পারভেজ মোশাররফ

পাকিস্তানের সাবেক সামরিক শাসক পারভেজ মোশাররফ প্রেসিডেন্ট থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসনে গেলেন, নির্বাসনের পর আবার তিনি স্বল্প সময়ের জামিন নিয়ে দেশের মাটিতে ফিরলেন। কিন্তু দেশে ফেরার পর এখন অনেকের মাঝেই কৌতূহলের চোখ এরপর কী ঘটতে যাচ্ছে পারভেজ মোশাররফের ভাগে। অবশ্য তিনি আগামী মে মাসে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতেই যে এসেছেন এটা এখন আর কারও অজানা নয়। কিন্তু কী ঘটতে যাচ্ছে পাকিস্তানে? নির্বাচনকে ঘিরে এখন সকলেরই দৃষ্টিই সেখানে। তালেবান হুমকি উপেক্ষা করে তার দেশে ফেরা কিংবা জামিনের সময়সীমা উত্তীর্ণ হয়ে গেলে তিনি গ্রেফতার হয়ে যাবেন কিনা এ ধরনের অনেক প্রশ্নই আজ নানা মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মন্তব্য করছেন। অবশ্য পারভেজ মোশাররফ আশঙ্কার জায়গা থেকে বলেছেন, তার দেশে ফেরা রীতিমতো যে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। তারপরও সেই ঝুঁকি নিয়ে তিনি গত ২৪ মার্চ দেশের মাটিতে পা রাখেন। দেশে ফিরেই তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। দীর্ঘ ৪ বছর ৬ মাস স্বেচ্ছা নির্বাসনের পর পারভেজ মোশাররফ আশাবাদ ব্যক্ত করেন, দেশের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ এবং তার সিঁড়ি বেয়েই সামনের দিকে এগিয়ে যাবেন। অল পাকিস্তান মুসলিম লিগের (এপিএমএল) প্রধান মোশাররফ আরো বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে তিনি জনগণের আস্থা অর্জন করবেন। নিজের দল থেকে তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন। পারভেজ মোশাররফ ১৯৯৯ সালে নওয়াজ শরীফ সরকারকে হটিয়ে এক রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন। দীর্ঘ প্রায় ৯ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। এরপর সাড়ে ৪ বছর তিনি স্বেচ্ছা নির্বাসিত জীবন কাটান। ২০০৯ সালে তার এ নির্বাসন জীবন শুরু হয়, শেষ হয় সম্প্রতি দেশে ফেরার মধ্যদিয়ে। পারভেজ মোশাররফ নিজেও স্বীকার করেছেন, তার সামনে চলার পথ সহজ নয়। তিনি বলেন, আমি কেন দেশে ফিরে এসেছি, তার উত্তর একটাই আমি আমার জনগণের জন্য কিছু করতে চাই। আমি দেশের জন্য সেই ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত আছি। আমার প্রতি সতর্ক বার্তা দেয়া হয়েছিল, আমি যেন দেশে না ফিরি। এমনকি আমার সহকর্মীরাও বলেছেন, আমি যেন দেশে না আসি। এখন আমার নিরাপত্তার দায়িত্ব সরকারের। কাজেই আমার ওপর কোন কিছু ঘটলে এ দায়ভার সরকার এড়াতে পারে না। এছাড়া আমি আমার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বলয়ে থাকবো। বাকিটা উপরআলার মর্জির ওপর নির্ভর করছে। ২০১২ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তান পার্লামেন্টের উচ্চ কক্ষে একটা প্রস্তাব পাস হয়। এতে বলা হয়, মোশাররফ দেশে আসা মাত্র তাকে গ্রেফতার করা হবে এবং তার বিরুদ্ধে অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতার ব্যবহারের জন্য বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ আনা হবে। এ প্রেক্ষাপটে মোশাররফের আইনজীবী গত ২২ মার্চ তাকে গ্রেফতার না করার জন্য আগাম জামিনের ব্যবস্থা করান। জামিনের আদেশে বলা হয়, উচ্চতর আদালতের বিচারকদের অপসারণ সংক্রান্ত মামলায় ১০ দিনের মধ্যে ও অপর দুই মামলায় ১৪ দিনের মধ্যে তাকে গ্রেফতার করা যাবে না। তবে শর্ত থাকে, তাকে নির্দিষ্ট সময়ে আদালতে হাজির হতে হবে। গত শুক্রবার করাচির একটি আদালত আরো ২১ দিনের আগাম জামিন দেয়। মোশাররফের বিরুদ্ধে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকা, ২০০৭ সালে বেনজির ভুট্টোর উপর হামলার ঘটনায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে না পারাসহ বেশ কয়েকটি অভিযোগে মামলা রয়েছে। এদিকে মোশাররফ দেশে ফেরার একদিন আগে শনিবার নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়, পাকিস্তান সরকারের উচিত মোশাররফকে গ্রেফতার করা। কেননা তার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পাকিস্তানের পরিচালক আলি দায়ান হাসান বলেন, মোশাররফকে কোনভাবেই আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে দেয়া উচিত নয়। মোশাররফের সময়কালে সামরিক ও গোয়েন্দা বাহিনী ব্যাপকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। এরমধ্যে রয়েছে বিরোধী রাজনৈতিক দলের অনেক নেতাকে গুম করার ঘটনাও। বিশেষ করে বেলুচিস্তান প্রদেশে এ ঘটনা বেশি ঘটেছে। সন্ত্রাসী সন্দেহের নামে শত শত পাকিস্তানিকে তখন নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল। তবে মোশাররফের রাজনীতিতে ফেরা নিয়ে মিশ্র পর্যালোচনা রয়েছে। অনেকের মতে, তার শাসনামলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সৃষ্টি হয়েছিল অনুকূল পরিবেশ। এসময় মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অগ্রগতি হয়েছিল। মিডিয়া হয়েছিল আরো তত্পর এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। গত বছরে এক সাক্ষাত্কারে পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব লেজিসলেটিভ ডেভালপমেন্ট অ্যান্ড ট্রান্সপারেন্সির পরিচালক আহমেদ বিলাল মেহবুব বলেন, মোশাররফের আমলে সংসদীয় ব্যবস্থার সংস্কার সাধন হয়েছিল। তিনি নারীদের পার্লামেন্টে আনার ব্যবস্থা করেন। অপরদিকে অন্য পক্ষ বলছেন, মোশাররফ তার সামরিক ধ্যান-ধারণা থেকে ফিরে আসতে পারেননি। তিনি আপাদমস্তক একজন সামরিক ব্যক্তিত্ব। রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাবেক লে. জেনারেল তালাত মাহমুদ বলেন, তিনি সর্বদাই একটা ‘ইউনিটি অব কমান্ডে’ বিশ্বাস করেন এবং এ পথেই তিনি আছেন। তার চলনে বলনে সামরিক ব্যক্তিত্বই ফুটে উঠে। মোশাররফের জনপ্রিয়তা কমতে থাকে যখন তিনি সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ইফতিখার চৌধুরীকে বরখাস্ত করেন। এটা ছিল ২০০৭ সালের ঘটনা। এর বিরুদ্ধে তখন বিক্ষোভ-সমাবেশ হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে তিনি সুপ্রিম কোর্টকে প্রভাবিত করছেন, যাতে করে পরবর্তী পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকতে পারেন। ইফতেখার চৌধুরীকে অবশ্য পরবর্তীকালে পুনর্বহাল করা হয়। কিন্তু ইতিমধ্যে যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গেছে। ওই বছরের অক্টোবরে মোশাররফ পার্লামেন্টে প্রেসিডেন্ট পদে পুনর্নির্বাচিত হন। অবশ্য বিরোধীরা এ জয়লাভকে মেনে নেয়নি। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এ নির্বাচনের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়। পরের মাসে তিনি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন এবং দেশের সংবিধান স্থগিত করেন। প্রধান বিচারপতিকে আবারো পরিবর্তন করেন। সেই সঙ্গে গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। অবশেষে পশ্চিমা বিশ্বের চাপের মুখে তিনি জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করে নেন এবং ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে নির্বাচন দিতে অঙ্গীকার করেন। এ সময় তিনি নওয়াজ শরীফকে নির্বাসন থেকে দেশে ফেরার সুযোগ দেয়া হয়। তিনি অবশ্য তখন বেনজির ভুট্টোর রাজনৈতিক দল পাকিস্তান পিপলস পার্টির শত্রুতে পরিণত হন। বেনজির ভুট্টো ৮ বছর স্বেচ্ছা নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য ২০০৭ সালে দেশে আসেন। কিন্তু ওই বছর ডিসেম্বরে তিনি রাওয়ালপিন্ডিতে এক নির্বাচনী প্রচারাভিযানে এক আত্মঘাতী হামলাকারীর বোমায় নিহত হন। এ আসনটি ছিল পারভেজ মোশাররফের এলাকা। মোশাররফ সরকার এবং সিআইএ এই হত্যাকাণ্ডকে সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী, যারা আল-কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তাদেরকে দায়ী করা হয়। কিন্তু জনমত জরিপে বলা হয় যে, অধিকাংশ পাকিস্তানি বিশ্বাস করেন যে, এর জন্য মোশাররফ সরকারই দায়ী। অবশ্য এ অভিযোগকে সরকারের তরফ থেকে অস্বীকার করা হয়েছে। ২০১০ সালে জাতিসংঘের তরফ থেকে বলা হয়, বেনজির ভুট্টোর মৃত্যুকে হয়তো ঠেকানো যেত যদি মোশাররফ সরকার প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিতো। এ বিবৃতি প্রকাশ হওয়ার পর মোশাররফের বিরুদ্ধে আবারো সমালোচনার ঝড় উঠে। মোশাররফ অবশ্য একে প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, জাতিসংঘের এ অভিযোগ সত্য নয়। এসব কারণে বর্তমানে পারভেজ মোশাররফের জনপ্রিয়তা কমেছে বলে অনেকে মনে করেন। এছাড়া তার আমলে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের সংকট, বিদ্যুতের অপর্যাপ্ততা, উচ্চ মুদ্রাস্ফিতী প্রভৃতি তার জনপ্রিয়তাকে হ্রাস করার ক্ষেত্রে অনেকাংশে দায়ী। সবশেষে মোশাররফ দেশে ফিরে আসলেও রাজনীতির মাঠে সবসময় সঠিক সমীকরণ করা যায় না। তাই সময়ই বলে দিবে পাকিস্তানে নির্বাচনকে ঘিরে রাজনীতির হাওয়া কোনদিকে বইছে। অবশ্য সেজন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে আগামী ১১ মে সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত।