কাল দুই জেলায় হরতাল

পুলিশ-জামায়াত সংঘর্ষ গুলি, পাঁচজন নিহত

গত ২৪ ঘন্টায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জ জেলায় পুলিশের সঙ্গে জামায়াত-শিবির ও বিএনপির পৃথক সংঘর্ষে কমপক্ষে ৫ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে সাংবাদিকসহ শতাধিক। উভয় ঘটনায় এজাহার-ভুক্ত আসামি ধরতে গেলে ১৮ দলীয় জোটের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা সংঘবদ্ধ হয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালায়। তারা আটক আসামিকে ছিনিয়ে নেয়ারও চেষ্টা করে। এ সময় আত্মরক্ষার্থে পুলিশ পাল্টা গুলি চালালে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে। এদিকে এ ঘটনার প্রতিবাদে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জে আজ শনিবার বিক্ষোভ-সমাবেশ এবং রবিবার হরতাল ডেকেছে স্থানীয় ১৮ দল। চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি মো. তসলিম উদ্দিন জানান, জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুরে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনীর সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের সংঘর্ষে তিনজন নিহত হয়েছেন। এ সময় ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশসহ অন্তত ৫০ জন আহত হন। এর মধ্যে ১০ জন গুলিবিদ্ধ বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় ২২ জনকে আটক করা হয়েছে। নিহতরা হলেন মতিউর রহমান (৪৫), রবিউল ইসলাম (২৪) ও মাদ্রাসা ছাত্র ওলিউল্লাহ (১৬)। এরা দলের কর্মী-সমর্থক বলে দাবি করেছে স্থানীয় জামায়াত। তবে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা বলেছেন, তারা কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিল না। এলাকাবাসী ও পুলিশ সূত্র জানায়, সম্প্রতি স্থানীয় পল্লীবিদ্যুত্ কার্যালয়ে তাণ্ডবের মামলায় এক আসামিকে ধরতে রাত ৩ টার দিকে যৌথবাহিনীর সদস্যরা শ্যামপুরে আসেন। বিষয়টি জামায়াত- শিবির কর্মীরা টের পেয়ে মসজিদের মাইকে ডাকাত-ডাকাত চিত্কার শুরু করেন। এতে শত শত জামায়াত-শিবির কর্মী চারপাশ থেকে এসে যৌথবাহিনীর সদস্যদের ঘিরে ফেলে। খবর পেয়ে পরে আরো পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি ঘটনাস্থলে এলে নেতা-কর্মীরা তাদের উপর হামলা চালান। এ সময় জীবন বাঁচাতে যৌথবাহিনীর সদস্যরা গুলি চালালে ওই তিন জন মারা যান। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে জামায়াত-শিবির কর্মীরা চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের শান্তিমোড় থেকে শিবতলা এলাকায় ঝটিকা মিছিল করে। তারা শহরের স্বরূপনগর ও শিবতলা এলাকায় বেশ কিছু ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। মহানন্দা সেতুর টোলঘর এলাকাসহ চাঁপাইনবাবগঞ্জ-সোনামসজিদ সড়কের বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড দিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জেলা প্রশাসক ড. শাহ আলম জানান, কানসাট পল্লীবিদ্যুত্ কার্যালয় পোড়ানোর মামলার আমাসিদের ধরতে গেলে এ ঘটনা ঘটে। এদিকে গ্রেফতারের নামে গ্রামবাসীর উপর পুলিশের নির্বিচারে গুলি চালানোর প্রতিবাদে গতকাল শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে জেলা শহরের পাঠানপাড়াস্থ বিএনপি কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে আজ শনিবার বিক্ষোভ-সমাবেশ এবং রবিবার জেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতালের কর্মসূচি ঘোষণা করেন স্থানীয় ১৮ দল নেতৃবৃন্দ। এসময় জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সাবেক এমপি হারুনুর রশীদ, জেলা বিএনপি সভাপতি সাবেক এমপি অধ্যাপক শাহজান মিয়া, জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য রফিকুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। শিবগঞ্জ সংবাদদাতা মোহা. সফিকুল ইসলাম জানান, নিহত মতিউর উপজেলার শ্যামপুর ইউনিয়নাধীন গোপালনগর গ্রামের জিল্লার রহমানের ছেলে। সে পাঁচ সন্তানের জনক। অন্য দুজনের মধ্যে ওলিউল্লাহ শরত্নগর গ্রামের আ. হাকিমের এবং রবিউল বাবুপুর বৈতালপাড়া গ্রামের বাহাদুর রহমান ভোদুর ছেলে। রাত ৮টায় এ সংবাদ লেখা পর্যন্ত নিহতদের লাশ পুলিশের হেফাজতে ছিল। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ, র্যাব, বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। গ্রেফতারের ভয়ে শ্যামপুর ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রাম পুরুষ শূন্য হয়ে পড়েছে। জামায়াত-শিবির চোরাগোপ্তা হামলা চালাতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় থানার এসআই মো. আজাহার আলী। সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি ফজল-এ-খোদা লিটন জানান, জেলার বেলকুচিতে জামায়াত কর্মী গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে পুলিশের উপর বিএনপি, জামায়াত-শিবিরের হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনায় ২ জন নিহত ও পুলিশ-সাংবাদিকসহ অন্তত ৫০ নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন উপজেলার কল্যাণপুর গ্রামের আব্দুল হামিদের পুত্র ইউনুস হোসেন (১৭) ও সর্বতুলসী গ্রামের আব্দুল মজিদের পুত্র ফরিদুল ইসলাম (২৫)। নিহতদের লাশ সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। নিহতরা যুবদল ও ছাত্রদলের কর্মী বলে দাবি করেছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আমিরুল ইসলাম আলিম। সন্ধ্যায় জেলা বিএনপি কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সন্মেলনে আগামী রবিবার সিরাজগঞ্জে অর্ধদিবস হরতাল কর্মসূচির ঘোষণা দেন জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু। এছাড়া আজ শনিবার কালো ব্যাজ ধারণ, দলীয় কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন ও বিকালে বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি দেয়া হয়েছে। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, আওয়ামী লীগের কার্যালয় ভাংচুর মামলার তালিকাভুক্ত আসামি জামায়াত কর্মী হাবিবুর রহমানকে গ্রেফতারের জন্য পুলিশ গতকাল সকাল ১১টার দিকে উপজেলার ধুকুরিয়া বেড়া ইউনিয়নের মৌপুর গ্রামে যায়। হাবিবকে আটক করে মৌপুর বাজারে এলে পুলিশের ওপর হামলা চালায় জামায়াত-শিবির ও বিএনপির নেতা-কর্মীরা। এ সময় তারা পুলিশের কাছ থেকে আসামিকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। পরে কল্যাণপুর গ্রামে আওয়ামী লীগ কর্মী নিয়ামত মেম্বরের বাড়িতে হামলা চালায় তারা। জেলা শ্রমিক লীগের যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল আলীম ও সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল জব্বার খান রতু জানান, মসজিদে মাইকিং করে পাশের কল্যাণপুর, কান্দাপাড়া, সর্বতুলসী ও ধুলদিয়া গ্রামের মহিলাসহ শত শত জামায়াত-বিএনপি সমর্থককে জড়ো করে পুলিশের উপর হামলা চালানো হয়। এ সময় ব্যাপক সংঘর্ষ, ধাওয়া- পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ১৪৩ রাউন্ড রাবার বুলেট, টিয়ারশেল ও শটগানের গুলি নিক্ষেপ করে। এতে বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন। এদের মধ্যে দুইজন উল্লাপাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়ার পথে মারা যান। আহত ৭ জনের অবস্থা আশংকাজনক বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বিএনপি নেতা আলম হোসেন। দলের নেতা-কর্মীদের বাড়িঘরে ভাংচুর ও লুটপাট চালানোর অভিযোগ করেছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি একেএম ইউসুফজী খান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে র্যাব-১২’র এএসপি অশোক কুমার পাল জানান, পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রথমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালায়। কিন্তু দফায় দফায় হামলার মুখে এক পর্যায়ে তারা গুলি ও কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়তে বাধ্য হন। বেলকুচিতে বতর্মানে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানান জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোকতার হোসেন। ওসি শামসুল হুদা জানান, আসামি ছিনিয়ে নিতে জামায়াত ও বিএনপির কর্মীরা পুলিশের উপর হামলা চালায়। এতে দুই পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। দুই সাংবাদিক আহত এদিকে বেলকুচিতে সংঘর্ষ চলাকালে গুরুতর আহত হয়েছেন বিটিভি’র জেলা সংবাদদাতা ও দৈনিক দোলনচাঁপার চীফ রিপোর্টার গাজী এসএইচ ফিরোজী। তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এছাড়া সংঘর্ষে মাইটিভির জেলা প্রতিনিধি রহমত আলী, বেলকুচি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গাজী ফজলুর রহমানও গুরুতর আহত হন। আহতদের বিভিন্ন ক্লিনিক এবং হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ সময় সাংবাদিকদের ব্যবহূত দুটি মোটর সাইকেল ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ এবং ক্যামেরা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় জেলার কর্মরত সাংবাদিকরা তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা এ ন্যক্কারজনক ঘটনায় দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।