কাপ্তাইয়ে জুমের আগুনে পুড়ছে সবুজ পাহাড়

জুমের আগুনে পুড়তে শুরু করেছে পর্যটন উপশহর কাপ্তাই উপজেলার ছোট-বড় প্রায় অর্ধ শতাধিক সবুজ পাহাড়। প্রতি বছরের মতো এবারও শুরু হয়েছে জুম চাষের জন্য পাহাড়ে পোড়ানোর তত্পরতা। কাপ্তাইসহ পার্বত্য তিন জেলাব্যাপী জুম চাষের জন্য মূলত এপ্রিল থেকে পাহাড়ে অগ্নিসংযোগের তত্পরতা পুরোদমে শুরু হওয়ার অলিখিত নিয়ম থাকলেও এবার মার্চেই শুরু হয়েছে। সবুজ পাহাড়ে আগুনের শিখায় কাপ্তাইয়ের আকাশ ধোঁয়াচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। জুম চাষের আগুনে বিরান হয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের পর পাহাড়। পুড়ে যাচ্ছে লাখ লাখ টাকার বনজসম্পদ, ঘটছে পরিবেশ বিপর্যয়, ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। ক্ষয়ে যাচ্ছে মৃত্তিকাশক্তি। উপজাতি জনগোষ্ঠীর এক অদ্ভুত চাষাবাদ পদ্ধতি জুম চাষ। পার্বত্য চট্টগ্রামের মঙ্গলীয় জনগোষ্ঠী থেকে উদ্ভাবিত হওয়া এ চাষাবাদ পদ্ধতি বর্তমানে তিন পার্বত্য জেলায় ব্যাপকহারে সম্প্রসারিত হয়েছে। এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, বর্তমানে পার্বত্য তিন জেলায় প্রায় ৮৫ হাজার হেক্টর পাহাড়ি ঢালু জমিতে জুম চাষ হচ্ছে। যা ১৯৯০ সালে ছিল মাত্র ১৬ হাজার হেক্টর জমিতে। ১৯৯৯ সালে চাষ হয় ৭৮ হাজার ১৫৩ একর জমিতে, ২০০০ সালে চাষ হয় ৭৮ হাজার হেক্টর জমিতে। গত এক দশকে এ জুম চাষ কার্যক্রম প্রায় ৫ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয় কাপ্তাই কামিল্ল্যাছড়ি এলাকা উপজাতীয় জুমচাষী উইখ্যাচিং মারমা, দিনমোহন চাকমা উচাচিং মার্মা জানান, পাহাড়ি সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই এ অঞ্চলের লোকজন পাহাড়ের ঢালুতে জুম চাষ করে জীবিকানির্বাহ করে আসছে। এক সময় যদিও ওই মঙ্গলীয় নৃ-গোষ্ঠীগুলো যাযাবর জীবনযাপন করত, কিন্তু বর্তমানে তা আর নেই। মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইন্সটিটিউটের জরিপমতে ঢালু জুম ক্ষেতে হেক্টর প্রতি মৃত্তিকা ক্ষয়ের পরিমাণ ৪৩ টন। আর পরিত্যক্ত জুম ক্ষেতে এর পরিমাণ ১.২ টন। এছাড়া জুম চাষ স্থানান্তর বা কৃষিতে পাহাড় ভূমি যথাযথ বিরতি না পাওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ অবস্থার পরিবর্তন হলে আগামী ৩/৪ দশকে পার্বত্য এলাকা বসবাস অনুপযোগী হয়ে পড়বে। কাপ্তাইয়ের জুম চাষ এলাকায় সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, এখানকার পাহাড়ি হাজার হাজার হেক্টর বনভূমিতে আগুন জ্বলছে। ন্যাড়া হয়ে যাচ্ছে পাহাড়। গত এক সপ্তাহ ধরে একটানা আগুন জ্বলছে কয়েকশ’ হেক্টর পাহাড়ি জমিতে। এভাবে আগামী পুরো এপ্রিল মাস জুড়ে পাহাড়ে আগুন জ্বলতে থাকবে বলে স্থানীয় উপজাতীয় জুম চাষিরা জানান। জুমিয়ারা জানায়, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ এ দু’মাসে জুমচাষের জন্য নির্বাচিত পাহাড়ের জঙ্গল সাফ করার কার্যক্রম শুরু করা হয়। পুরো এপ্রিল মাস পর্যন্ত পাহাড় আগুনে পুড়িয়ে সাফ করার কাজ চলে। এরপর মে মাসে ধানসহ অন্যান্য ফল ফলাদির বীজ বোনা হয়। জুন এবং জুলাই মাসে ফলন উত্তোলন করে বাজারজাত করা হয়।