ছেঁউড়িয়ায় সাঙ্গ হলো লালন মিলনমেলা
সোহেল হাবিব, কুমারখালী (কুষ্টিয়া) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০১৩, ২২:৪৪
গতকাল সাঙ্গ হলো ভবের হাটের সাধু-ভক্তের মিলনমেলা। আসছে পহেলা কার্তিক মহামতি লালন শাহের মৃত্যুবার্ষিকীতে আবার দেখা হবে এই আশা বুকে বেঁধে সাঁইজির ধাম ত্যাগ করতে শুরু করেছেন সাধু-ভক্তরা। দোল পূর্ণিমা উপলক্ষে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়া লালন মাজার চত্বরে অনুষ্ঠিত হলো পাঁচদিনব্যাপী লালন স্মরণোত্সব। দোল পূর্ণিমার তিথিতে প্রতি বছর এখানে উত্সবে মেতে ওঠেন লালন ভক্ত-শিষ্য অনুসারীরা। উত্সবের শেষ দিনে গতকাল শনিবার দেশ-বিদেশের হাজার হাজার সাধু-ভক্ত ও অনুসারীরা লালনের গান গেয়ে মাতিয়ে রাখেন দর্শক-শ্রোতাকে।
সমাপনী দিনে সাধুরা গলা খুলে গাইলেন ‘মিলন হবে কতদিনে, আমার মনের মানুষের সনে’, ‘বাড়ির পাশে আরশীনগর, সেথা এক ঘরপড়শী বসত করে’, ‘যেখানে সাঁইর বারামখানা’, ‘কে বোঝে তোমার অপার লিলে, মানুষগুরু নিষ্ঠা যার’, ‘জাত গেল জাত গেল বলে, একি আজব কারখানা’, ‘কি সন্ধানে যায় সেখানে মনের মানুষ যেখানে’সহ অসংখ্য গান। বাদ্যের তাল আর সাধুর কণ্ঠে গাওয়া গান শুনে উদাস হয় পড়েন দর্শক-শ্রোতা। স্মরণ উত্সবে দেশের বিভিন্নস্থান থেকে হাজার হাজার লালন-ভক্ত ও অনুসারীরা ছেঁউড়িয়ায় এসে জাত, কুল, ধর্ম, গোত্র ভুলে একে-অপরের সঙ্গে ভাব জমিয়েছিলেন। আয়োজকদের দাবি, এ বছর মেলায় এত লোকের আগমন ঘটেছিল যা গত পাঁচ বছরের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। সারাদিনই লোকজনের সমান আসা-যাওয়া। যেসব রাস্তা ছেঁউড়িয়ায় এসে মিশেছে, প্রতিদিন তার সবকটিতেই নেমেছিল মানুষের ঢল। সব বয়সের নারী-পুরুষের মিলনমেলায় পরিণত হয় আখড়াবাড়ি।
বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ জীবিত থাকাকালে ফাল্গুনের শেষে দোল পূর্ণিমার তিথিতে প্রতি বছর এই উত্সব পালন করতেন। ১৮৯০ সালে লালন সাঁই ছেঁউড়িয়ায় তিরোধানের পর থেকে তাঁর মাজার চত্বরে ভক্ত ও অনুসারীরা সমবেত হয়ে এই স্মরণ উত্সব পালন করে আসছেন। মহামতি লালনের প্রতি এক উদাসী টান ও আত্মার শান্তির জন্যই লালন-ভক্ত নিজেরাই দিনক্ষণ ঠিক রেখে বছরে দোল উত্সব ও তিরোধান দিবসে ছুটে আসেন সাঁইজির মাজারে।
বৃটিশ শাসকগোষ্ঠীর নির্মম অত্যাচার সাধারণ মানুষের জীবনকে যখন বিষিয়ে তুলেছিল, ঠিক সেই সময়ই সত্যের পথ ধরে, মানুষগুরুর দীক্ষা দিতেই সেদিন মানবতার পথ প্রদর্শক হিসাবে বাউল সম্রাট লালন শাহ’র আবির্ভাব ঘটে কুমারখালীর ছেঁউড়িয়াতে। লালনের জন্মস্থান নিয়ে নানা মত থাকলেও নির্ভরযোগ্য বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় লালন ফকির ১৭৭৪ সালে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার চাঁপড়া ইউনিয়নের ভাঁড়রা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত। যৌবনকালে পুণ্য লাভের জন্য তীর্থ ভ্রমণে বেরিয়ে তার যৌবনের রূপান্তর ও সাধন জীবনে প্রবেশের ঘটনা ঘটে বলে জানা যায়। তীর্থকালে তিনি বসন্ত রোগে আক্রান্ত হলে তার সঙ্গীরা তাকে ত্যাগ করেন।
লালন ভক্ত মলম শাহ্ আখড়া তৈরির জন্য ষোল বিঘা জমি দান করেন। দানকৃত ঐ জমিতে ১৮২৩ সালে লালন আখড়া গড়ে ওঠে। প্রথমে সেখানে লালনের বসবাস ও সাধনার জন্য বড় খড়ের ঘর তৈরি করা হয়। সেই ঘরেই তার সাধন-ভজন বসতো। মৃত্যুর পর লালনের সমাধি হয় তাঁর বসতঘরের মাঝখানে। ১৯৬২ সালে কুষ্টিয়ার তত্কালীন জেলা প্রশাসক কিউজি আহাদ, দেবী প্রসাদ চক্রবর্তী (কানু বাবু) ও মোজাম্মেল হকের (কেরু মিয়া) উদ্যোগে লালনের মাজার উন্নয়ন কাজ শুরু ও মূল গেট নির্মাণ হয়।
প্রথমে লালন আখড়াবাড়ি, দ্বিতীয়ত ১৯৬২ সালে লালন লোক- সাহিত্য কেন্দ্র ও পরে ১৯৭৬ সালে লালন একাডেমি নামকরণের মধ্যদিয়ে এখানে কাজ-কর্ম পরিচালিত হয়।
লালন একাডেমি ভবনের নিচতলায় রয়েছে লালন মিউজিয়াম, দ্বিতীয় তলায় লাইব্রেরি, তৃতীয় তলায় অফিস এবং চতুর্থ তলায় রয়েছে লালন সঙ্গীত একাডেমি। মিউজিয়ামে রয়েছে লালন সাঁইয়ের শিষ্যবৃন্দের তামার বিশাল ডেগচি, পিতলের হুক্কা, পিতলের করঙ্গ, হীরু শাহের ব্যবহূত একতারা, লালন সাঁইয়ের ঘরে ব্যবহূত দরজা। মহামতি লালনসহ মোট ৩২টি সমাধি আছে। এর মধ্যে ১৪ জন তাঁর নিজ হাতে মুরিদ, ১ জন প্রশিষ্য আর বাকি অনুসারীর সমাধি।