‘ডিজিটাল’ নামক বিভ্রান্তির বেড়াজালে
প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০১৩, ১৯:১৮
দুই বাংলার চলচ্চিত্র বিনিময়, কলকাতার ছবির অবৈধ ডিভিডিতে সয়লাব হওয়া বাংলাদেশ, কলকাতায় আমাদের দেশীয় চ্যানেল না দেখতে পারা—সবমিলিয়ে বাংলাদেশি চলচ্চিত্র সংকট এখন চরমে। ঢালিউড নিয়ে এই প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণ থাকছে ধারাবাহিক প্রতিবেদনে। আজ এর তৃতীয় কিস্তি
আমাদের চলচ্চিত্র নিয়ে এখন যে কেউ কোনো টকশোতে বসলেই নানা উপদেশ বাতলে দেওয়ার চেষ্টায় থাকেন। আপাতদৃষ্টিতে নিজের কোনো সাফল্য না থাকলেও অন্যের ভুল ধরতে সবাই সেরা। আর চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে ধারা-প্রথা এখন কেউ বিশ্বাস না করলেও নিজেদের কাজের মানেই এক ধরনের ধারা-প্রথা স্থায়িত্ব পেয়ে গেছে ইন্ডাস্ট্রিতে। ইদানীং এই সব ধারা বিভাজনে তৈরি হয়েছে নতুন ‘ডিজিটাল’ নামের আরেক ধারা। কেউ ডিজিটাল, কেউ এনালগ, কেউ আল্ট্রা ডিজিটাল। ভাবখানা এমন—ছবির পোস্টারে ‘ডিজিটাল’ তকমাটি লাগালেই সে ছবি দেখতে হুড়মুড়িয়ে হলে দর্শক চলে আসবে। কিন্তু দর্শকদের ডিজিটাল শব্দে কোনো আলাদা কৌতূহল তৈরি হয় কি? কিংবা কাকে আমরা বলব ‘ডিজিটাল’ ছবি? কোনটা ডিজিটাল না? এসব তত্ত্বতালাশ করার জন্যও লেখাটি নয়। আর দূর অজপাড়াগাঁয়ের সিনেমাপ্রেমীর তো ডিজিটালের ব্যাখ্যা জেনে ছবি দেখতে হয় না। তাই এই বিষয়টি স্রেফ বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুই না। প্রযুক্তির সাথে সাথে আমাদের চলতেই হবে। তাই এখন এনালগ ছবি বলতে কিছু নেই। থাকতেও পারে না। চলচ্চিত্রে শুধু আছে ‘ভালো ছবি এবং মন্দ ছবি।
লেখার প্রথম কিস্তিতেই আমি বলেছি, এই ডিজিটাল ধারার স্রোতে পরিচালক সমিতিতে প্রায় একশত ছুঁই ছুঁই চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে অভিষিক্ত হয়েছেন। প্রশ্ন উঠতে পারে—এরা কারা? কোত্থেকে এলেন? দেশে কি তবে এত এত চলচ্চিত্র পরিচালক ঘুমিয়েছিলেন। হঠাত্ তাদের ঘুম ভেঙেছে। আর সাত সকালে উঠেই পরিচালক সমিতিতে নাম লেখাতে শুরু করেছেন! আদপে কিন্তু তা নয়। খোঁজ নিলেই জানা যাবে, তারা প্রায় সকলেই বিগত দিনের দুয়েকটি টিভি নাটকের পরিচালক। কেউ কেউ দু-তিনটে ছবি নির্মাণ করবেন বলে কিছু শুটিং করে সমানে চিত্র পরিচালক হিসেবে টক শো গরম করে চলেছেন। অনবরত বলছেন, এই করলে এই হবে... অমুকে কাজটা ভালো করছে... এটা মোটেই ঠিক নয়... ইত্যাদি। কিন্তু তার নিজের চলচ্চিত্রের খতিয়ানে দেখা যাবে বিরাট শূন্যতা। এই ডিজিটাল বিভাজনটা এখন প্রকট। এই টিভি পরিচালকেরা যখন দেখলেন একটি টেলিফিল্ম নির্মাণের চেয়ে কিছু বাজেট বাড়ালেই এই ডিজিটাল ফিল্ম বানানো যায়, তাইলে কেন ফিল্ম না। আর ছবির পাত্র-পাত্রী হিসেবে তারা প্রত্যেকের ঘরানার নাটকের আর্টিস্টকে বেছে নিচ্ছেন। তাই দুদিন পরপরই বিভিন্ন টিভি অভিনেত্রীদের মুখে এখন শোনা যাচ্ছে, তারা অমুক ফিল্মে কাজ করবেন। কেউ ‘আগ্রহী’ শব্দের হেডিংয়ে অন্তর্ভূক্ত হচ্ছেন। যারা এতদিন বাংলা চলচ্চিত্রের ব্যাপারে নাক সিঁটকিয়েছেন, তারাই এখন উত্সাহী হয়েছেন চলচ্চিত্র নিয়ে। এটা অবশ্যই আশার কথা। কিন্তু যে সময় তারা আশাবাদী হয়ে উঠলেন। সেই তারকাদের স্বল্প বাজেটের চলচ্চিত্র দেখে দর্শকেরা যে আরও হতাশা হয়ে পড়ছেন। এখানে একটা বড় বিভ্রান্তি আর জটলা তৈরি হচ্ছে। যা এফডিসি-নির্ভর মূলধারার চিত্র পরিচালকেরা কখনোই চলচ্চিত্র হিসেবে মেনে নেয় না। আর ছবির জনপ্রিয়তার প্রশ্নেও এটি সর্বজনগ্রহণযোগ্য চলচ্চিত্র হতে পারছে না। এর বাইরে ইদানীং কেউ কেউ দর্শকদের জন্য চলচ্চিত্র নয়, দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা বিষয় নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে কিছু প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সহায়তায় আত্মপ্রচারটা কনফার্ম করে, কী করে সহজ উপায়ে বাইরের দেশ থেকে কিছু অখ্যাত অ্যাওয়ার্ড আনা যায় , সেই চেষ্টায় ব্রত থাকেন। এখন আমাদের দেশে আহমেদ জামান চৌধুরীর মতো ক্ষুরধার চিত্র সমালোচক নেই যেমন, তেমনি মিডিয়াও যেন প্রমোশনাল বিনোদন সাংবাদিকতায় ব্যস্ত থেকে চলচ্চিত্রের ইমেজকে ক্রমাগত তলানির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই বিভাজন বৈষম্য দূর করার একটিই উপায় মূল ধারার চলচ্চিত্রের রেকর্ড সাফল্য। ছোটপর্দার ‘ফার্স্ট ডেট’-এর মতো অশ্লীল এবং ‘ফোর টুয়েন্টি’র মতো ভাষা বিকৃতির নাটক নির্মাণ করে যারা নাটক মাধ্যমকে কলূষিত করেছেন বারংবার তারাই এখন চলচ্চিত্রকে ধ্বংসের পর্যায়ে নিয়ে যেতে ব্রতী হয়েছেন। কিছু কিছু মিডিয়া তাদের সাফাই গাইছেন। ফলে এখানেও সাধারণ দর্শক আর মিডিয়ার ভেতর আরেক বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। আর মিডিয়াতেও চলচ্চিত্র নিয়ে দীর্ঘকালের নেতিবাচক লেখালেখি ও মনোভাবও চলচ্চিত্রকে সাফল্য থেকে নিয়ে গেছে বহুদূরে।
এদিকে জ্যাজ মাল্টিমিডিয়া নামের একটি প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি মালিকানায় অর্ধশত ডিজিটাল প্রজেকশন করার উদ্যোগ নিলেও তারা নিজেদের চলচ্চিত্র প্রমোটের ব্যাপারেই উত্সাহী। ফলে বিষয়টি আর সার্বজনীন হয়ে ওঠেনি। অন্যের ছবি তাদের প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রদর্শন করতে হলে চড়ামূল্যে সেই প্রতিষ্ঠানকে শতকরা হারে টাকা দিতে হবে, সেক্ষেত্রে সেই শর্তেও রাজি না জ্যাজ। ফলে অধিকাংশ চলচ্চিত্রকাররা জ্যাজের এই পদ্ধতিতে ছবির বিপণনের পক্ষে থাকছেন না। তাই সকলের কাছেই এখন একটাই দাবি সুষ্ঠু নীতিমালা তৈরি করে সরকারি ব্যবস্থায় বিষয়গুলোর সুরাহা করা।
(আগামীকাল থাকবে ‘প্লে-ব্যাকের হালচাল’ নিয়ে )