লংমার্চ প্রত্যাহারে সরকারের আহ্বানে হেফাজতের ‘না’
সালাহউদ্দিন মো. রেজা, চট্টগ্রাম অফিস
প্রকাশ : ৩১ মার্চ ২০১৩, ২২:৪৮
ঢাকামুখি লংমার্চ কর্মসূচি প্রত্যাহারে হেফাজতে ইসলামকে রাজি করাতে সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ গতকাল রবিবার সরকারের আনুষ্ঠানিক আহবানে সাড়া দেয়নি হেফাজতে ইসলাম। বন ও পরিবেশ মন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক আবদুস সালাম হাটহাজারী দারুল উলুম মাদ্রাসায় যান এবং লংমার্চ কর্মসূচি প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। মন্ত্রী সকালে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও মাদ্রাসার মহাপরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফীর কাছে সোমবার থেকে শুরু হওয়া এইচএসসি পরীক্ষাসহ দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে লংমার্চ কর্মসূচি প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান।
আল্লামা আহমদ শফী ড. হাসান মাহমুদকে জানান, লংমার্চ কর্মসূচি কোন একক ব্যক্তি বা সংগঠনের কর্মসূচি নয়। আল্লাহ ও রসুল (স.) এর অবমাননাকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তি ও বিচারের দাবিতে দেশের লাখ লাখ ওলামা-মাশায়েখ ১৩ দফা দাবি সম্বলিত এই কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। তিনি আরও বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা পূরণের প্রকাশ্য ঘোষণা দেয়া হলে দেশের আলেম সমাজ ৬ এপ্রিলের লংমার্চ কর্মসূচি প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করবেন।
হেফাজতে ইসলামের সূত্রে জানা যায়, সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে ৬ এপ্রিলের লংমার্চ কর্মসূচি বাতিল করতে বলা হচ্ছে। হাটহাজারী দারুল উলুম মাদ্রাসার সাথে সংশ্লিষ্ট অনেকের সাথেও যোগাযোগ করা হচ্ছে। লংমার্চ কর্মসূচি প্রত্যাহারের চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হলে সরকার বিকল্প পন্থা অবলম্বন করতে পারে বলে জানা গেছে । তবে লংমার্চ স্বাভাবিকভাবে ঢাকায় যেতে দেয়া হবে কিনা, তা নিয়ে এখনও কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। জেলা পুলিশ প্রশাসন থেকেও বলা হয়েছে, লংমার্চের ব্যাপারে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে। তবে প্রশাসনের বিভিন্ন শাখা থেকে লংমার্চ কর্মসূচির ব্যাপারে হেফাজতে ইসলামের কর্মকাণ্ড নিয়ে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে।
অপরদিকে হেফাজতে ইসলাম লংমার্চ কর্মসূচিকে সামনে রেখে আজ সোমবার চট্টগ্রাম লালদীঘি ময়দানে শানে রেসালত সম্মেলন আহবান করেছে। হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে লংমার্চ কর্মসূচি সফল করতে শানে রেসালত সম্মেলনে শপথগ্রহণ করা হবে। সিএমপির পক্ষ থেকে শানে রেসালত সম্মেলনের জন্য অনুমতি দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। ইতিপূর্বে আরো দুই বছর শানে রেসালত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে অনেকের মতে লংমার্চের পূর্বে লালদীঘি ময়দানের সমাবেশ হেফাজতে ইসলামের শোডাউনের প্রাথমিক প্রস্তুতি।
আগামী ৬ এপ্রিল ঢাকামুখি লংমার্চ কর্মসূচি পালনে হেফাজতে ইসলাম গৃহীত পদক্ষেপসমূহ প্রকাশ করছে না। সংগঠনের দায়িত্বশীল একজন নেতা জানিয়েছেন, হেফাজতে ইসলামের কর্মী-সমর্থকগণ যেভাবেই হোক ঢাকা অভিমুখে রওনা করবেন। তিনি বলেন, কোন মহল থেকে বাধা দেয়া হলে ওই স্থানেই অবরোধ সৃষ্টি করা হবে। সারাদেশ থেকে এভাবে লাখ লাখ লোক ঢাকা অভিমুখে রওনা করবে। কিন্তু যেখানেই বাধা আসবে সেখানেই সমাবেশ করা হবে। ইতিমধ্যে লংমার্চ সফল করতে সারাদেশে গণসংযোগ করা হচ্ছে।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী ইত্তেফাককে জানান, ৬ এপ্রিলের লংমার্চ সফল করতে সারাদেশের আলেম সমাজ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। কর্মসূচিতে বাধা দেয়া হলে ৩ লাখ হেফাজত কর্মী শাহাদাত বরণ করার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। তিনি জানান, ঢাকায় সম্ভাব্য তিনটি স্থানে সমাবেশ করার জন্য অনুমতি চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-শাপলা চত্বর, মানিক মিয়া এভিনিউ ও পল্টন এলাকা। আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, আমরা লংমার্চ সফল করতে কোন রাজনৈতিক দলের মুখাপেক্ষী নই। আল্লাহ ও রসুলের মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনে রাজনৈতিক দলের সমর্থন প্রয়োজন হয় না।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ১৩ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে-সংবিধানের সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা সম্বলিত বিধান পুনঃস্থাপন, নাস্তিক মুরতাদদের ফাঁসির আইন প্রণয়ন ও পাঠ্যপুস্তকে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে মনগড়া ব্যাখ্যা প্রত্যাহার অন্যতম। হেফাজতের অন্যান্য দাবির মধ্যে রয়েছে- ব্যক্তি ও বাক-স্বাধীনতার নামে সকল বেহায়াপনা, অনাচার, ব্যভিচার, প্রকাশ্যে নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ, মোমবাতি প্রজ্বলনসহ সকল বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ বন্ধ করা। ইসলাম বিরোধী নারীনীতি, ধর্মহীন শিক্ষানীতি এবং ইসলাম ও নৈতিকতা বিরোধী মন্তব্য ও উদ্ধৃতিসমূহ বাতিল করে শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা। রেডিও, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন মিডিয়ায় দাড়ি, টুপি ও ইসলামী কৃষ্টি-কালচার নিয়ে হাসি-ঠাট্টা এবং নাটক-সিনেমায় খল ও নেতিবাচক চরিত্রে ধর্মীয় লেবাস- পোশাক পরিয়ে অভিনয়ের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মনে ইসলামের প্রতি বিদ্বেষমূলক মনোভাব সৃষ্টির অপপ্রয়াস বন্ধ করা। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশব্যাপী ইসলাম বিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত এনজিও, কাদিয়ানীদের অপতত্পরতা এবং খ্রিস্টান মিশনারীদের ধর্মান্তরিতকরণসহ সকল অপতত্পরতা বন্ধ এবং সারাদেশের ক্বওমী মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক, ওলামা-মাশায়েখ এবং মসজিদের ইমাম-খতীবকে হুমকি-ধমকি ও ভয়ভীতি দানসহ তাদের বিরুদ্ধে দমন-নিপীড়ন বন্ধ করা অন্যতম।