বিশ্বজয়ী আফ্রিকান সাহিত্যিক

ওকোনকো—পশ্চিম নাইজেরিয়ার ইগবো সমাজের অস্তিত্বসংকটে পড়া এক ব্যক্তি। অনেক দূরের দেশের হলেও বাংলাদেশের সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে বেশ সুপরিচিত নাম। ইগবো সংস্কৃতিতে ঔপনিবেশিকতার করাল আগ্রাসনে নিজেকে হারিয়ে ফেলে যখন ওকোনকো নামের সেই সুঠামদেহী নায়ক আত্মহত্যা করে, তখন এ দেশের মানুষের চোখেও জল এসেছিল। ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’ নামের একটি উপন্যাস বিশ্বের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল আফ্রিকার অজানা গল্পগুলোকে—কীভাবে অস্তিত্বসংকটে পড়া মানুষগুলো হারিয়ে গিয়েছে ঔপনিবেশিকতার সমুদ্রে। তবু নিজের ঐতিহ্য মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ব্রিটিশ শাসকদের অধীনে ২০০ বছর শাসিত হওয়া উপমহাদেশীয় পাঠকদের কাছে এ ছিল নিজেদের অস্তিত্বসংকটের গল্প। আর এই গল্প মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন আফ্রিকার সাহিত্যিক চিনুয়া আচেবে। লেখনীর মাধ্যমে মানুষকে কাঁদিয়েছেন, হাসিয়েছেন, জাগ্রত করেছেন চেতনাকে। চিনুয়া আচেবে বিশ্বের কাছে শুধু একজন জনপ্রিয় সাহিত্যিক নন, বরং ‘আধুনিক আফ্রিকান সাহিত্যের জনক’ হিসেবেই তিনি পরিচিত। বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছেন তাঁর অন্ধকার মহাদেশকে, যেখানে অন্ধকারের নিচে খেলা করে আলো। ১৯৩০ সালের ১৬ নভেম্বর তিনি নাইজেরিয়ার অগিডির অর্ন্তগত ইগবো গ্রামে একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী পরিবারে জন্মেছিলেন। বাবা ওকাফো আচেবে আর মা জ্যানেট অ্যানেনসি। একটা কলোনিয়াল বা সাম্রাজ্যবাদী সমাজে বেড়ে ওঠা তাঁর। আফ্রিকার প্রচলিত ধ্যান-ধারণার শিকড় উপড়ে দিয়ে সেখানে বপন করা হচ্ছিল ব্রিটিশ শিক্ষা-দীক্ষা। খ্রিষ্ট ধর্মকে ছড়িয়ে দিয়ে ইগবোদের জাতিগত ধর্মকে নির্বাসনে পাঠানোর আয়োজন হয়েছিল তখন। সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে আচেবের পরিবারও বিদেশি এই ধর্মকে বেছে নিয়েছিল। পরিবর্তনের এই অসম ঢেউ শুধু ধর্মকেই গ্রাস করেনি, মিশ্র জাতিসত্তার এ দেশে তাদের মায়ের ভাষাকেও নির্বাসিত করে ইংরেজি ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়। আচেবের বেড়ে ওঠার সময় ও দেশকাল তাঁর জন্য মোটেই অনুকূলে ছিল না। প্রতিকূল পরিস্থিতিই মূলত তাঁকে তাঁর আপন জগত নির্মাণে বাধ্য করে। ঔপনিবেশিক সময়কালের মধ্যে আফ্রিকা যেভাবে তার আপন ইতিহাস থেকে বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল, ঠিক এমন একটা সময়ে আচেবে আফ্রিকার পুনর্জন্মের নতুন সংকল্প হয়ে ওঠেন; হয়ে ওঠেন একটি জাতির নির্মাতা। সে কারণেই পরবর্তী সময়ে লেখনীর মাধ্যমে চিনুয়া এবং পুরো আফ্রিকা এক ও অভিন্ন সত্তা হয়ে ওঠে। নাইজেরিয়ান সাহিত্যের গডফাদার হিসেবে পরিচিত আচেবে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’ দিয়ে বিশ্ব জয় কর নেন। এখানেও ব্রিটিশ কলোনির আগ্রাসী রূপকে তিনি তুলে ধরেছেন। অর্থাত্,সামগ্রিকভাবে তাঁর অন্যান্য লেখাগুলোতেও আফ্রিকান সমাজ, রাজনীতি, স্বদেশ, ব্রিটিশ প্রভাব—প্রভৃতি বিষয় উপজীব্য করে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। বাংলাসহ বিশ্বের প্রায় ৫০টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এই উপন্যাস। বিক্রি হয়েছে প্রায় এক কোটি কপি। তবে এ উপন্যাস প্রকাশ করতে তাঁকে ভালোই বেগ পেতে হয়েছে। প্রত্যাখাত হতে হয়েছে বহু প্রকাশকের কাছ থেকে। এ উপন্যাস যখন লেখেন তখন আচেবে সাতাশ বছরের যুবক, নাইজেরিয়ান ব্রডকাস্টিং সার্ভিসের প্রযোজক হিসেবে কর্মরত। দু-বছরের একনিষ্ঠ পরিশ্রমের পর পাণ্ডুলিপিটি ডাকযোগে পাঠিয়েছিলেন ব্রিটেনের এক প্রকাশনাসংস্থায়। সংস্থাটি বিনা মূল্যে তরুণদের পাণ্ডুলিপি মূদ্রণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল। অনেকদিন ব্রিটেনের সেই প্রকাশনাসংস্থা থেকে কোনো সাড়া পাননি আচেবে। তিনি ধারণা করেছিলেন, তাঁর পরিশ্রমের ফসলটি হারিয়ে গেছে। পরে আচেবের একজন শুভার্থী ব্রিটেন থেকে টাইপ করা পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করে দেন। ১৯৫৮ সালে উইলিয়াম হেইনম্যান নামের এক প্রকাশক বইটি ছাপতে রাজি হন। তবে তিনি মাত্র দুই হাজার কপি ছাপেন। কিন্তু প্রকাশের পরপর বইটি বিশ্ব-অঙ্গনে ব্যপক সাড়া ফেলে। যে সমপ্রদায়ে আচেবের জন্ম, সেই ইগবো সমপ্রদায়ের কাহিনি নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’। উপন্যাসটির পটভূমি গড়ে উঠেছিল ওকোনকো নামের এক সর্বশ্রেষ্ঠ যোদ্ধা ও কুস্তিগিরকে ঘিরে, যার খ্যাতি পশ্চিম আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু ভুল করে সে যখন একজন অভিজাত শ্রেণীর মানুষকে খুন করে ফেলে, দৃশ্যপট পাল্টে যায় আর তার জীবনে গড়ে তোলা সবকিছু ভেঙে পড়তে শুরু করে। অজ্ঞাতবাস থেকে ফিরে ওকোনকো দেখতে পায়, তার গ্রামে মিশনারীর ধর্মযাজক থেকে শুরু করে ঔপনিবেশিক শাসকদের প্রতিনিধিরা জড়ো হয়েছে তাকে শাস্তি দিতে। নিয়তির অমোঘ দুর্দশা থেকে তার আর পরিত্রাণ মেলে না, সে ধীর ধীরে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়। একজন গর্বিত অথচ অসহায় মানুষকে ঘিরে লেখা উপন্যাসটি আফ্রিকার কালো মানুষদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়ার গল্প, যেখানে ইগবো জনগোষ্ঠী নিজেদের ধ্বংস প্রত্যক্ষ করে। ওই একই সময়ে প্রকাশিত আফ্রিকার লেখকদের আরও অন্যান্য উপন্যাসের তুলনায় ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’ অনেক বেশি পরিণত ও স্পষ্ট। সাহিত্যবোদ্ধারা এই বইটিকে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বইগুলোর একটি বলে আখ্যায়িত করেছেন। আফ্রিকান শিক্ষাবিদ ও কাইমি অন্তনি বলেছেন, ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’ আফ্রিকান সাহিত্যকে কী পরিমাণ প্রভাবিত করেছে—তা বলে বোঝনো যাবে না। শেক্সপিয়র যেভাবে ইংরেজি সাহিত্যিকদের এবং পুশকিন যেভাবে রুশ সাহিত্যিকদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করেছেন, আফ্রিকান সাহিত্যের বেলায় চিনুয়া আচেবের ভূমিকা সে ধরনের। তাই তাঁকে আফ্রিকার শেক্সপিয়রও বলা হয়। আচেবের মেধার বিকাশ ও সমাজের প্রতি গভীর মমত্ববোধ ছেলেবেলা থেকেই স্পষ্ট ছিল। ১৯৩৬ সালে তিনি সেন্ট ফিলিপ সেন্ট্রাল স্কুলে ভর্তি হন। সেখানে তাঁকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে শিশুদের জন্য নির্ধারিত ধর্মীয় শিক্ষার ক্লাশ করতে হয়েছে। তবে সে কষ্ট তাঁকে বেশি দিন করতে হয়নি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাতায়াত শুরুর দিকেই অসম্ভব মেধাবী হওয়ার কারণে তাঁকে প্রমোশন দেয় স্কুল কর্তৃপক্ষ। সে সময়ই স্কুলের একজন শিক্ষক জানিয়েছিলেন, আচেবে এই শ্রেণীর সবচেয়ে ভালো হাতের লেখা ও চমত্কার পড়তে পারা বালকদের একজন। তার জের ধরেই স্কুলের প্রধান তাঁকে এই সুযোগ দেন। পরিবার যেহেতু ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সংস্কৃতিকেই বেছে নিয়েছিলেন, আচেবেও সেই বলয় থেকে বের হতে পারেননি। ১২ বছর বয়সে তাঁকে পরিবার ছেড়ে নেকেডে গ্রাম থেকে চার কিলোমিটার দূরে ওয়েরি শহরতলিতে যেতে হয় মাধ্যমিক পড়াশোনার জন্য। সেখানে আচেবের বড় ভাইও পড়তেন। ১৯৪৪ সালে আচেবে প্রবেশিকা পরীক্ষা দেওয়ার জন্য ওনিস্টার বিখ্যাত ডেনিস মেমোরিয়াল গ্রামার স্কুলে ভর্তি হন। এরপর তিনি ব্রিটিশ পরিচালিত উমুয়াহিয়া গভর্নমেন্ট কলেজে ভর্তি হন। যেখানে ইংরেজির বাইরে অন্য কোনো ভাষায় (তা মাতৃভাষা হলেও) কথা বলা ছিল পরিপূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। মাতৃভাষায় কথা বলার অপরাধে আচেবেকে একবার শাস্তি পেতে হয়েছিল। তাঁর কলেজের শিক্ষার প্রধান অংশ ছিল ব্রিটিশদের স্তুতি। বর্ণবাদের ভয়ঙ্কর রূপ সেখানেই দেখেছিলেন আচেবে, যেখানে শেখানো হতো শ্বেতাঙ্গরা ভালো, বুদ্ধিমান ও যুক্তিবাদী। এমন পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে আচেবের মনেও কালোদের প্রতি ঘৃণা জমে উঠতে শুরু করে। তাঁর মনে জন্মানো ঘৃণার কথা অকপটে স্বীকার করেছিলেন আচেবে। নিজের জবানবন্দীতে আচেবে বলেছিলেন, পড়াশোনার মাঝে বেড়ে ওঠার দরুন তিনিও মনে মনে কালোদের ঘৃণা করতে শুরু করেন। এ বিষয়টি তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন। তাঁর নিজের জবানবন্দী ছিল এ রকম, ‘আমি শিখেছিলাম সাদারা চমত্কার ও বুদ্ধিমান। তারা সব ক্ষেত্রে যৌক্তিক। কিন্তু কালোরা বর্বর, ক্ষমতাহীন বোকা গাধা। আমার নিজের মনের মধ্যেই তাদের অক্ষমতার প্রতি ঘৃণা জমে উঠতে শুরু করে।’ তবে আচেবের জীবনধারা বদলে দেয় তাঁর কলেজের পাঠাগার। কলেজের ছাত্রদের বিকেলের বই পড়ার ব্যবস্থা করেছিলেন প্রধান শিক্ষক। সেখানেই তিনি খুঁজে পান দারুণ দারুণ বই। এক সাক্ষাত্কারে তিনি জানান, টি ওয়াশিংটনের ‘আপ ফ্রম স্লেভারি’ নামের এক সাবেক কৃষ্ণাঙ্গ দাসের জীবনী পড়েন সেখানে। বইটি তাকে খুব কষ্ট দিয়েছিল। কিন্তু কৃষ্ণাঙ্গদের জীবনের নির্মম বাস্তবতা খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি। তিনি নিজেই জানান, সেখানে তিনি ‘গালিভার ট্রাভেলস’, ‘ডেভিড কপারফিল্ড’, ‘ট্রেজার আইল্যান্ড’—প্রভৃতি বই পড়েন। ঔপনিবেশিক সাহিত্যও সে সময় তিনি পড়েন; যেমন এইচ রাইডার হ্যাগারডের ‘অ্যালান কোয়াটারমেইন’, জন বুচানের ‘প্রিস্টার জন’ ইত্যাদি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিপরীক্ষায় তিনি সর্ব্বোচ্চ মার্ক পেয়ে ইউনিভার্সিটি অব ইবাদান (প্রাক্তন ইউনিভার্সিটি কলেজ) এ মেডিকেল সায়েন্সে ভর্তি হন। কিন্তু পরে তিনি বিভাগ পরিবর্তন করে ইংরেজি, ইতিহাস ও থিয়োলজি নিয়ে পড়ালেখা করেন। ১৯৫৩ সালে তিনি দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সমাপ্তি টানেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় তিনি তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘ইন অ্যা ভিলেজ চার্চ’ লেখেন। এ গল্পে তিনি তখনকার নাইজেরিয়ান সমাজব্যবস্থা, খ্রিষ্ট ধর্মের প্রসার, জীবনব্যবস্থায় চার্চের ভূমিকা তুলে ধরেন। শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পর তিনি শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে নাইজিরিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন ও বিবিসিতে কাজ করেন। এখানে কাজের সূত্রে ক্রিস্টি অকলি নামে এক রমণীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে আচেবের। পরবর্তী জীবনে তাঁর সঙ্গেই ১৯৬১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৬০ সালে যখন আচেবের সঙ্গে ওকলির প্রণয় চলছিল, সে সময়ই তিনি ‘নো লংগার টু ইজ’ লেখেন এবং প্রেমিকাকে উত্সর্গ করেন। আচেবের স্ত্রী ওকলি তাঁদের বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়াকে আস্থা ও ভালোবাসার পারস্পরিক প্রতিদান হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ১৯৬২ সালের ১১ জুলাই আচেবের প্রথম সন্তান জন্ম নেয়। দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জনক আচেবে সন্তানদের বড় করে তোলার পাশাপাশি শিশুদের জন্য লিখতে শুরু করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি প্রকাশ করেন তাঁর প্রথম শিশুতোষ গ্রন্থ ‘চিক অ্যান্ড দ্যা রিভার’। ১৯৫৮ সালে ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’ প্রকাশিত হওয়ার পর ১৯৬০ সালে প্রকাশিত হয় ‘নো লংগার টু ইজ’। এ দুটি বই আর ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত হওয়া ‘অ্যারো অব গড’ নিয়ে গড়ে উঠেছে আচেবের ট্রিলজি; আফ্রিকান সাহিত্যের যা অন্যতম সেরা সম্পদ। ২০০৭ সালে ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’-এর জন্য ম্যানবুকার পুরস্কার জেতেন আচেবে। ম্যানবুকার পুরস্কার প্রদানের সময়ে আফ্রিকার নোবেল বিজয়ী ঔপন্যাসিক ওলে সোয়েঙ্কা, যিনি পুরস্কারপ্রদান কমিটির একজন সদস্য ছিলেন, আচেবের এই উপন্যাস সম্পর্কে লেখেন ‘ইংরেজিতে এটিই প্রথম উপন্যাস, যা একটি আফ্রিকান চরিত্রের অন্তঃস্তল থেকে কথা বলে, একজন সাদা মানুষের চোখে আফ্রিকার যে বর্ণিল চিত্র, তা থেকে যা একেবারেই ভিন্ন। এর আগে বিশ্বের কাছে যে আফ্রিকার ছবি প্রকাশিত হয়েছিল, সেগুলো ছিল সাদা মানুষদের চোখ দিয়ে দেখা আফ্রিকা।’ কোয়ামে অ্যান্থনি আপাইয়া আচেবেকে ইংরেজি ভাষায় আধুনিক আফ্রিকান সাহিত্যের জনক বলে সম্বোধন করেছেন। আরেক নোবেল বিজয়ী ঔপন্যাসিক নাদিন গর্ডিমার বলেন, তিনি এমন একজন লেখক, যাঁর কোনো বিভ্রান্তি নেই এবং তিনি নিজে বিভ্রান্ত নন, নিজেকে অনুকম্পা না করেই যিনি তাঁর জনগণকে ভালোবাসেন, যিনি এক মহত্, উদার প্রতিভা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছেন। আলিস্টার নিভেনের মতে, আচেবে তাঁর লেখায় জীবনঘনিষ্ট হতে পেরেছেন বলেই জীবিত যেকোনো লেখকের চেয়ে আধুনিক আফ্রিকার কাহিনি অধিকতর পারঙ্গমতার সঙ্গে বলতে পেরেছেন। অসামান্য সাহিত্যসৃষ্টির স্বীকৃতিস্বরূপ চিনুয়া আচেবে তাঁর জীবনে অসংখ্য সম্মান ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এর মাঝে রয়েছে আমেরিকান একাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড লেটারেচার্সের সম্মানিত ফেলো, নাইজেরিয়ার সর্বোচ্চ জাতীয় সম্মাননা। তবে ২০০৭ সালে প্রাপ্ত ম্যানবুকার পুরস্কার তাঁর সাহিত্যকর্মের শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি। ২০১০ সালে তিনি জরোথি অ্যান্ড লিলিয়ান গ্রিস পুরস্কার পান। নাইজেরিয়ার সামরিক সরকার দুবার তাঁকে নাইজেরিয়ার সর্বোচ্চ বেসামরিক জাতীয় সম্মাননা ‘কমান্ডার অব দ্য ফেডারেল রিপাবলিক’ প্রদান করতে চাইলেও সেটি তিনি প্রত্যাখান করেন। স্বৈরাচার-বিরোধী আচেবে সামরিক শাসকদের দেওয়া সম্মান গ্রহণ করতে অনিচ্ছুক ছিলেন। বিশ্বের ত্রিশটিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করেছে। তবে তাঁর ভাগ্যের চাকা স্পর্শ করেনি সাহিত্যের অন্যতম পুরস্কার নোবেল। প্রতিবছর নোবেল ঘোষণার সময় আরও একটি তালিকা উঠে আসে, যাদের নোবেল দিতে না পেরে নোবেল কমিটি বিব্রত। সে তালিকায় হেনরিক ইবসেন, জেমস জয়েস, ফ্রান্স কাফকা, লিও তলস্তয়ের মতো অনবদ্য সাহিত্যিকদের তালিওকায় এবার যুক্ত হলেন আফ্রিকান সাহিত্যের গডফাদার আচেবে। আচবে-ভক্তরা দাবি করেন, তাঁর প্রথাবিরোধী লেখনীর জন্যই তিনি নোবেল-বঞ্চিত হয়েছেন। তাঁর লেখায় উঠে এসেছে সদা জাগ্রত কালোদের বঞ্চনার ইতিহাস, ঔপনিবেশিকতার দৌরাত্ম্য। তবে নোবেল না পাওয়া নিয়ে ভক্তদের আক্ষেপ থাকলেও আচেবের কোনো দুঃখবোধ ছিল না। তিনি বরং বলেছেন, ‘আমি জীবনের এমন একটি অবস্থানে পৌঁছেছি যেখানে নোবেলের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে, কিন্তু এটি ইউরোপীয় একটি পুরস্কার; আফ্রিকান বা নাইজেরিয়ার কোনো পুরস্কার নয়। আর সাহিত্য কোনো হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রতিযোগিতা নয়। হয়তো আমার দেশের জনগণ ভাববে, আমি নকড আউট হয়ে গেছি। এটা তাদের দুঃখিত করবে। কিন্তু কিছুই করার নেই।’ বিশ্লেষকদের অনেকেই বলেন নোবেল দিয়ে সাহিত্যমান বিচার করা একেবারেই মুর্খতা। বিশেষ করে আচেবের ক্ষেত্রে তো অবশ্যই। তিনি তাঁর স্বকীয়তায় অনন্য। জনপ্রিয় ধারার লেখক হতে চাননি আচেবে। দীর্ঘ ৮৪ বছরের জীবনে তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা মাত্র ২৫। সস্তা সাহিত্যের দিকে ঝোঁক ছিল না বরং ছিল স্বজাতির প্রতি দায়বদ্ধতা। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসসমূহ হচ্ছে: ‘এ ম্যান অব দ্য পিপল’ (১৯৬৬), ‘সিভিল পিস’ (১৯৭১), ‘অ্যান্টহিলস অব দ্য সাভানা’ (১৯৮৭), ‘অ্যানাদার আফ্রিকা’ (১৯৯৮), ‘হোম অ্যান্ড এক্সাইল’ (২০০০) প্রভৃতি। কবিতা, ছোটগল্প ও প্রবন্ধের দিকেও তিনি সমান পদচারণা রেখেছিলেন। রয়েছে ১৯৭১ সালে প্রকাশিত কাব্য ‘বিঅ্যাওয়ার, সোল ব্রাদার অ্যান্ড আদার পোয়েমস’, যা কমনওয়েলথ কবিতা পুরস্কার জিতে নেয়। ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর নির্বাচিত প্রবন্ধের সংকলন ‘হোপস অ্যান্ড ইমপেডিমেন্টস’। তাঁর উপন্যাস ‘অ্যান্টহিলস অব দ্য সাভানা’ বুকার প্রাইজের সংক্ষিপ্ত তালিকায় উঠেছিল। আচেবের সাহিত্যের অনেক বড় ভক্ত ছিলেন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী আফ্রিকার পিতা স্বীকৃত কৃষ্ণাঙ্গ নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলা। তাঁর দীর্ঘ ১১ বছরের বন্দিজীবনে আচেবের লেখা ছিল অনবদ্য সঙ্গী। তিনি বলেছিলেন, আচেবের লেখা পড়ে মনে হতো, যেন তাঁর চারদেয়ালের ঘেরাটোপ ভেঙে খান খান হয়ে যাচ্ছে। ১৯৯০ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে যান আচেবে। তারপর দীর্ঘ ২৩ বছর তাঁর চলাচল একেবারেই সীমিত হয়ে পড়ে। তার পর থেকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে অবস্থান করতে শুরু করেন। এর আগে ১৯৭৬ সালে তিনি কেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার কাজ নেন। বেশ কয়েক বছর এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার পর তিনি ফিরে যান ইউনিভারসিটি অব নাইজেরিয়াতে। ১৯৮২ সালে তিনি সেখান থেকে অবসর নেন এবং রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। সেসময় তিনি বামপন্থী রাজনৈতিক দল পিপলস রিডাম্পশন পার্টিতে যোগ দেন এবং দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি নিজেই বলেন, নাইজেরিয়ার রাজনীতি তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াত। সেই তাড়না থেকেই তিনি ‘অ্যা ম্যান অব দ্যা পিপল’ লিখেছিলেন। রাজনীতি নিয়ে তাঁর চিন্তা-ভাবনা কী—তা জানতে চাইলে এক টেলিভিশন সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, ‘অ্যা ম্যান অব দ্যা পিপল’ তাঁর রাজনৈতিক ভাবনার বহিঃপ্রকাশ। ১৯৮৬ সালে আচেবে ওজিডি টাউন ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট জেনারেল বা নগর প্রধান নির্বাচিত হন। ৯০ সালের দুর্ঘটনার পর তিনি চিকিত্সার জন্য ইংল্যান্ডের বাকিংহামশ্যায়ারে যান। চিকিত্সকেরা তাঁকে জানান, তিনি চিরতরে পঙ্গু হয়ে পড়েছেন। তাঁকে হুইল চেয়ারে চলাচল করতে হবে। এর কিছুদিন পর তিনি নিউইয়র্কের ব্যারড কলেজে শিক্ষকতার আমন্ত্রণ পান। দীর্ঘ ১৫ বছর সেখানে শিক্ষকতা করে ২০০৯ সালে ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে আফ্রিকান স্টাডিসের অধ্যাপনায় যোগ দেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেখানেই তিনি কর্মরত ছিলেন। আচেবের মৃত্যুতে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো, যে অধ্যায়ে কালো আফ্রিকান সাহিত্যিকদের আধুনিক সাহিত্যের সাম্রাজ্যে দাপিয়ে বেড়ানোর ইতিহাস তৈরি করেছিল। তবে লেখকদের কখনো মৃত্যু হয় না। তাঁরা বেঁচে থাকেন তাঁদের লেখনীর মাধ্যমে। সব কিছু ভেঙে পড়লেও ভেঙে পড়ে না তাঁদের গড়ে তোলা সাম্রাজ্য। সাহিত্যের ইতিহাসে চিনুয়া আচেবে অমর। ২১ মার্চ ২০১৩ শুধু তাঁর দেহের বিনাশের দিন হিসেবেই পালিত হবে বিশ্বের সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে।