসেছিলাম। আমি প্রতিবাদ না করলে উনি তখনো দেশের বাইরে চলে যেতেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংবিধান লংঘন করে ১৯৭৬ সালে জিয়া নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেছিলেন। জিয়ার আমলে দেশের সামরিক বাহিনীতে ১৯টি ক্যু হয়েছে। জিয়া নিজেও একটি ক্যুতে নিহত হয়েছেন। ১৯৭৭ সালে তিনি বিমান বাহিনীর ৬৬৫ জনকে হত্যা করেছেন। ১৯৮১ সালেও ১২ জনের ফাঁসি দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার পর জাতির পিতা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেন। অনেকে সাজাপ্রাপ্ত হন, কারাগারে আটকও ছিলেন অনেকে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জিয়াউর রহমান অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করে দেন। আটক যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দেয়াসহ তাদের রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসন করেন। এ কারণে তার স্ত্রী একাত্তরের পরাজিত শক্তি যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর চেষ্টা করবে এটাই স্বাভাবিক। খালেদা জিয়ার জন্মদিন পালন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৫ আগস্ট তিনি জন্মদিন পালন করেন। তার স্কুলের সার্টিফিটেকে জন্মদিন আছে ৫ সেপ্টেম্বর। পাসপোর্টে আছে আরেক তারিখ। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভায় আরো বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, প্রেসিডিয়াম সদস্য মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, প্রেসিডিয়াম সদস্য আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, সাহারা খাতুন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর আব্দুল মান্নান, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম, আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল মতিন খসরু, আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, কামাল আহমেদ মজুমদার এমপি, দলের কেন্দ্রীয় নেতা একেএম এনামুল হক শামীম প্রমুখ। সভা পরিচালনা করেন প্রচার সম্পাদক হাছান মাহমুদ। কবিতা আবৃতি করেন দলের সাংস্কৃতিক সম্পাদক আসাদুজ্জামান নূর। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আবার হুমকির মুখে। এজন্য আরেকবার ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া সামরিক বাহিনীকে উস্কে দিলেন এবং সংবিধান ও রাজনৈতিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার আহ্বান জানালেন। তিনি চান (খালেদা) বাংলাদেশের গণতন্ত্র ব্যাহত হোক। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া ঘোষিত যুদ্ধে আমাদের বিজয়ী হতে হবে। আজকে খালেদা জিয়া স্বাধীনতা নিয়ে ধৃষ্টতা দেখাবে। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে বাংলার সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করতে চায়। সামনে সময়টা অনেক কষ্টের। এ অবস্থা থেকে দেশকে উত্তরণ করতে পারবে একমাত্র বঙ্গবন্ধুর উত্তরসূরিরা। সৈয়দ আশরাফ বলেন, আওয়ামী লীগ আইনের শাসনে বিশ্বাস করে। নিরাপত্তা রক্ষা করা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ। আমরা এতে হস্তক্ষেপ করি না, অতিতেও করিনি। কিন্তু এখন সময় এসেছে। আমাদের শুধু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দিকে চেয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। গ্রামেগঞ্জে, ইউনিয়ন, থানা, জেলায় অতন্দ্র প্রহরীর মত পাহারায় থাকতে হবে। আসুন আমরা ঘুরে দাঁড়াই। আওয়ামী লীগ ঘুরে দাঁড়ালে পৃথিবীর কোন শক্তি নেই আওয়ামী লীগকে পরাজিত করতে পারে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, তার নেত্রী বক্তব্য দিলেন। আর ওনি বলছেন, আসলে তার বক্তব্যে তিনি এটা বলেননি, ওটা বলেননি। বললেও মিন করেননি। দুই বারের প্রধানমন্ত্রী যে কথা বলেন আমরা মনে করি তিনি মিন করে বলেন এবং দায়িত্ব নিয়েই বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী হয়ে উনি (খালেদা জিয়া) দুর্নীতির কালো টাকা জরিমানা দিয়ে সাদা করেছেন। তার দুর্নীতিবাজ দুই পুত্র ঘুষ-দুর্নীতি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এফবিআই এসে আদালতে তার পুত্রদের ঘুষ-দুর্নীতির বিষয়ে সাক্ষী দিয়েছে। সিঙ্গাপুরে তার পুত্রের দুর্নীতির অর্থ আমরা দেশে ফেরত এনেছি। বিভিন্ন দেশে পাচার করা অর্থও ফেরত আনা হবে। বিরোধী দলীয় নেত্রী সিঙ্গাপুরে গিয়েও তার পুত্রের দুর্নীতির টাকা রক্ষা করতে পারেননি। প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের সফলতা তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশ আজ প্রতিটি ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে। সারাবিশ্বের কাছে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মডেল। বিএনপি-জামায়াত জোটের মতো আজ সারাদেশে সকল জেলায় একযোগে পাঁচশ’ জায়গায় বোমা ফাটে না, গ্রেনেড হামলা হয় না, অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া ও আহসান উল্লাহ মাস্টারের মতো জনপ্রতিনিধিদের জীবন দিতে হয় না। দেশে কোনো জঙ্গিবাদ নেই।