সাইকেল আর ওদের স্বাধীনতা

কিছু মেয়ে তাদের দৈনন্দিন জীবনে সাইকেলকে বাহন হিসাবে বেছে নিয়েছে। তাদেরকে সহযোগিতা করছে পুরুষ। শহরে নতুন একটি দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে তাদের যৌথ প্রচেষ্টায়। তারা চায় ২০১৫ সালের মধ্যে দেশের ৫ শতাংশ মানুষ পরিবেশবান্ধব বাহন সাইকেল ব্যবহার করবেন। সমাজের প্রতিকূলতা পেছনে ফেলে যারা এই কাজে এগিয়ে এসেছেন। এমনই স্বাধীনচেতা কয়েকজকে নিয়ে লিখেছেন— রাবেয়া বেবী ‘শাড়ি পরে যেদিন আমি প্রথম রাস্তায় বের হই সেদিন অন্যরা যেমন আমাকে দেখে অবাক হয়েছিলো তেমনি আমিও কিছুটা ভীত ছিলাম। তারপর এক এক করে অনেকবার শাড়ি পরে সাইকেল নিয়ে বেরিয়েছি’- বলছিলেন তানজিন চৌধুরী। ‘বিয়ে বাড়িতে যাবো কোন বাহন নেই। ঠিক করলাম সাইকেলেই যাবো। একটু বেশি সাজগোজ করে সাইকেলে যেতে আমার খারাপ লাগেনি। যদিও অন্যরা দেখে চোখ কপালে তুলেছিলেন। আমিতো ঠিক পৌঁছেছিলাম’- বলছিলেন ফাহমিদা খানম। ‘সবাই নিষেধ করে আমাকে প্রথমত মেয়ে, পরে নিরাপত্তার জন্য। আমি কেন সাইকেলে নিরাপদ নই তা সাইকেল না চালিয়ে কাউকে বোঝাতে পারবো না। তবে পরিবার আমাকে সহযোগিতা করেছে। আমি এখন নিয়মিত সাইকেলেই চলি’ -রেহনুমা মমতাজ ভাবনা। এভাবেই সাইকেল নিয়ে তাদের অভিজ্ঞতার কথা বলেন। মেয়েদের সাইকেলিং: শুধু এই তিনজন নন, তাদের বন্ধু প্রায় ৩৫জন মেয়ে নিয়মিত সাইকেল নিয়ে বের হচ্ছেন ঢাকার রাস্তায়। অতিক্রম করেছেন সব প্রতিকূলতা। আজ আর তাদের পাড়া-প্রতিবেশীরা তাদের দিকে অবাক হয়ে তাকান না, যেমনটা প্রথমে হতো। আর তারা ভাবেন সাইকেল মেয়েদের অনেক ঝামেলা থেকে বাঁচায়। বাসের বিরক্তিকর পরিস্থিতি এড়ানো, মেয়েরা ধৈর্যশীল বলে টিজ শুনে পাশ কাটিয়ে যাওয়া নিরাপদ, আর সময় মতো গন্তব্যে পৌঁছনো যায়। ব্যাস, সাইকেলই বাহন। বিডি সাইক্লিস্ট: তারা একটি সংগঠনের মাধ্যমে সংগঠিত হয়ে পথে নেমেছেন। বিডি সাইক্লিস্ট ২০১১ সালের মে মাসে শুরু হওয়া একটি ফেইসবুক ভিত্তিক সংগঠন। এর প্রতিষ্ঠাতা মোজাম্মেল হক। শহরে যানজট এড়াতে, সময় বাঁচাতে নিজের বাহন হিসাবে সাইকেলকে বেছে নেন। তার সাথে যোগ দেয় বন্ধুরা। দু-একজন করে দশ-বারোজন। এখন তাদের সদস্য ১০ হাজার। তার মধ্যে প্রায় সমান উত্সাহ নিয়ে যোগ হয়েছেন নারীরা। নিয়মিত এ সংগঠনে ১০০ থেকে ১৫০ জন নারী সদস্যরা তাদের বিশেষ আর সপ্তাহ ভিত্তিক সাইকেলের নানা আয়োজনে অংশ নেয়ার পাশাপাশি প্রতিদিন বাহন হিসাবে সাইকেল ব্যবহার করেন। এই সদস্যদের মধ্যেও আছেন ৩৫ জন নারী। পারদর্শিতাপূর্ণ প্রতিযোগিতা জশিলা, মাসের শেষ শুক্রবার বাইট ফ্রাইডে অংশগ্রহণ করেও তারা সফল হয়েছেন। আরও সফল হয়েছেন শ্বশুরবাড়ির সম্মতি নিতেও। নিজেকে বদলাতে হবে: আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় একজন নারী বেড়াতে যাওয়া, অফিস করা, বাজার করা আর ছেলেদের সাথে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে নিজের ভালো লাগাকে প্রাধান্য দেয়া সত্যি কম কথা নয়। তাদের একজন ফাহমিদা বলেন- অনেক বেশি কিছুও নয়। কারণ আমি আমার দেশের মানুষের কাছ থেকেইতো শুনি ওরা আমাদের কারো ভাই কারো আত্মীয়, এখানে বিরক্ত না হয়ে সময় থাকলে আমি গিয়ে তার সাথে কথা বলি। তাদের বোঝাই আমি তো তোমার কোন ক্ষতি করছি না। তখন তারা বোঝে। তবে এই বোঝানো জায়গাটাই নেয় না ভাবনা। তিনি বলেন, রাস্তায় মোটর বাইক চালকেরা আমাদের সাথে প্রতিযোগিতা করে আমি তখন আরও ধীরে চালাই তখন সে চলে যায়। তেমন করে যে আমাকে টিজ করে আমি তাকে গুরুত্ব দেই না। আবার যে পরিবার আমার নিরাপত্তার জন্যই নিষেধ করেছিলো আজ তারাই অল্প সময়ে প্রয়োজনের জিনিসটি আনতে ফোন করছেন, বলেন ফাহমিদা। তানজিনের মতে আমি আমার অফিসের বন্ধুদের সাইকেলের পক্ষে যুক্তি দেখাই। আমিতো কোন খারাপ কাজ করছি না। মেয়েদের বিশেষ সাইকেলে মেয়েদের পোশাকে অনায়াসে সাইক্লিং সম্ভব। ভাবনা বলেন, আমরা সেই সমাজে বাস করছি যেখানে মেয়ের ভালো লাগাকে বিবেচনা করে পরে। আজ হরতালের দিনগুলোতে আমি যখন সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ি তখন অনেকে ভালোভাবে দেখে। একদিন একটি মেয়ে রাস্তা পার হতে ভয় পাচ্ছিল। তার সঙ্গী আমাকে সাইকেল নিয়ে দেখিয়ে থাকে উত্সাহিত করেছে। এমন উদাহরণও তো আছে। মেয়েদের নিজের পছন্দকে আগে বিবেচনা করতে হবে। তানজিন বলেন, সাইকেল আমাদের পজেটিভ এনার্জি দেয়। ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে চাই: তানজিন বলেন- আমাদের রাস্তাগুলোতে অনেক বাঁক, সেখানে সাইকেলের জন্য আলাদা লেন নেই, সাইকেলের জন্য পার্কিং নেই। অফিসগুলোতে মেয়েদের গোসলের ব্যবস্থা নেই। একজন নারী কর্মচারী ঘেমে গেলে ব্র্যাক তাকে পরিষ্কার হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। আমরা আশা করি ক্রমেই সব জায়গাতেই এই ব্যবস্থা হবে। কারণ সাইকেল আরোহী নারীর সংখ্যা বেড়ে যাবে। আমরা এই পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে চাই। ভূমিকা রেখেছেন আতিয়ার রহমান সূচীও । তিনি স্বামী সংসার সন্তান আর শ্বশুরবাড়িকে বুঝিয়ে সাইকেল নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন। নিজে শিক্ষকতা করেন, তাই সব কুসংস্কারকে পেছনে ফেলে দিয়ে সমাজকে এগিয় নিয়ে যেতে চান। সূচী বলেন, আগে নিজেই ড্রাইভ করতাম। গাড়ি ছেড়ে সাইকেল নিয়ে দেখি টাকা সময় দুই বাঁচে। আর ভাল এক্সারসাইজও হয়। পুরোটাই ইতিবাচক। তাই আমি বিশ্বাস করি জীবনতো একটাই একে নিজের মতো যাপন করতে হবে।