কক্সবাজারে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলাকালে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তি সেখানে নির্বিকার ছিলেন

সারাদেশে মন্দির, উপাসনালয়ে ভাঙচুর, হামলা, লুটপাট, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট, অগ্নিসংযোগ এবং সংখ্যালঘুদের ওপর যে হামলা হয়েছে- তা মোকাবেলায় সরকারের প্রচেষ্টার যথেষ্ট অভাব ছিল। এমনকি পুলিশও সময় মতো ব্যবস্থা নেয়নি। সহযোগিতার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের নেতাকর্মীরাও ভূমিকা রাখেননি। এ কারণে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। তাদের মনে ফাটল ধরেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে কেন্দ্রীয় ১৪ দলের সঙ্গে বৈঠকে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্যপরিষদসহ সংখ্যালঘুদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এসব কথা বলেন। বৈঠকে সংখ্যালঘু নেতৃবৃন্দের একাধিক প্রশ্নের মুখে পড়েন ১৪ দলের নেতৃবৃন্দ। তারা বলেন, জাতীয় ঐক্যের মধ্যে যে ফাটল ধরেছে তা পুনরুদ্ধারে জাতীয় কনভেনশন করতে হবে। একাত্তরের মূর্তিতে তাণ্ডবে যারা জড়িত, তাদের এখনই চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসনিক সকল দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যাতে বিনষ্ট না হয় সেজন্য টাস্কফোর্স গঠনের মাধ্যমে মনিটরিং সেল প্রণয়নেরও দাবি জানান তারা। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য পাট ও বস্ত্র মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবীর নানক, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আফম বাহাউদ্দিন নাছিম, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান মল্লিক, গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক নূরুর রহমান সেলিম, গণআজাদী লীগের হাজি আব্দুস সামাদ, জাসদ নেত্রী শিরিন আক্তার, কমিউনিস্ট কেন্দ্রের ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম, অসিত বরণ রায়, বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের অ্যাডভোকেট রানা দাসগুপ্ত, পরিষদের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. নিমচন্দ্র ভৌমিক, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি কানুতোষ মজুমদারসহ ১৪ দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। সভা পরিচালনা করেন ১৪ দলের দপ্তর সম্পাদক ও আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস। বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে ১৪ দলের পক্ষে মোহাম্মদ নাসিমকে আহ্বায়ক করে একটি মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। এ সেলে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সদস্যও অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। মনিটরিং সেলটি সার্বক্ষণিক মনিটর করবে। মোহাম্মদ নাসিম বলেন, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন বন্ধসহ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ন রাখতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের নেতাকর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত সব এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তিনি বলেন, একাত্তরের ঘাতকদের বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সজাগ থাকতে হবে। কারণ তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করতে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনে শেখ হাসিনাকে বিজয়ী করতেই হবে। নইলে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে খালেদা জিয়া সংখ্যালঘুদের উপর হামলার নির্দেশ দিয়েছেন। এখন মায়া কান্না করছেন। সংখ্যালঘুদের বড় নেতা সাজছেন। ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, সাম্প্রদায়িক বিভাজন সৃষ্টির জন্য পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতা দখলের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। বেগম জিয়া সেনাবাহিনীকে ক্ষমতা দখলের আহ্বান জানিয়েছেন। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু বলেন, ক্ষমতায় আসার পর থেকে ডিফেনসিভ ছিলাম এখনো আছি। তারা অফেনসিভ। আমাদের একটু অফেনসিভ খেলা করা দরকার। আমাদের ডিফেনসিভ খেলার সময় নেই। তিনি বলেন, পুলিশ মার খাচ্ছে, মারা যাচ্ছে মানুষ বলে পুলিশ আরেকটু কৌশলী হতে পারতো। এই কৌশলী অবস্থান নিতে নিতে আমাদের সরকারের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। বৈঠকে সংগঠনটির নেতারা বিগত সরকার ও বর্তমান সরকারের সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও নির্যাতনের ফিরিস্তি তুলে ধরে এ জন্য আওয়ামী লীগসহ প্রগতিশীলদেরই বেশি দোষ বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের অভিযোগ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আওয়ামী লীগের না বিরোধী দলের এই হিসাব নিকাশের জন্যই প্রতিনিয়ত হামলার শিকার হচ্ছে তারা। একদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনে করে সংখ্যালঘু মানেই তাদের লোক। আর এর ওপর যে কোনো হামলার জন্যই বিরোধী দল বা বিএনপি-জামায়াতই দায়ি। পূজা উত্যাপন কমিটির উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, সম্প্রতি কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় আওয়ামী লীগের মিছিলে না যাওয়ায় ওই এলাকার স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের প্রত্যক্ষ নির্দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বেশ কয়েকটি বাড়ি-ঘর ও স্থাপনায় হামলা হয়েছে। এ জন্য পরক্ষণেই বিরোধী দলের ওপর দোষ দেয়া হয়েছে। কক্সবাজারের অপর একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, জামায়াত নেতা কাদের মোল্লা বা সাঈদীর যুদ্ধাপরাধের মামলার বিচারের রায় ঘোষণার আগেই সেখানে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হয়েছে। পুলিশের সামনেই এসব ঘটনা ঘটেছে। এমনকি স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকুও তার সাথে ওই এলাকায় উপস্থিত ছিলেন। তিনিও নির্বিকার ছিলেন ওই সময়। এর কারণ জিজ্ঞাসা করায় টুকু তখন বলেছেন আমার কিছুই করার নেই। খ্রিস্টান সমিতির নেতা নির্মল রোজারিও অভিযোগ করেছেন, হামলা-নির্যাতন হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু এতদিন আওয়ামী লীগ বা সরকারের কারোরই টনক নড়েনি। এখন সারা বিশ্ব বিবেক যখন এটা নিয়ে ঘৃণা বর্ষণ শুরু করেছে। তখন ১৪ দল, আওয়ামী লীগ আমাদের পাশে এসেছে।