বুড়িগঙ্গা তীরে পোশাক শিল্পের নীরব বিপ্লব
প্রকাশ : ২৯ মার্চ ২০১৩, ২২:২২
বুড়িগঙ্গার তীরে ঘটে চলেছে পোশাক শিল্পের নীরব বিপ্লব। এখানে তৈরি পোশাক কমপক্ষে ৩৫টি দেশে রফতানি হচ্ছে। ছোট বড় প্রায় পাঁচ হাজার গার্মেন্টসে তৈরি পোশাক বিক্রি হচ্ছে দেশের বাজারেও। নগদ অর্থে যার পরিমাণ দৈনিক পঞ্চাশ কোটি টাকার ও বেশি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
বুড়িগঙ্গার এক তীরে রাজধানী ঢাকা, অন্য তীরে কেরাণীগঞ্জ উপজেলার আগানগর ও শুভাঢ্যা ইউনিয়ন। আগানগরের ঠিক পশ্চিমেই বাংলার জাপান নামে পরিচিতি পাওয়া জিনজিরা, মোগল আমলের স্মৃতি বিজড়িত জিঞ্জিরা প্রাসাদ। এসব স্থানের ঐতিহাসিক পরিচিতি কালের বিবর্তনে চাপা পড়ে গেলেও বিভিন্ন শিল্পের কারণে এখন আবার জেগে উঠছে কেরানীগঞ্জ।
আগানগর ও শুভাঢ্যায় গড়ে ওঠা ক্ষুদ্র গার্মেন্টস পল্লী খুলে দিয়েছে অপার সম্ভাবনার দুয়ার। স্বাধীনতার পর সীমিত পরিসরে শুরু হওয়া এই গার্মেন্টস পল্লী ধীরে ধীরে ব্যাপকতা লাভ করেছে।
বর্তমানে আগানগর-শুভাঢ্যা গার্মেন্টস পল্লীর অভ্যন্তরীণ পোশাকের প্রায় ৬০ ভাগ চাহিদা মেটাচ্ছে। কেরাণীগঞ্জ গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ও দোকান মালিক সমিতির তথ্যমতে, এখানে দিনে বিক্রি হচ্ছে কমপক্ষে ৫০ কোটি টাকার ও অধিক মূল্যের পোশাক।
মফস্বল শহরগুলোর বিপণিবিতান তো বটেই, রাজধানীর অভিজাত শপিংমলগুলোতেও এখন বিদেশি কাপড়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ক্রেতাদের হাতে হ?াতে উঠছে এখানকার পোশাক। এমনকি রফতানি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ভারত, মিয়ানমার, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, সৌদি আরব, দুবাই, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ ৩৫টি দেশে।
দেশের সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এ ক্ষুদ্র গার্মেন্টস পল্লীর বিকাশে উল্লেখযোগ্য কোন সহযোগিতা নেই সরকারি বা বেসরকারি তরফে। এখানকার ক্ষদ্র ব্যবসায়ীরা নিজেদের একান্ত প্রচেষ্টায় বিভিন্ন প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে এগিয়ে নিচ্ছেন সম্ভাবনাময় এই শিল্পকে।
পাঞ্জাবি, শার্ট, ফতুয়া, স্যুট-ব্লেজার, সব রকমের শীতবস্ত্র, শিশুদের কাপড় থেকে শুরু করে নানা ধরনের পোশাক পাওয়া গেলেও এই ক্ষুদ্র গার্মেন্টস পল্লী বিশেষভাবে বিখ্যাত জিন্স ও গেভার্ডিন প্যান্টের জন্য। আমেরিকা, ইংল্যান্ড, সিংগাপুর, চীন, জাপান, থাইল্যান্ড, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নামিদামি ব্রান্ডের জিন্স ও গেভার্ডিন প্যান্টের আদলে প্রস্তুতকৃত এখানকার প্যান্ট বিদেশি প্যান্ট হিসেবে দেশের বড় বড় শপিংমলে বিক্রি হচ্ছে দেদার। মফস্বলের বিপণী বিতানগুলোতেও অনেক কদর এর।
এক্সপোর্ট গার্মেন্টের ফেব্রিকস কিনে আগানগর-শুভাঢ্যা ক্ষুদ্র গার্মেন্টস পল্লীর কারিগরেরা নিজস্ব আদলে তৈরি করছেন এসব প্যান্ট। এসব ব্যবসায়ীর একটি অংশ আবার বড় পোশাক কারখানার আংশিক ত্রুটিযুক্ত কাপড় বা ঝুট সংগ্রহ করে তৈরি করছেন চমত্কারসব পোশাক।
প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এখানকার গার্মেন্টস পল্লীতে প্রায় ১০ লাখ মানুষ কর্মরত। কাকডাকা ভোরেই আগানগরের নাগরমহল রোড ও শুভাঢ্যার বাঘাবাড়ি রোডের ব্যস্ততা বেড়ে যায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কাপড় কিনতে আসা ব্যবসায়ীদের পদচারণায়। ভাঙ্গাচোরা রাস্তার কারণে প্রতিনিয়তই যানজট লেগেই থাকে। বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষেও থাকে অসংখ্য নৌকার ভিঁড়। সকাল থেকে রাত অবধি চলে পোশাকের বিকিকিনি। কাপড় কাটা, ধোলাই, সেলাইসহ বিভিন্ন কাজে দিনরাত ব্যস্ত থাকেন এ পল্লীর শ্রমিক ও তাদের মালিকরা। পল্লীর ভেতরের রাস্তা গুলোতে হাঁটলেই যেতে চোখে পড়বে প্যান্ট ও অন্যান্য কাপড়ের বড় বড় বোঝা মাথায় নিয়ে শ্রমিকদের পদচারণা।
প্রাপ্ততথ্য মতে, দেশের বৃহত্ তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর মতো এখানে শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা খুব একটা ঘটে না। ক্ষদ্র পুঁজির ব্যবসায়ীরা সারাক্ষণ কারখানা শ্রমিকদের সঙ্গেই লেগে থাকেন দ্রুত কাজ শেষ করার তাগিদে।
আগানগরের নাগরমহল রোডের কলোনি মার্কেটের আমিনুল গার্মেন্টসের মালিক আমিনুল ইসলাম মন্টু (৫২)। মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহগঞ্জ থানার খেতেরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এর আগে জাপানে কাটিয়ে এসেছেন অনেক দিন। দেশে ফিরে কিছুদিন করেছেন কাঠের ব্যবসা। ২০০০ সাল থেকে আগানগরে এসে শুরু করেন ঝুট কাপড় দিয়ে জিন্স তৈরির ব্যবসা।
মন্টু শেখ ইত্তেফাককে বলেন, সাভার ইপিজেড, গাজীপুর, টংগী, নারায়ণগঞ্জ শিল্পাঞ্চল থেকে জিন্সের ঝুট ফেব্রিক্স স্থানীয় সরবরাহকারীদের কাছ থেকে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা মণে সংগ্রহ করে সেগুলোকে প্রথমে সাইজ, মান ও কালার অনুযায়ী ভাগ করি। এরপর সেগুলোকে কাটিং করি। তারপর বিদেশি প্যান্টের আদলে কম্পিউটারাইডজ মেশিনে এমব্রয়ডারি করে দক্ষ দর্জি দিয়ে সেলাই করা হয়। সেলাই ও এমব্রয়ডারির পর সেগুলোকে ওয়াশিং মেশিনে কালার কিংবা বিশেষ অংশে ভিন্ন রূপদান করা হয়। তিনি বলেন, ছেলেদের প্যান্টের চেয়ে লেডিস প্যান্টের চাহিদা অনেক বেশি। ছোট বড় সবার জন্যই এই লেডিস প্যান্টের চাহিদা রয়েছে। উপমহাদেশে আগে ভারতেই এই লেডিস প্যান্টের চাহিদা বেশি ছিল। ধীরে ধীরে বাংলাদেশেও এই চাহিদা বেড়েছে।
মন্টু শেখ বলেন, আমরা সবই পাইকারি বিক্রি করি। আমাদের তৈরি প্যান্ট ১৬০ টাকা থেকে ১২০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাবে। এখান থেকে কিনে নিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন আধুনিক শপিংমলে ১২০০ টাকার জিন্সের প্যান্ট বিক্রি হচ্ছে ২২০০ থেকে ৩৫০০ টাকায়। বিদ্যুত্ স্বল্পতা এই ক্ষুদ্র গার্মেন্টস পল্লীর বিকাশে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে উল্লেখ করে আগানগর-শুভাড্যার ক্ষুদ্র গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা জানান, পুরো গার্মেন্টস পল্লীতে ৩৭ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৭ থেকে ৮ মেগাওয়াট। দিনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিদ্যুত্ থাকে মাত্র ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা। এখানকার একজন ব্যবসায়ীকে যদি বিদ্যুত্ বিল দিতে হয় ৩ হাজার টাকা, তাহলে তাকে জেনারেটর বিল দিতে হয় কমপক্ষে ১৬ হাজার টাকা। জেনারেটরে একটি ফ্যানের জন্য ৭০০ টাকা, লাইট ৭০০ টাকা, সেলাই মোটর ১৫শ’ টাকা, আয়রন মেশিনের জন্য ৫ হাজার টাকা বিল দিতে হয়। ব্যবসায়ীরা জানান, অনেক সময় কাপড় অর্ধেক ওয়াশ করার পর বিদ্যুত্ চলে গেলে ওই কাপড়ের বাকি অংশ ওয়াশ করতে না পারায় রঙ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে সেসব কাপড় বিক্রির অযোগ্য হয়ে পড়ে।
শুভাঢ্যার শহীদ দেলোয়ার হোসেন রোডের জেলা পরিষদ মার্কেটের নিউ জিতু গার্মেন্টসের মালিক মো. জানে আলম বলেন, আগের বছরগুলোতে বিদেশি কাপড় বিক্রি বেশি হলেও এবার এখানকার কাপড়ের মান ভাল হওয়ায় দেশি কাপড়ের প্রচুর চাহিদা তৈরি হয়েছে। আগানগর-শুভাঢ্যার নাম না বললেও রাজধানীর পলওয়েল, সিটিহার্ট, এলিফ্যান্ট রোড, হাতিরপুল ইস্টার্ন প্লাজা, মোতালেব প্লাজা, রাইফেল স্কোয়ার, বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সসহ অভিজাত বিপণী বিতানগুলোতে আমাদের তৈরি জিন্স প্যান্টসহ অন্যান্য কাপড় পাওয়া যাবে।
তিনি জানান, শুধু দেশেই নয়, কোন কোন ব্যবসায়ী মালয়েশিয়া, সিংগাপুর, থাইল্যান্ড, ভারত, মিয়ানমার নেপাল, শ্রীলঙ্কা, দুবাই, আবুধাবি, কাতার, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশেও পাঠাচ্ছে আমাদের তৈরি কাপড়। এছাড়া দেশে তৈরি উন্নতমানের শার্ট, প্যান্ট, বেবী স্যুট, জিন্স প্যান্ট, লন্ডন, আমেরিকা ও ইউরোপের নানা দেশে পাঠানো হচ্ছে। এসব দেশে রফতানি করা প্রতিটি শার্ট তিন হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়ে থাকে পাইকারি দরে। সংশ্লিষ্টরা জানান, এসব তৈরি পণ্য সাধারণত বিদেশে রফতানির উদ্দেশ্যেই তৈরি হয়ে থাকে।
মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার মেদেনীমন্ডল গ্রামের বাসিন্দা জিন্স প্যান্ট তৈরির কারিগর রবিউল হাসান রণি ইত্তেফাককে বলেন, এখানে যেমন রিজেক্ট কাপড় দিয়ে প্যান্ট বানানো হয়, তেমনি নতুন কাপড় দিয়েও প্যান্ট বানানো হয়। আমরা জাপান, চীন, থাইল্যান্ডের তৈরি প্যান্টের মত একই রকম প্যান্ট হুবহু তৈরি করতে পারি। অনেক সময় বিদেশি প্যান্টের চেয়েও আমাদের ফিনিশিং ভালো হয়।
তিনি বলেন, একটি লট সম্পূর্ণ করতে প্রায় ১৫ থেকে ২০ দিন লাগে। এই গার্মেন্টস পল্লীতে এক পিস জিন্সের প্যান্টের কাপড় কাটার জন্য কাটিং মাস্টাররা প্রোডাকশন অনুসারে ৫ থেকে ৬ টাকা করে পান। অপারেটরদের বেতন মাসিক ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা, কারিগররা পান একটি প্যান্টের জন্য ৩০ থেকে ৫০ টাকা আর নারীরা বোতাম লাগানো কাজের জন্য পান ৪ থেকে ৬ হাজার টাকা।
আগানগর-শুভাঢ্যা গার্মেন্টস পল্লীর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সংগঠন কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ও দোকান মালিক সমিতি। সমিতির সভাপতি মিজানুর রহমান এই পল্লীর বিভিন্ন সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে সম্ভাবনাময় এই পল্লীর বিকাশে সরকারের কাছ থেকে কিছু সহযোগিতা প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।
সমিতির সভাপতি মিজানুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, আমাদের তৈরি কাপড়ের মান দিন দিন ভাল হচ্ছে। তাই বিগত সময়ের চেয়ে চাহিদাও অনেক বেশি। আমাদের গার্মেন্টস পল্লীতে ১০ লাখ শ্রমিক কাজ করে। এখানে মালিক-শ্রমিকের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক থাকায় কোন শ্রমিক অসন্তোষ নেই। আমরা অনেক ঝুঁকি নিয়ে এই ব্যবসা করে দেশের অভ্যন্তরীণ পোশাকের শতকরা ৬০ থেকে ৭০ ভাগ চাহিদা মেটাচ্ছি। অনেক সময় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ আমাদের কাছ থেকে মাল নিয়ে উধাও হয়ে যান। তখন সমস্যায় পড়তে হয় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের।
তিনি বলেন, কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ও দোকান মালিক সমিতির নিবন্ধিত ৫ হাজার ব্যবসায়ী রয়েছেন। নিবন্ধন ছাড়াও রয়েছেন আরও ৫ হাজার। বহু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও প্রতি ঈদ মৌসুম ছাড়াও এখানে প্রতিদিন কমপক্ষে ৫০ কোটি টাকার পোশাক বিক্রি হয়। সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিলন হোসেন খান বলেন, সরকার দেশের রফতানিমুখী বৃহত্ গার্মেন্টসের প্রতি বেশি আন্তরিক। দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখলেও আমাদের ক্ষুদ্র পোশাক তৈরিকারকদের দিকে সরকার নজর দিচ্ছে না। রফতানিমুখী বড় গার্মেন্টসের জন্য বিদেশ থেকে এক্সেসরিজ আনতে ট্যাক্স ফ্রি সুবিধা থাকলেও আমাদের সে সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। এ শিল্পের জন্য বিদ্যুত্-গ্যাসের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি হলেও আমরা পাচ্ছি প্রয়োজনের তুলনায় খুবই স্বল্প। যোগাযোগ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুবই খারাপ।
এক্সেসরিজ আনতে ট্যাক্স ফ্রি সুবিধা, বিদ্যুত্-গ্যাস সুবিধা পর্যাপ্তকরণ, সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের সহজশর্তে ঋণ সুবিধা প্রদান ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করা হলে আগানগর-শুভাঢ্যা ক্ষুদ্র গার্মেন্টস পল্লী কেবল দেশেই নয়, গোটা এশিয়ার মধ্যে বিখ্যাত হয়ে উঠতে পারে, এমন আশাবাদ ও স্বপ্ন মিলন হোসেন খানসহ এই অঞ্চলের প্রতিটি গার্মেন্টস মালিকের।