আধুনিক আফ্রিকান সাহিত্যের স্থপতি
প্রকাশ : ২৮ মার্চ ২০১৩, ১৮:৪৫
আধুনিক আফ্রিকান সাহিত্যের স্থাপতি চিনুয়া আচেবে চলে গেলেন বিরাশি বছর বয়সে। এই দীর্ঘ জীবনকালে আফ্রিকার উত্থান, গৃহযুদ্ধ, বিশ্বযুদ্ধ এবং ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণ তিনি প্রত্যক্ষভাবে অবলোকন করেছেন। কখনো কখনো শুধু পর্যবেক্ষক হিসেবে ভূমিকা পালন না করে ইতিহসের অংশীদার হতে চেষ্টা করেছেন। লিখেছেন ঔপনিবেশিক ভাষা ইংরেজিতে, শেষের দিকে মাঝে মধ্যে নিজ মাতৃভাষায়ও নিজেকে প্রকাশ করেছেন।
যখন তিনি নাইজেরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তাঁর প্রথম ছোটগল্প ‘একটি গ্রামের চার্চে’ প্রকাশিত হয়। এই গল্পটিতে তিনি গ্রামীণ নাইজেরিয়া ও খ্রিষ্টান প্রতিষ্ঠানের ভেতরকার আখ্যান তুলে ধরেন। এই আঙ্গিক তিনি পরবর্তী গল্পগুলোতে আরও অনেকবার ব্যবহার করেছেন। ইবাদানে অবস্থানকালে তিনি ‘নতুন পদ্ধতির সাথে পুরোনো পদ্ধতির সংঘাত’, ‘মৃত মানুষের পথ’—গল্পগুলোতে ঐতিহ্যের সাথে আধুনিকতার দ্বন্দ্ব অত্যন্ত সুচারুভাবে চিহ্নিত করেছেন।
১৯৪৮ সালে নাইজেরিয়ার প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়। নাম ইউনিভার্সিটি কলেজ, বর্তমান নাম ইবাদান বিশ্ববিদ্যালয়। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে এর সংযুক্তি ছিল। আচেবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিককার ছাত্র এবং তিনি সর্বোচ্চ মার্কস পেয়ে সবার দৃষ্টি করেন। জিওফ্রে পাবিনদার নামে একজন অধ্যাপক যখন এই ইবাদান বিশ্ববিদ্যালয়ে এলেন এবং তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব পড়াতে শুরু করলেন। এই সময় আচেবে খ্রিষ্টান ইতিহাস ও আফ্রিকান ঐতিহ্যবাহী ধর্ম শীর্ষক বিষয়দুটো খোলার জন্য প্রচেষ্টা চালান। পরবর্তী পর্যায়ে এই বিষয়দুটো পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ইংরেজি বিভাগটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ও সুসংগঠিত বিভাগ হিসেবে সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেতে থাকে। আফ্রিকার অন্যত্র নোবেল বিজয়ী নাট্যকার ওলেসোয়েংকা, ঔপন্যাসিক এলিচি আমাদি, কবি ও নাট্যকার জন পেপার ক্লার্ক এবং কবি ক্রিস্টোফার ওকিবো এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। ১৯৫১-৫২ সালে হেরাল্ড নামক একটি বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করেন। ১৯৫৩ সালে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর তিনি নিজ বাসভূমি ওগিদিতে চলে আসেন। ১৯৫৪ সালে নাইজেরিয়ান ব্রডকাস্টিং সার্ভিসে (এনবিসি) যোগদান করেন। কথিকা বিভাগে তিনি কাজ করতে লাগলেন। পাশাপাশি অব্যাহত গতিতে চলতে লাগল তাঁর লেখালেখি, তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’-এর খসড়া প্রণয়ন। বেতারের কাজে এলেন দেশের বাইরে, লন্ডনে দেখা হলো উপন্যাসিক গিলবার্ট ফেল্পসের সাথে। হূদ্যতা গড়ে উঠল, ভাববিনিময় হলো, তিনি তাঁর সুচিন্তিত মন্তব্য ও পর্যবেক্ষণ পেলেন। ফেল্পস আপ্লুত হলেন, কিন্তু আচেবে উপন্যাসটি আরাও একটু পরিমার্জনা করতে চাইলেন। তিনি সময় নিলেন।
উল্লেখ্য, নাইজেরিয়া বা আফ্রিকার সাহিত্য এসময় তেমন আলোচিত ও ঋদ্ধ ছিল না। তবে বাইরের দেশ থেকে যারা আফ্রিকা নিয়ে উপন্যাস-ছোটগল্প লিখেছেন, যেমন জোসেফ কনরাড তাঁরা চরিত্রের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি বলে কোনো সমারোচক ও আফ্রিকা-বিশেষজ্ঞ মনে করেন। পরবর্তী সময়ে, আচেবে ‘হার্ট অব ডার্কনেস’ প্রবন্ধে সরাসরি কনরাডের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী বলে অভিযোগ করেন। ‘ওরিয়েন্টালিজম’ খ্যাত প্যালেস্টানিয়ান পণ্ডিত এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাঈদও তাঁর এক প্রবন্ধে কনরাডের অজ্ঞতার বিষয়ে আলোকপাত করেন।
নাইজেরিয়ায় ফিরে এসে আচেবের আবার ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’ নিয়ে কাজ করা শুরু করেন। কবি ডব্লিউ বি ইয়েটসের ‘দ্য সেকেন্ড কামিং’ কবিতার একটি চরণ থেকে নেয়া উপন্যাসটির শিরোনাম নিঃসন্দেহে আধুনিকতার বহিঃপ্রকাশ।
১৯৫৭ সাল পর্যন্ত ঘষামাজা করে, অনেক অধ্যায় যোগ-বিয়োগ করে তিনি বিনির্মাণ করলেন উপন্যাসটি। হেইনম্যান অবশেষে ২০০০ কপি ছেপে বাজারে ছাড়লেন। রাতারাতি উপন্যাসটি পাঠপ্রিয়তা পেল, আচেবে একটিমাত্র উপন্যাসে সারাদেশে এবং বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করলেন। এরপর আর তাঁকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
ইগবো সমাজে খ্রিষ্টান ধর্মের প্রভাবকে তিনি তাঁর উপন্যাসে প্রস্ফুটিত করেছেন। আফ্রিকার ঐতিহ্যের সাথে মূল্যবোধের সংঘাত তাঁর অধিকাংশ লেখার উপজীব্য। ইগবো সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য হলো গল্পবলা এবং এই গল্পবলার আঙ্গিকটি আচেবে চমত্কারভাবে আধুনিক উপন্যাসের ঐতিহ্যের সাথে সম্পৃক্ত করে পাঠকের কাছে তুলে দিয়েছেন। মূল যে ঐতিহ্য, শেকড়ের প্রতি যে টান ও মগ্নতা তা তিনি অক্ষুণ্ন রেখে একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস ও চলমান সাম্প্রতিক ঘটনাকে চিত্রিত করেছেন।
১৯৬৭ সারের মে মাসে নাইজেরিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে এক ভয়ংকর গৃহযুদ্ধ শুরু হয় এবং শেষ পর্যন্ত বায়াফ্রা রাষ্ট্রের অভ্যুদয় হয়। এই গৃহযুদ্ধ সম্পর্কে দীর্ঘ দিন আচেবে কিছু লেখেননি, মৃত্যুর কিছুদিন আগে একটি আত্মকথা লিখেছেন।
আচেবে আফ্রিকার সাহিত্যে একটি আধুনিক ধারা সংযোগ করেন। ‘আধুনিকতা’ বিষয়ে একটি প্রবন্ধে ভার্জিনিয়া উলফ একবার লিখেছিলেন, ‘১৯১০ সাল থেকে আধুনিকতার শুরু। এর আগে যা কিছু লেখা হয়েছে, এইচ জি ওয়েলস বা ব্রেট যা লিখেছেন, তা কাহিনি বা আখ্যান নির্ভর। আমি বা জেমস জয়েস মানুষের মনের অন্তর্দ্বন্দ্বগুলো তুলে ধরেছি এবং এটাই হচ্ছে আধুনিকতা।’ উপনিবেশিকতা এবং উপনিবেশ সম্পর্কে আচেবে An Image of Africa প্রবন্ধে বলেছেন ‘যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের ও অন্যের মধ্যে স্পষ্ট দূরত্ব ও বিচ্ছিন্নতা থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত উপনিবেশিক ও উপনিবেশের অবস্থান সংঘাতময় হবে।’ এই সংঘাত নাইজেরিয়ার অসংখ্য গোত্রের ভেতরে পরিলক্ষিত হয়। ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত ‘অ্যা ম্যান অব দ্য পিপল’ উপন্যাসে বিভিন্ন গোত্রের সাংস্কৃতিক সংঘাত বিবৃত হয়েছে। ‘অ্যারো অব গড’, আচেবের তৃতীয় উপন্যাস, প্রকাশিত হয় ১৯৬৪ সালে, তাঁর অন্যান্য উপন্যাসের মতো এই উপন্যাসেও ইগবো ঐতিহ্যের সাথে পাশ্চাত্যের খ্রিষ্টান ধর্মের প্রভাব ও মূল্যবোধ চিত্রিত হয়েছে।
তিনি ভার্জিনিয়া উলফ কথিত অন্তঃপ্রবাহ শৈলী বা Stream of Consciousness ধারাটি তার মতো করে উপন্যাসে ব্যবহার করেছেন। তার ঐতিহ্যের সাথে তিনি কোনো বিবাদ করেননি, বরং ঐতিহ্যের প্রতি, লোকাচার, লোকগাথা, মিথ—সাহিত্যের এইসব অনুসঙ্গের প্রতি সহনশীল ও শ্রদ্ধাবান থেকেই এক অনালোকিত সম্প্রদায়ের চলমান ইতিহাস ব্যক্ত করেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার আরেক নোবেল বিজয়ী গার্ডিমারের সাথে একটি জায়গায় সাযুজ্য আমরা খুঁজে পাই, তা হলো তার মানবিকতা।
আরেক আফ্রিকান ঔপন্যাসিক জি.এম. কোয়েিজ যিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, যার ‘ডিসগ্রেম’ উপন্যাসটি বেশ জনপ্রিয় হয়েছে, সেখানেও আমরা উপনিবেশিক প্রভুদের অত্যাচারের চিত্রটি দেখতে পাই। বর্ণবাদ আফ্রিকাকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে, হিংসা ও সন্ত্রাসের রাজনীতি মানবসভ্যতাকে কতটা পর্যুদস্ত করেছে সেসব কথা ফ্র্যাঞ্জ ফ্যানন ‘A Dying Colonialism’ প্রবন্ধে লিখেছেন। আচেবে পাঠ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে যদি না আমরা ফ্যানন পাঠ করি। তিনি বিশ্লেষণ করেছেন, তুলনামূলক আলোচনা করেছেন আর উপনিবেশবাদের স্বরূপটি উদ্ঘাটনের প্রয়াস পেয়েছেন।
আধুনিক উপন্যাসে বিচ্ছিন্নতাবোধ, নৈরাশ্য, শেকড়হীনতার পাশাপাশি মানবিকতার কথা থাকবে মনে করেন অনেক সাহিত্য তাত্ত্বিকেরা। আজকের উপন্যাস অনেক বদলে গেছে। কাহিনিনির্ভর উপন্যাসের যুগ শেষ, এখন অভিব্যক্তি প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি বিষয় উপন্যাসের আশ্রয় হয়েছে। আচেবে ঐতিহ্যের সাথে আধুনিকতার এক অপূর্ব ও সফল মিথস্ক্রিয়া প্রয়োগ করতে পেরেছেন। এখানেই তাঁর মুনশিয়ানা।
বাংলাদেশে আচেবে, টুটুওলা গভীরভাবে পঠিত না হলেও এরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত বলে আমাদের বিদগ্ধ পাঠকদের কাছে পরিচিত। বাংলায় আচেবের দুটি উপন্যাস সাম্প্রতিক কালে অনুবাদ হয়ে বাংলাদেশের পাঠকদের হাতে পৌঁছে গেছে। ভবিষ্যতে তাঁর গল্পগ্রন্থও যোগ্যহাতে অনূদিত হয়ে পাঠকদের কাছে পৌঁছবে নিশ্চয়ই।
হেইনম্যান প্রকাশনা সংস্থা ‘কন্টেম্পরারি আফ্রিকান শর্ট স্টোরি’ শিরোনামে একটি গল্পগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়ে বেশ সাড়া জাগিয়েছিল।
নাইজেরিয়ান আরেক ক্ষমতাশালী কথাশিল্পী বেন ওকরিও আফ্রিকার সাহিত্যে একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু আচেবের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। তাঁর শৈলী অনুকরণীয়। আফ্রিকার আধুনিক সাহিত্যে নিঃসন্দেহে তিনি একজন অন্যতম স্থপতি। দেশে এবং বিদেশে অসংখ্য সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ম্যান বুকার তাঁর শেষতম পুরস্কার। তাঁর পাঠকেরা প্রত্যাশা করেছিলেন—তিনি নোবেল পুরস্কারটিও পাবেন। রাজনৈতিক ধূম্রজালে প্রশ্নবিদ্ধ নোবেলপুরস্কার না পেলেও তিনি বিশ্বসাহিত্যে তার হাতে গোনা গুটিকয় উপন্যাসের জন্য অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।