ইসলামী আন্দোলনের মহাসমাবেশে নাস্তিকদের ফাঁসি দাবি

গতকাল রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরের মহাসমাবেশ থেকে ইসলামী আন্দোলনের আমির চরমোনাই পীর মাওলানা মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম আগামী ৫ এপ্রিলের মধ্যে দেশের সকল নাস্তিক-ব্লগার ও মুরতাদদের গ্রেফতার এবং কঠোর শাস্তিসহ তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সরকারকে আল্টিমেটাম দিয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা না নিলে ৬ এপ্রিল আল্লামা আহমদ শফী ঘোষিত ঢাকামুখী হেফাজতে ইসলাম আহূত লংমার্চে অংশ নেবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। এছাড়া ইসলাম অবমাননাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তির আইন সংসদে পাস ও নাস্তিকদের শাস্তির দাবিতে আগামী ২৫ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ঘেরাও করবেন তারা। এছাড়া ৫ দফা দাবিতে বিভিন্ন দেশের রুটে লংমার্চসহ বেশকিছু কর্মসূচি ঘোষণা করেন পীর সাহেব। অবিলম্বে নাস্তিকদের ফাঁসির আইন পাস না করলে যে গণবিস্ফোরণ হবে তা সরকার ঠেকাতে পারবে না বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি। এই মহাসমাবেশে বক্তারা নাস্তিকদের ফাঁসির দাবি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন। তারা বলেন, সংবিধান থেকে মহান আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস তুলে দিয়ে সরকার নাস্তিকতাকে উস্কে দিয়েছে। অবিলম্বে নাস্তিক-ব্লগারদের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসাবে ফাঁসিতে না ঝুলালে জনগণ সরকারকে এই দাবি মানতে বাধ্য করবে। পাঁচ দফা দাবিতে এই মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে সংবিধানের মূলনীতিতে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন, ইসলামের দুশমন নাস্তিক মুরতাদদের শাস্তির আইনি ব্যবস্থা, নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ইসলামী আন্দোলনের জাতীয় মহাসমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন ইসলামী আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য মাওলানা সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী, মুফতি সৈয়দ মোঃ ফয়জুল করীম, মাওলানা নুরুল হুদা ফয়েজী, শাইখুল হাদীস আল্লামা মোস্তফা আল হোসাইনী, মহাসচিব অধ্যক্ষ মাওলানা ইউনুছ আহমাদ, যুুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান, সহকারী মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান, মাওলানা আবদুল হক মুহাদ্দিছ, মাওলানা আব্দুল কাদের, কেন্দ্রীয় নেতা ও নগর সভাপতি অধ্যাপক মাওলানা এটিএম হেমায়েত উদ্দিন, যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা সাদের রহমান সিদ্দিকী, সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ বেলায়েত হোসেন, হাফেজ্জী হুজুরের জামাতা মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ, হাটহাজারী মাদ্রাসার মোহাদ্দেস মাওলানা মুমতাজুল করীম (বাবা হুজুর), ইসলামী আন্দোলনের নেতা মাওলানা সৈয়দ ইসহাক মো. আবুল খায়ের প্রমুখ। পরিচালনায় ছিলেন মাওলানা আহমাদ আবদুল কাইয়ুম, মাওলানা নেছার উদ্দিন, কে এম আতিকুর রহমান ও মাওলানা লোকমান হোসাইন জাফরী। রাজধানীর পল্টন মোড়ে সমাবেশের ঘোষণা দেয়া হলেও পুলিশের পরামর্শ ও অনুমতি সাপেক্ষে মতিঝিল শাপলা চত্বরে বিশাল মঞ্চ তৈরি করে মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম জুুমার নামাজের পর শুরু হলেও সকাল থেকেই ব্যাপক সংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে বক্তব্য ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা পর্ব চলে। জুমার পর সমাবেশ শুরু হলে শাপলা চত্বর থেকে শুরু করে বায়তুল মোকাররম, পল্টন মোড়, প্রেসক্লাব, দৈনিক বাংলা, মতিঝিল, বিজয়নগর, জিরো পয়েন্টসহ গোটা এলাকায় অবস্থান নেয় সারাদেশ থেকে আসা নেতাকর্মীরা। ওদিকে ইত্তেফাক মোড় আর এদিকে বিজয়নগর পর্যন্ত কয়েকশ’ মাইক স্থাপন করা হয়। পুলিশ আগেই ওইসব এলাকার সব রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। পুলিশ আর্চওয়ে বসিয়ে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। চরমোনাই পীর সাহেব বলেন, বর্তমান সরকারের সময়ে দেশে গণতন্ত্রের নামে চলছে স্বৈরতন্ত্র, বিরোধী দল দমনতন্ত্র। দুর্নীতি, অনিয়ম আর নানা সমস্যা বেড়েই চলেছে। ক্ষমতাসীনদের পৃষ্ঠপোষকতায় শিক্ষাঙ্গনে চলছে ক্যাডারদের মহড়া। পাঠ্যপুস্তকে ইসলামের বিকৃতি ও যৌন শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। শিক্ষকরা ইসলামের বিরুদ্ধে কটাক্ষ করছে। ঘটছে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। বর্তমান দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য বিরোধী জেহাদে ঐক্যবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। চরমোনাই পীর বলেন, এদেশে পীর মাশায়েখ ও আলেম ওলামাদের ভূমিকা বেশি থাকলেও বর্তমান সরকার তাদের অবজ্ঞা করছে। অবিলম্বে ইসলামী ব্যক্তিদের গ্রেফতার ও পুলিশি হয়রানি বন্ধ করতে হবে। তিনি আগামীতে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীদের হাত পাখা মার্কায় ভোট দেয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দেশের টুপি-দাড়িওয়ালা সবাই জামায়াত-শিবির না। জামায়াত-শিবিরের নামে টুপি-দাড়ির অসম্মান করা চলবে না। তথাকথিত জিহাদী বইয়ের নাম করে নিরপরাধ মানুষকে গ্রেফতার ও নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী বর্তমান সরকারের মন্ত্রীসভা থেকে নাস্তিকদের বাদ দেয়ার আহবান জানিয়ে বলেন, অবিলম্বে নাস্তিক-ব্লগারদের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে ফাঁসিতে না ঝুলালে জনগণ সরকারকে এই দাবি মানতে বাধ্য করবে। তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় নারী নেতৃত্ব বাদ দেয়ার আহবান জানান। অপর প্রেসিডিয়াম সদস্য মুফতি ফয়জুল করিম বলেন, শাহবাগে বিয়ে ছাড়া যুবক যুবতীরা যেভাবে একত্রে রাত যাপন করেছে তা এদেশের সংস্কৃতি নয়। এটা জানোয়ারের সংস্কৃতি। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কটূক্তিকারীদের ধরতে টিভিতে বিজ্ঞাপন না দেয়া হলেও তাদের আটক করা হয়েছে। তবে আল্লাহ-রাসুলের কটূক্তিকারীদের ধরা হচ্ছে না কেন? অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, কোন নারী নেতৃত্বের কাছে ইসলাম বা ইসলামী আন্দোলন মাথা নত করতে পারে না। এ সরকার হলমার্কসহ বিভিন্নভাবে রাষ্ট্রীয় কোষাগার শূন্য করার ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। তারা এদেশে শান্তির জন্য কাজ করছে না। এ সরকার ইসলাম ও মানবতার দুশমন। ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা না পেলে দেশে শান্তি ফিরে আসতে পারে না। ইসলামী আন্দোলনের সহকারী মহাসচিব মাওলানা আব্দুল কাদের বলেন, এ সরকার মোনাফেকের পরিচয় দিয়েছে। তারা ভোটের আগে নিজেদের মুসলিম দাবি করে বলে, কোরআন ও ইসলামের বিরুদ্ধে কোনো আইন করবে না। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে সংবিধান সংশোধন করে আল্লাহর নাম বাদ দিয়েছে। এতেই তাদের মোনাফেকি প্রমাণিত হয়েছে। সহকারী মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান জাসদ নেতা মাঈনুদ্দিন খান বাদলের সংসদে দেয়া বক্তব্যের প্রতিবাদ করে বলেন, ‘বাদল বলেছেন, হযরত মোহাম্মদ (স.) ধর্মনিরপেক্ষতা করেননি। আমি বাদলকে প্রশ্ন করতে চাই, মোহাম্মদ কি আপনার নির্বাচিত নেতা না আল্লাহর নির্বাচিত নেতা? অথচ কুরআনে বলা আছে, ‘আমি অনেক ধর্ম দিয়েছি, কিন্তু শেষ নবীকে ইসলাম ধর্ম দিয়ে পাঠিয়েছি।’ তিনি বলেন, ৯০ ভাগ মুসলিমের এদেশে কোন ভণ্ডামি চলবে না। এ সরকার নাস্তিকদের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন। আমরা কার কাছে এদের বিচার চাইব। বক্তারা বলেন, ওরা কথায় কথায় বলে, আমরা ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করি। কিন্তু আমরা স্পষ্ট বলতে চাই, আমরা নই, ওরাই ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছে। ভোটের আগে ওরা মাথায় পট্টি বেঁধে মানুষের দ্বারে দ্বারে ভোট চাইছে। সমাবেশ থেকে ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে আরও রয়েছে- মায়ানমারে মুসলিম গণ-হত্যা বন্ধের দাবিতে ৪ এপ্রিল ঢাকাস্থ জাতিসংঘ দূতাবাসে স্মারকলিপি পেশ, মুসলিম গণ-হত্যা বন্ধ এবং মসজিদ মাদরাসা ও মুসলমানদের ঘরবাড়ী জ্বালিয়ে দেয়ার প্রতিবাদে ৮ ও ৯ মে মায়ানমার অভিমুখে লংমার্চ এবং পাঁচ দফা দাবি বাস্তবায়নে জনমত তৈরির লক্ষ্যে- ১৯, ২০, ২১ এপ্রিল ঢাকা থেকে কুয়াকাটা, ১৩, ১৪ ও ১৫ মে ঢাকা হতে তেতুলিয়া এবং ২ ও ৩ জুন ঢাকা টু সিলেট রোডমাচ। এছাড়া ১ মে ঢাকায় শ্রমিক জনতা সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এদিকে জুুম্মার আযানের সময় শাপলা চত্বর থেকে শুরু করে পল্টন, বায়তুল মোকাররম, দৈনিক বাংলা, মতিঝিল, প্রেসক্লাব, বিজয়নগর, জিরো পয়েন্টসহ গোটা এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। পীর সাহেব চরমোনাইর ইমামতিতে রাস্তায় জুম্মার নামাজ আদায় করেন মহাসমাবেশে আগত লাখো জনতা।