নাশকতার চেষ্টা :চার পাকিস্তানি নাগরিকসহ ১৬ জন গ্রেফতার

রাজধানীতে বড় ধরনের নাশকতা ঘটানোর চেষ্টার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে চার পাকিস্তানি নাগরিকসহ ১৬ জনকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে হাত বোমা, ১ কোটি ২৯ লাখ ভারতীয় জাল রূপী, ৪টি পাকিস্তানি পাসপোর্টসহ অন্যান্য মালামাল। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে রয়েছেন জামায়াত নেতা ডা. ফরিদউদ্দিন আহমেদ, ফরিদউদ্দিন মাসুদ, মিজানুর রহমান, মাহফুজুর রহমান, পাকিস্তানি নাগরিক সাঈদ উদ্দিন, মোহাম্মদ ফারহান, রুবিনা বেগম ও নার্গিস। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ নগরীর কাঁঠালবাগান, নিকুঞ্জ ও বংশাল থেকে শুক্রবার রাতে তাদের গ্রেফতার করে। এ নিয়ে তিন থানায় তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। গতকাল পুলিশ তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নিয়েছে। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি (উত্তর) মোল্লা নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, গ্রেফতারকৃতরা সবাই একই চক্রের সদস্য। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বড় ধরনের নাশকতা ঘটিয়ে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে গতকাল প্রেস বিফিংয়ে ডিএমপি কমিশনারের মুখপাত্র জয়েন্ট কমিশনার (ডিবি) মনিরুল ইসলাম জানান, গ্রেফতার-কৃতদের প্রধান হোতা ডা. ফরিদউদ্দিন আহমেদ। তিনি পড়াশুনা করেছেন সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজে। সেখানে থাকা অবস্থায় তিনি ছিলেন মেডিক্যাল কলেজ ছাত্রশিবিরের সভাপতি। পরে তিনি সিলেট মহানগর জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তীতে তিনি মাদারীপুর জেলা জামায়াতের আমির ছিলেন প্রায় ১২ বছর। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি জামায়াতের পক্ষে প্রার্থীও হয়েছিলেন। জয়েন্ট কমিশনার আরো জানান, হরকাতুল জিহাদ, হরকাতুল মুজাহিদীনসহ যেসব জঙ্গি কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছিল তাদের আবার চাঙ্গা করার চেষ্টা করেন ডা. ফরিদউদ্দিন আহমেদ। তিনি তার অনুসারীদের কাছে ‘তাত্ত্বিক গুরু’ হিসেবে পরিচিত। তিনি দেশে বড় ধরনের নাশকতা সৃষ্টির জন্য জঙ্গিদের সংগঠিত করার চেষ্টা করেছিলেন। মহানগর পুলিশের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মিজানুর রহমান, মাহফুজুর রহমান, সজল এবং তানভীর সোহেলদের ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে বাসা ভাড়া করে দেন ডা. ফরিদউদ্দিন। বাসার ভাড়া পরিশোধও করতেন তিনি। এরা আশপাশের লোকজনকে পরিচয় দিতেন সাংবাদিক ও শেয়ার ব্যবসায়ী হিসেবে। জঙ্গি তত্পরতা চালানোর জন্য তারা অস্ত্র, বোমা সংগ্রহের চেষ্টার পাশাপাশি চন্দ্রিমা উদ্যান, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ফ্রি এক্সারসাইজ এবং কারাতে শিক্ষার পাশাপাশি নিজেদের জিহাদের উপযোগী করে গড়ে তুলতে থাকে। ডা. ফরিদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই জঙ্গিদের উদ্দেশ্য ছিল ক্ষুদ্র অস্ত্র এবং বোমা সংগ্রহ করে ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ডাকাতি করে অর্থ যোগাড় করা এবং অর্থ দিয়ে দেশব্যাপী ক্যাডার সংগ্রহ এবং রসদ সংগ্রহ করে মজুদ করা। একই সাথে দেশের বিভিন্ন ভিআইপি ও ভিভিআইপিদের যাতায়াতের পথে, বক্তৃতারত অবস্থায় উন্মুক্ত স্থানে হত্যা করার মাধ্যমে দীর্ঘ মেয়াদে দেশে খেলাফতের রাজত্ব কায়েম করা। এই উদ্দেশ্যে তিনি আফগান ফেরত বাংলাদেশি মুজাহিদ ফরিদউদ্দিন মাসুদ-এর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। গ্রেফতারকৃত শিবিরের সাবেক ক্যাডার মিজানুর রহমান গাইবান্ধার মতিন মেহেদীর মাধ্যমে ‘আল্লাহর দলে’ যোগ দিয়ে ঢাকা বিভাগের দায়িত্বশীলের ভূমিকা পালন করেন। মতিন মেহেদী ধরা পড়ার পর মিজান আবার পড়াশুনায় ফিরে এসে ২০০৬ সালে এইচএসসি পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। তবে পড়াশুনার পাশাপাশি এমএলএম কোম্পানির দালালি শুরু করে। ২০১২ সালে ৬০ লক্ষ টাকা নিয়ে আত্মগোপনে চলে যায়। আত্মগোপনে থাকাকালে ২০১২ সালের নভেম্বর মাসের শেষ দিকে ডা. ফরিদউদ্দিনের সাথে মিজানের পরিচয় হয়। পূর্বের শিবিরের রাজনীতি এবং আল্লাহর দলের অভিজ্ঞতার আলোকে নতুন খেলাফতি জঙ্গি তত্পরতা শুরু করার জন্য বেকার যুবক, ছাত্র এবং শিবিরের ক্যাডারদের একত্রিত করার জন্য চেষ্টা চালাতে থাকে। তাদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়ার দায়িত্ব পড়ে আফগান ফেরত বাংলাদেশি মুজাহিদ ফরিদউদ্দিন মাসুদ এবং সিলেটি একজন কারাতে মাস্টারের ওপর। ডা. ফরিদ এবং তার সামরিক কমান্ডার ফরিদউদ্দিন মাসুদ কাডারদের প্রশিক্ষিত করে তোলার জন্য পার্শ্ববর্তী একটি মুসলিম দেশ থেকে অস্ত্র-গুলি সংগ্রহের জন্য পাকিস্তান ফেরত আ. খালিদ ওরফে আ. মান্নানকে চেকের মাধ্যমে ৬ লক্ষ ১০ হাজার টাকা প্রদান করেন। গ্রেফতারকৃত আ. খালিদ জানান যে, অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টার পাশাপাশি তিনি পাকিস্তান থেকে ভারতীয় জাল রূপী বাংলাদেশে সরবরাহ করে থাকেন। তার দেয়া তথ্যমতে নিকুঞ্জ-২ এলাকার একটি বাসা থেকে ৬৬ লক্ষ জাল ভারতীয় রূপী উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতার করা হয় জাল রূপীর ব্যবসায়ী মোস্তফা, মামুনুর রশীদ এবং তার স্ত্রী ডলি আক্তার, মো. আবুল বাশার, রেজাউল করিম এবং রোকসানা বেগমকে। তাদের দেয়া তথ্য মতে বংশালের বায়তুস সামীর আবাসিক হোটেলে অভিযানে ৪টি পাকিস্তানি পাসপোর্ট, চার হাজার নগদ পাকিস্তানি রূপী, চারশ মার্কিন ডলার, ভারতীয় ৬৩ লক্ষ জাল রূপীসহ গ্রেফতার করা হয় পাকিস্তানি নাগরিক সায়িদ উদ্দিন, মোহাম্মদ ফারহান, রুবিনা বেগম এবং নার্গিস আক্তারকে। ডিসি ডিবি মোল্লা নজরুল ইসলামের সার্বিক নির্দেশনায় অভিযান চালান এডিসি ডিবি মশিউর রহমান, সিনিয়র এসি মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম, সিনিয়র এসি বাকীবিল্লাহ এবং এসি একেএম মাহবুবুর রহমান।