পাকস্থলী সম্বন্ধে যা জানা প্রয়োজন

অনেক সময় প্রিয় খাবার খাওয়ার পরও পেট জ্বলা, পেট গুলিয়ে উঠা, পেট ফেঁপে উঠা, পেটে গ্যাস এসব অস্বস্তি, অনেক সময় অচেনা মানুষের সামনে এলিভেটরে বিব্রত হওয়া পাকস্থলীকে এজন্য দায়ী করা যেতেই পারে। বিশেষজ্ঞরা বলেন অনেকেই পাকস্থলী, পারকনল, পরিপাক এসব সম্বন্ধে জানেন কম, কারণ হয়ত পেটের এসব সমস্যা সমাধানে বেশ দুরূহ। পাকস্থলীর স্বাস্থ্য সম্বন্ধে অনেক জনশ্রুতি, অনেক ভূল ধারণা রয়েছে। এজন্য কিছু সমস্যা মোকাবেলায় এত পারঙ্গম হন না অনেকেই। পাকতন্ত্র বিশেষজ্ঞরা বলেন, অনেক সময় যেসব সমস্যা বেশি ভীতিকর, জটিল ও দুরূহ মনে হয় তা হয়ত সহজ সরল কোনও সমস্যা, সমাধানও হয়ত সরল, সত্যটি জানলে সরল পথ পাওয়া যায় সমাধানের জন্য। এব্যাপারে কিছু পরামর্শ, মতামত দিয়েছেন নিউইউর্ক সিটি মনটেফায়োরো মেডিকেল সেন্টার ও আলবার্ট আইনস্টাইন মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা: ডেভিড গ্রীন ওয়ান্ড ও শিশু বিশেষজ্ঞ ও শিশু গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা: জোসেফ লেভি, নিউইউর্ক। পাকস্থলীতে প্রাথমিকভাবে পরিপাক হয় খাদ্যদ্রব্যের। এমন একটি ধারণা সঠিক নয় সর্বাঙ্গে। পরিপাক প্রক্রিয়ার প্রধান অংশ ঘটে ক্ষুদ্রান্দ্রে। পাকস্থলীর কাজ হলো খাদ্যকে গ্রহণ করে, চূর্ণকরা, ক্ষুদ্রঅংশে বিভক্ত করা যাকে বলে পাচকমন্ড। পাচকমন্ড এরপর ছোট ছোট ধাপে উত্সারিত হয়ে যায় ক্ষুদ্রান্ত্রের ভেতরে, যেখানে হয় বেশিরভাগ পরিপাক। লেডি বলেন, যে অনুক্রমে খাদ্য খাওয়া হয় সেই ধারাক্রমে পরিপাক হয় না, খাদ্য গ্রহণের পর সব স্থান নেয় পাকস্থলীতে, সেখানে চূর্ণ হয় সব খাদ্য, আর যখন তৈরি হয় তখন ক্ষুদ্রান্ত্রে একত্রে উত্সারিত হয়। ভূল না সত্য খাদ্য গ্রহণ কমিয়ে দিলে পাকস্থলী ছোট হয়ে যায়, তাই ক্ষুধাও লাগে পরে কম। একথাটি সত্যি নয়। পূর্ণ বয়স্ক হলে পাকস্থলী যে আয়তন তা ঠিক থাকে, অবশ্য অস্ত্রোপচার করে ছোট করলে বা কেটে ফেললে অন্য কথা। কম খেলে পাকস্থলী সংকুচিত হয়ে যায় না, বলেন বিশেষজ্ঞ মোয়াড, নিউইউর্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের। তবে এর ফলে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাটি পুন:স্থাপিত হতে পারে যেজন্য ক্ষুধা কমে যেতে পারে আর সেজন্য আহার পরিকল্পনা কার্যকরী হওয়ার সুযোগ হয়। ভূল না সত্য, আরো আছে। বলা হয় রোগা পাতলা লোকের পাকস্থলী ভারী, স্থূল লোকের পাকস্থলী থেকে ছোট আয়তনের। এও ভুল। মিথ। হয়ত বললে বিশ্বাস হবেনা, দেহের ওজন বা ওজন নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে পাকস্থলীর আয়তনের কোনও সম্পর্ক নেই। যারা স্বাভাবিকভাবেই পাতলা এদের পাকস্থলীর আয়োতন ভারি লোকের সমান বা এর চেয়ে বড়ও হওয়া বিচিত্র নয়। পাকস্থলীর আয়তনের উপর দেহের ওজন কোনও প্রভাব ফেলেনা। অনেকে পাকস্থলী ছোট করার সার্জারি করার পরও দেহে ওজন সঞ্চয় করেন বাড়তি। অনেকে বলেন, উঠবস বা পেটের ব্যায়াম করে পাকস্থলীর আয়তন ছোট করা যায়। একথাটি সঠিক নয়। কোনও ব্যায়ামই দেহযন্ত্রের আয়তন পরিবর্তন করতে পারে এমন প্রমাণ নেই। তবে শরীরের বহি:স্তরে যে মেদ জমে সেই মেদস্তর দহন করে শরীরকে ঝরঝরে করতে সাহায্য করে ব্যায়াম। উদরের পেশীও মজবুত হয়। মজার ব্যাপার হলো, উদরের যে মেদ যা স্বাস্থ্যের জন্য ভয়ানক ক্ষতিকর তা দৃৃশ্যমান নয়। এটি অবস্থান করে মেদাচ্ছদে। আমাদের দেহের আন্তরযন্ত্রের চার পাশে যে অন্ত:স্তর এর ভিতর ও উপরে জমে যে মেদ তা হলো বড় বিপজ্জনক। যাদের দেহে ওজন খুব বেশি, তাদের পেটের ভেতর যন্ত্রগুলোতে মেদজমে বেশি, কখনও কখনও যকৃতে এত মেদ জমে যে, হেপাটাইটিস পর্যন্ত হতে পারে। যকৃত্রের কাজ কর্মেও বেশ বিঘ্ন ঘটতে পারে। স্বস্থির কথা হলো, স্বাস্থ্যকর আহার পরিকল্পনা দেহের ওজন যেমন কমাতে পারে তেমনি আন্ত:মেদস্তরকেও কিছুটা কমাতে পারে। যেসব খাদ্যে অদ্রবনীয় আঁশ (যা পানিতে দ্রবনীয় নয়) রয়েছে তেমন খাবার খেলে যেসব খাদ্যে দ্রবনীয় আঁশ আছে, সেসব খাবারের তুলনামূলকভাবে পেটে কম গ্যাস তৈরি করে। কথাটি সত্য। পাকনল বিশেষজ্ঞ মোয়াদ বলেন, অনেকে জেনে অবাক হবেন যে, দ্রবনীয় বা কোমল আঁশ, তুষ, বীনস্ মটরশুটি, কমলালেবুর মত ফলে যে আঁশ সেসব খেলে পেটে গ্যাস বেশি হয়, অদ্রবনীয় আঁশের চেয়ে। অদ্রবনীয় আঁশ রয়েছে, আচারকটি, গম শস্য, বাধাকপি, বীট ও গাজরে। কথাটি সত্য। খাদ্যের দ্রবনীয় আঁশ অন্ত্রে পরিপাক হওয়াতে পেটের ভেতর হিতকর সহায়তা হয় গ্যাস। আর অদ্রবনীয় আঁশ, হজমই হয় না, সরাসরি মলের সঙ্গে বেরিয়ে যায় তাই পাচকনলের জীবানুর সঙ্গে ক্রিয়া বিক্রিয়াও হয়না। গ্যাসও হয় না। তবে একটি কথা মনে রাখা ভালো, যেহেতু অদ্রবনীয় আঁশে গ্যাস উত্পন্ন করে না। এটি কোমল ও নরম করে মল। মল নির্গমন হয় সহজ। ভূল না সত্যি, অম্ল প্রতি প্রবাহ ঠেকানোর একটি পথ হলো ২-৩ পাউন্ড ওজন শরীর থেকে হারানো। কথা ঠিক। পাকস্থলী থেকে যত কম অম্লরস খাদ্যনালীকে পেছনদিকে উঠবে, তত সমস্যা কত হবে। সত্যি, উদর থেকে মাত্র ২ পাউন্ড ওজন হারালেও অবাক ব্যাপার ঘটে কম বুক জ্বলা। গর্ভবতী হলে তাই নারীদের বুকজ্বলা হয়। পেটের ভেতর শিশু যতবড় হতে থাকে, ঠেলতে থাকে অন্তরযন্ত্র, বুক জ্বালা বাড়ে, আর সন্তান প্রসব হয়ে গেলে, চাপ সরে গেলে, বুক জ্বালাও চলে যায়। তাই মেদ ঝরালে, পেটের মেদ ঝরালেই লাভ। একই খাবার দিনের বেলা আহার না করে শোবার আগে আহার করলে শরীরে ওজন লাগে দ্রুত। বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞ বলেন, আমরা যত ক্যালোরি শরীরে পোড়াই এর চেয়ে বেশি ক্যালোরি গ্রহণ করলে ওজন লাগে বেশি শরীরে। যদিও যুক্তিসঙ্গত মনে হয় যে, কর্মচঞ্চল দিনে আহার করলে খাবার দহন হয় দ্রুত ও সহজে, রাতে খাবার খাওয়ার চেয়ে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, দেহের ওজন বৃদ্ধি ২৪ ঘন্টার দেহ ঘডির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। অনেকে বলেন রাতের আহারের পর বাড়তি স্ন্যানক্ খাওয়া বন্ধ করলে ওজন বাড়া রোধ করা সম্ভব। ঘুমাবার ঠিক আগে রাতের আহার দেহের প্রাত্যহিক ছন্দকে বিচ্যুত করে এবং ক্ষুধা নিয়তক হরমোন পরিবর্তন করে, ফলে বাড়ে ওজন শরীরের। আমরা যখন ক্লান্ত হই বা চাপগ্রস্ত হই, তখন শোবার আগে আগে আহার করলে হজম হয় বিঘ্নিত, পেটে হয় গ্যাস, হয় বুকজ্বলা, পেটফাপা। পাচকনলে আছে এক ‘মগজ’ যা খাদ্যকে পাচকনলের মধ্য দিয়ে ঠিক গতিতে, ঠিক পরিমাণে চলতে সহায়তা করে বলেন লেডি। আমরা যখন দিনের শেষে, তখন পাচকনলের ‘মগজ’ ও শ্রান্ত, তখন পাচকনলের মধ্য দিয়ে খাদ্য চলনের জন যত সংকোচন প্রয়োজন তাও যায় কমে।