নওগাঁয় ঘূর্ণিদুর্গত এলাকায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি

নওগাঁর পত্নীতলা ও ধামরহাট উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়ের ২৪ ঘন্টা পরেও দুর্গত এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। শনিবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে শুরু হওয়া ঘূর্ণিঝড়ের স্থায়ীত্ব ছিল ৭ থেকে ৮ মিনিট। ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামের লোকজন জানান, ওই ঘূর্ণিঝড়ের স্থায়ীত্ব কম হলেও এর তীব্রতা ছিল মারাত্মক। ধামরহাট উপজেলার কাজিপুর গ্রামের কৃষক মামুন রেজা ও দক্ষিণ ভগবানপুর গ্রামের জহিরুল ইসলাম জানান, ঐদিন বিকাল তিনটা ৩৭ মিনিট থেকে শুরু হওয়া ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে প্রচণ্ড শিলাবৃষ্টি হয়। যা ছিল গ্রামবাসীর জন্য আতংকের বিষয়। গগণপুর গ্রামের কৃষক আলীমুদ্দিন জানান, ৭ থেকে ৮ মিনিটের শিলাবৃষ্টির সময় এলাকায় দেড় ফুটের উচ্চতার বরফ জমে যায়। একেকটি শিলার ওজন ছিল কমপক্ষে আড়াইশ গ্রাম থেকে চারশ গ্রামের মত। গতকাল রবিবার দুপুরে সরেজমিন ধামরহাট উপজেলার লক্ষণপুর, কাজিপুর ও বরথা গ্রামসহ পত্নীতলা উপজেলার গগণপুর ও দক্ষিণ ভগবানপুর গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, উপর্যুপরি শিলা বৃষ্টির কারণে গ্রামগুলোর ফসলের মাঠে থাকা ক্ষেতের বোরো ধানের গাছ কাদা-পানির সঙ্গে মিশে ভর্তা হয়ে গেছে। লক্ষণপুর গ্রামের কৃষক ইয়াছিন আলী জানান, উপর্যুপরি শিলার আঘাতে ক্ষেতের ধান যেভাবে দুমড়ে মুচড়ে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে তাতে করে আর ক্ষতিগ্রস্ত জমিতে ধান হওয়ার কথা নয়। তাছাড়া বোরো ধানের আবাদ করার সময় চলে যাওয়াসহ নতুন করে আর ধানের আবাদ করাও সম্ভব হবে না। ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনের সঙ্গে কথা বলে আরো জানা গেছে, ঘটনার দিন বিকাল ৩টার দিকে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ থেকে উঠে আসা ঘূর্ণিঝড়টি উত্তর-পূর্ব কোণ দিয়ে বয়ে যায়। পত্নীতলা উপজেলার মাটিন্দর ইউনিয়ন থেকে শুরু করে ঘূর্ণিঝড়টি ক্রমান্বয়ে পত্নীতলা সদর, পাটিচড়া, ঘোষনগর, আমাইর হয়ে ধামুরহাট উপজেলার আড়ানগর, ইসবপুর ও জাহানপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে আঘাত করে। এ সময় ঘূর্ণিঝড়টি প্রায় দেড় কিলোমিটার ব্যাস নিয়ে বাড়ি-ঘর, গাছ-পালা ও ফসলের ক্ষতি করে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের মতে ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবসহ শিলাবৃষ্টির কারণে আক্রান্ত এলাকার কমপক্ষে ৪ হাজার হেক্টর বোরো ধান সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। রবি ফসলের ক্ষতি হয়েছে আরো প্রায় ৫শ হেক্টর জমির। পত্নীতলা ও ধামরহাট উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ঝড় ও শিলাবৃষ্টির প্রভাবে রবি মওসুমের গম, পেঁপে, পটল, ক্ষিরাসহ অন্যান্য ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন আম বাগানে থাকা আমের গুটিসহ পাতা ঝরে গেছে। গাছপালা উপড়ে ও ভেঙ্গে যাওয়ায় বিভিন্ন স্থানে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এছাড়া বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে পড়াসহ খুঁটি উপড়ে পড়ায় বিদ্যুত্ সরবরাহ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তাত্ক্ষণিকভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনস্থাপন করাসহ বিদ্যুত্ সমস্যার সমাধান করা হচ্ছে। পত্নীতলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও ধামুরহাট উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা আবু হায়াত্ মোঃ রফিক জানিয়েছেন, উপদ্রুত এলাকার পাঁচ শতাধিক কাঁচা বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। গত শনিবার বিকালে বয়ে যাওয়া ঐ ঘূর্ণিঝড়ে পত্নীতলা উপজেলার গগণপুরে একজন স্কুল শিক্ষক দেওয়াল চাপা পড়ে এবং নগর গোলা গ্রামে গাছের ডাল ভেঙ্গে এক শিশু নিহত হয় এবং আহত হয় কমপক্ষে ৩০ জন। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা এবং আহতদের জন্য পাঁচ হাজার টাকা ত্রাণ সহায়তা দেয়া হয়েছে। তাছাড়া উপদ্রুত এলাকার ক্ষতিগ্রস্থ প্রতিটি পরিবারকে ৩০ কেজি হারে চাল দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পত্নীতলা-ধামুরহাট এলাকার সংসদ সদস্য শহীদুজ্জামান সরকার জানিয়েছেন, প্রশাসনের উদ্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর ও ফসলি জমির তালিকা প্রণয়ন করা হচ্ছে।