এস এম রওনক রহমান আনন্দ
সরকারের বাজেট ঘোষণার সময় এগিয়ে এলেই একটি শিল্পকে টার্গেট করা হয় আর সেটি হলো সংবাদপত্র শিল্প। অবস্থাবিশেষে দুর্বল এই শিল্পটির ভবিষ্যত্ বিবেচনা করে সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) বারংবার সংবাদপত্র বাঁচাতে এ শিল্পের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর কমানোর দাবি জানিয়ে আসছে। সংবাদপত্রশিল্পের প্রধান কাঁচামাল আমদানি করা নিউজপ্রিন্ট ও মুদ্রণ উপকরণের দাম এবং ছাপার খরচ বহু বছর ধরে বেশি। ফলে সংবাদপত্রশিল্প বর্তমানে গভীর সংকটে রয়েছে। বর্তমানে আমদানিকৃত নিউজপ্রিন্টের ওপর ভ্যাট ১৫ শতাংশ, আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ, অগ্রিম কর ৫ শতাংশসহ প্রতিটন নিউজপ্রিন্টের ওপর মোট কর ভার ৩১ শতাংশ। সংবাদপত্র শিল্পখাতে নেওয়া হলেও বিশেষ কোনো সুবিধা দিচ্ছে না সরকার। তৈরি পোশাক খাত যেমন একটি শিল্প। বিশেষ সুবিধা দিয়ে এ খাতের করপোরেট কর ১০ থেকে ১২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। অথচ সংবাদ মাধ্যমকে লিমিটেড কোম্পানির মতো বিবেচনা করে করপোরেট কর ৩০ শতাংশের বেশি ধার্য করা হয়েছে। এ খাতের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এটি যৌক্তিক হতে পারে না। উল্লেখ্য, ভারতে সংবাদপত্রে ব্যবহূত আমদানি করা নিউজপ্রিন্টে কোনো শুল্ক নেই। শ্রীলঙ্কায় শুল্ক মাত্র আড়াই শতাংশ। বাংলাদেশে এই বর্ধিত করারোপের কী যুক্তি থাকতে পারে? কেউ কেউ দেশীয় নিউজপ্রিন্টের কথা বললেও দেশে উত্পাদিত নিউজপ্রিন্ট সংবাদপত্র প্রকাশের জন্য মানসম্মত নয়। সেক্ষেত্রে দেশীয় শিল্প রক্ষার দোহাই এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের কাছে অযৌক্তিক বলেই বিবেচিত হয়ে আসছে। এখন বাংলাদেশের সংবাদপত্রশিল্প নানা সমস্যা ও সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২৪ পৃষ্ঠার একটি সংবাদপত্র মুদ্রণে সর্বসাকুল্যে প্রায় ১৮ থেকে ২০ টাকা ব্যয় হলেও বিক্রি হয় ১০ টাকায়। কমিশন বাদ দিয়ে পাওয়া যায় সাড়ে ছয় টাকার মতো। ১২ পৃষ্ঠার পত্রিকার ক্ষেত্রেও এই আয় ও ব্যয়ের হার সমানুপাতিক।
ফলে বিজ্ঞাপনের ওপরই সংবাদপত্রকে অধিক নির্ভর করতে হয়। কিন্তু বিজ্ঞাপন পাওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা ধরনের সংকট। সরকার যখন সংবাদপত্রকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা করেছিল, আশা করা গিয়েছিল যে এ খাতের সমস্যাগুলো দূর করতেও তারা সচেষ্ট থাকবে। কিন্তু প্রতিবছর বাজেট এলেই দুর্বল এই শিল্পটির ওপর নানা করারোপের তত্পরতা শুরু হয়। দেশে বিজ্ঞাপনের সীমিত বাজারে সংবাদপত্র, বেতার ও টেলিভিশনের প্রতিযোগিতা এরই মধ্যে প্রবল। যুক্ত হয়েছে ফেসবুক, ইউটিউবের মতো প্রবল প্রতিযোগিরা। সংবাদপত্রের দরকষাকষির সুযোগ কমছে। এ অবস্থায় সরকারের দিক থেকে কিছু পদক্ষেপ এলে সংবাদপত্র বাঁচতে পারে। নিউজপ্রিন্টের আমদানি শুল্ক কমানো এবং ধীরে ধীরে একে শূন্যের কোটায় কমিয়ে আনা দরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড শুল্ক ছাড় দিতে পারে। এক্ষেত্রে নীতিগত সমস্যাও নেই। শিল্পনীতিতে সংবাদপত্রকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তাই এ শিল্পের প্রধান কাঁচামাল নিউজপ্রিন্ট আমদানিতে শূন্য শুল্ক ঘোষণায় বাধা নেই। বর্তমানে নিউজপ্রিন্ট আমদানিতে সবমিলিয়ে ২১ শতাংশ শুল্ককর পরিশোধ করতে হয়। এছাড়া রয়েছে কালি, প্লেট ও প্রিন্টিং কেমিক্যালের ওপর নানা হারে শুল্ককর। এসব ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হলে সংবাদপত্রের উত্পাদন ব্যয় কমে আসবে। বিজ্ঞাপন বিলের ওপর ৪ শতাংশ অগ্রিম কর কেটে রাখার বিধান বাতিল করা হলেও সংবাদপত্রের আয় বাড়বে। এ ছাড়ের পরও সংবাদপত্র হয়তো লাভজনক হয়ে উঠবে না কিন্তু বিনিয়োগকারীরা কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। পাশাপাশি জনকল্যাণমুখী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরকার বাহবা পাবে।
এটা সবারই জানা যে, বাংলাদেশের মানুষ সংবাদপত্রের ওপর বিপুল আস্থা পোষণ করে। সমস্যা-সংকটে, হয়রানি-ভোগান্তিতে ভরসা রাখে এ মাধ্যমের ওপর। সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্যও সংবাদপত্রের অবস্থান রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভের মতো। সর্বোপরি জনগণের বহুবিধ সমস্যা দ্রুত অবহিত হওয়া এবং নিজেদের কর্মকাণ্ড বিশ্বাসযোগ্যভাবে সবার কাছে তুলে ধরার জন্য সরকারেরও সংবাদপত্রের ওপর বিপুল নির্ভরতা রয়েছে। অনেক পেশাদার সাংবাদিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী সংবাদপত্রের সঙ্গে জড়িত। সংবাদপত্রের মাধ্যমে একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মসংস্থান হচ্ছে। অবাধ তথ্যপ্রবাহ ও গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে সংবাদপত্রের ভূমিকা অপরিহার্য। অনলাইন মাধ্যমের বাড়বাড়ন্তের মধ্যে পেশাদার, নির্ভরযোগ্য ও দায়িত্বশীল সংবাদ প্রচারের জন্য সংবাদপত্রের প্রয়োজনীয়তা সারাবিশ্বেই নতুনভাবে আলোচিত হচ্ছে। বাংলাদেশকেও এ নিয়ে এখনই ভাবতে হবে। এই শিল্পকে রক্ষার জন্য এখনই সরকারের তরফ থেকে সদর্থক ভূমিকা প্রত্যাশিত। বিচক্ষণ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়ে সঠিক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেবেন; দৈনিক পত্রিকার একজন নিয়মিত পাঠক হিসেবে তাঁর কাছে এই আশা করতেই পারি।
n লেখক:শিক্ষার্থী, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান
ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর।